somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইউনুস সাহেব আমেরিকার কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছেন ?

২৬ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রমজান মাসের শেষ দিককার কথা। আব্বা-আম্মার সঙ্গে ইউনাইটেড হাসপাতালে গেলাম নানাকে দেখতে। মায়ের দিকের এই আত্মীয়র হার্টে চারটা রিং বসানো হয়েছে, কিন্তু কেবিনে ঢুকে বুঝলাম তার জবান এখনো আগের মতোই ধারালো। আমাকে দেখার পর তাঁর প্রথম প্রশ্ন ছিলো চমকে দেওয়ার মতো : "ইউনুস কি জন্য তারেক রহমানকে দেশে এনেছে?" এতদিন পর দেখা, আর রাজনৈতিক আলাপ শুরু করে দিয়েছেন! হেসে বললাম, "তারেক রহমান দেশে এলে কি সমস্যা, আপনার?" উনি আর কিছু বললেন না।

তারপর আরেকটি অদ্ভুত প্রশ্ন: "ইউনুস কি আমেরিকার কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছে?" আমি অবাক। এই বয়সে হার্ট অপারেশন নিয়েও মাথায় রাজনীতি ঘুরছে লোকটার! যাইহোক, তর্ক করতে ইচ্ছে করল না। শুধু জানতে চাইলাম, "ইউনুস সাহেব দেশ বিক্রি করেছেন, এটা আপনি গ্রামে বসে কীভাবে জানলেন?" উনি বললেন, "ইউটিউবে দেখেছি।"

বুঝলাম, বিশ্বের সব দেশে ইন্টারনেট ভালো কাজে ব্যবহার হলেও বাংলাদেশে এর অপব্যবহার হচ্ছে। বললাম, "আপনার কোথাও বুঝতে ভুল হয়েছে। এই চুক্তির কোনো লাভ-লস নেই।" নানা মানলেন না। তিনি ফেসবুকে দেখেছেন: ইউনুস সরকার আমেরিকার কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছেন। তাঁকে বোঝানো প্রায় অসম্ভব, কারণ বেশ ঘাড় তেড়া লোক।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাসে উঠলাম। জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিলাম : নানাকে দোষ দিয়ে লাভ কী? তিনি একা নন, তাঁর মতো মানুষ তৈরি হওয়ার পেছনে একটা দীর্ঘ গল্প আছে। সেই গল্পের শুরুটা হয়েছিল অনেক আগে, কিছু পরিচিত মুখের হাত ধরে।

প্রথমে বাম নেতা আনু মোহাম্মদ বললেন, আমেরিকা যে শর্তগুলো দিয়েছে সেগুলো বাংলাদেশের বিপক্ষে গেছে। এরপর বিভিন্ন নিউজ মিডিয়া সেই কথা বারবার প্রচার করলো। তারপর মাহা মির্জা, কল্লোল মোস্তফাসহ আরো কিছু অ্যাক্টিভিস্ট নানা দিক থেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন যে এই চুক্তি দেশবিরোধী। সবার মিলিত সারমর্ম একটাই: ইউনূস সাহেব আমেরিকার কাছে দেশ বেচে গিয়েছেন। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন: চুক্তির মধ্যে এমন কিছু আছে যা আমাদের ফিশরিজ অ্যান্ড পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রির ওপর চাপ বাড়াতে পারে। তখন গুজব আরও ডানা মেলে।

সাম্প্রতিক সময়ে আবার ফরিদা আখতার একই বিষয় নিয়ে কথা বলেন এবং দাবি করেন, উনার আসলে কিছুই করার ছিলো না। এসবই জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে। তারপর যারা অ্যান্টি-ইন্টারিম, তারা সবাই মিলে প্রোপাগান্ডা করে এই কথাকে প্রায় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে — ইউনুস সাহেব দেশ বিক্রি করে দিয়েছেন।

এবার আলোকপাত করা যাক চুক্তির দিকে। রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তির আগেই আমেরিকার সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান ভার্চুয়াল মিটিং করেছেন। সবাই সবকিছু জানে। তবু কীভাবে এতটা প্যানিক তৈরি হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আরেকটু বড় প্রেক্ষাপট দেখতে হবে।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার সংসদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের রেসিপ্রোকাল ট্যাক্স চুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সঙ্গে সঙ্গে হুজুগ উঠেছে : মালয়েশিয়া যদি ট্রাম্পের ট্যাক্স পলিসিকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন নতিস্বীকার করছে? কিন্তু এখানে একটা বড় তথ্য চাপা পড়ে গেছে। মালয়েশিয়া এই সাহস দেখিয়েছে তখন, যখন খোদ আমেরিকার আদালতেই চুক্তিটি অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। তারা অফিশিয়ালি এখনো কিছু বলেনি, স্রেফ ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ নীতিতে এগোচ্ছে। অথচ আমাদের দেশের একদল লোক চায় বাংলাদেশ যেন এখনই বুক ফুলিয়ে আমেরিকার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তারা ভুলে যান যে আমাদের অর্থনীতির মূল খুঁটি দুটো : রেমিট্যান্স আর গার্মেন্টস। আর এই গার্মেন্টসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা কিন্তু সেই আমেরিকাই।

একদিকে পল কাপুর যখন দেশে এসে চুক্তি মানার তাগাদা দিচ্ছেন, তখন আমেরিকান রাষ্ট্রদূত বিজিএমইএ-র সাথে বৈঠকে চুক্তির বিস্তারিত বলতে পারছেন না। তাঁর অজুহাত, আমেরিকার আদালতে মামলা চলছে। যেখানে খোদ আমেরিকান কর্মকর্তারাই কনফিউজড, সেখানে আমাদের দেশি পণ্ডিতরা কোমর বেঁধে নেমেছেন এটা প্রমাণ করতে যে আমরা পরাধীন হয়ে গেছি।

তবে একটা ভ্যালিড পয়েন্ট আছে, সেটা অস্বীকার করা ঠিক হবে না। চুক্তির একটি অংশে বলা আছে, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে চুক্তি করার আগে আমেরিকার সাথে আলোচনা করতে হতে পারে । এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া অস্বাভাবিক না। কিন্তু যেহেতু চুক্তিটি এখন বৈধতাই হারিয়েছে, সেই বিতর্ক অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। বাস্তবতা হলো, আমাদের ট্রেড ডেফিসিট ছিল মাত্র ছয় বিলিয়ন ডলারের মতো, অন্য দেশের তুলনায় অনেক কম। ট্রাম্প না থাকলে কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের দিকে ফিরেও তাকাতেন না।

আর একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। ইউনূস সাহেব , শেখ হাসিনা বা তারেক রহমান : যেই ক্ষমতায় থাকুক, এই চুক্তি এরকমই হতো। এটা কোনো ব্যক্তির সিদ্ধান্ত না, এটা আমেরিকার নীতি। এদিকে আমেরিকান আদালত নিজেই বলে দিয়েছে চুক্তিটা অবৈধ। ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হলে এই চুক্তির অস্তিত্ব থাকবে কিনা, সেটা নিয়েই সন্দেহ আছে।

হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় নানার একটা কথা কানে বাজছিল, "দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে শিক্ষিত মানুষগুলো।" কথাটার গভীরতা অনেক। যারা না বুঝে বা স্রেফ বিরোধিতার খাতিরে আতঙ্ক ছড়ায়, তাদের কারণে নানার মতো সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। দিনশেষে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য আমেরিকার সাথে দরকষাকষি করা মানে হলো জলে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই করা। আবেগ দিয়ে দেশ চলে না, বাজার আর ভূ-রাজনীতি বুঝে পা বাড়ানোই এখানে টিকে থাকার একমাত্র মন্ত্র।

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে দাঁড়াল মালয়েশিয়া- নাগরিক নিউজ ডেস্ক


সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:৫৮
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সামুর ব্লগারদের পোস্ট নিয়ে একটা সংকলন বের করতে চাই

লিখেছেন ডার্ক ম্যান, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৫১

আমি একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান চালু করতে চাচ্ছি। তাই আমার প্রত্যাশা প্রথম বইটা হবে সামুর ব্লগারদের পোস্ট সংকলন।
আপনারা যদি চান, তাহলে আপনাদের লেখা যেকোনো প্রিয় পোস্ট সেখানে দিতে পারেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছায়ার মোনাজাত

লিখেছেন কাবিল, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৫১



ফজরের আগের সেই নীরব সময়টা—যখন আকাশ আর জমিনের মাঝে এক অদৃশ্য দরজা খুলে যায়।
আমি ওযু করে নামাজের জন্য দাঁড়ালাম। চারপাশে এমন নীরবতা, যেন পৃথিবীটা কারো গভীর চিন্তার মধ্যে ডুবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনু কবিতা

লিখেছেন সামিয়া, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৫১



(১)
গল্প স্বল্প আড্ডার ভেতর
ডাকে পুরোনো দিন,
বিষন্ন স্মৃতির পাতা
ক্লান্ত বিলীন।

(২)
শোকের ধুলো জানালাতে,
বসে থাকে রোদ না মেখে,
হারিয়ে গেলো কারো মুখ
ভুল ঠিকানায় নাম লিখে।

(৩)
চায়ের ধোঁয়ায় মুখ লুকিয়ে
একাকী নিরালায়,
গল্প শেষেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন 2026 : BJP কি জিততে চলেছে ?

লিখেছেন গেছো দাদা, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪৫

আসন্ন বিধান সভা নির্বাচনে(2026) কি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে BJP জিততে চলেছে?
আসুন জেনে নিই প্রকৃত সম্ভাব্য রেজাল্ট।
রাজ্য সরকারের IB এবং মোদী সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র অনুসারে,কোন দল কত আসন পেতে পারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা যে আসলে কী চাই, নিজেরাও জানি না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৫৬



কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই একটাই দৃশ্য—হতাশার গল্প আর সমালোচনার স্রোত। বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন সাহেবকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা বেশ জমে উঠেছে। ক্ষমতায় আসার দুই মাসও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×