somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমলারা কেন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলে গেলেন ?

৩০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ২:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ডিপ স্টেট নিয়ে আজকাল চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ফেসবুকের কমেন্ট বক্স সবখানেই বেশ জমজমাট আলোচনা। কেউ বলছেন দূতাবাস, কেউ বলছেন মিলিটারি, কেউ আবার আঙুল তুলছেন কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের দিকে। কিন্তু এই পুরো আলোচনায় যে শক্তিটার কথা সবচেয়ে কম উচ্চারিত হয়, অথচ সবচেয়ে নীরবে যে শক্তিটা কাজ করে সেটা হলো আমলাতন্ত্র। ফাইলের স্তূপের আড়ালে বসে থাকা সেই চিরন্তন, অবিনশ্বর, অপ্রতিরোধ্য আমলাতন্ত্র।

শেখ হাসিনার শাসনামলে আমলাদের জন্য সুযোগ-সুবিধার কোনো কমতি ছিলো না । বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ সফর, ক্ষমতার প্রভাব সবকিছুই ছিল। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সুবিধা মানুষকে চিরস্থায়ীভাবে অনুগত করে না; বরং সুবিধার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে সেই সুবিধাই একসময় আতঙ্কে রূপ নেয়। আর সেই আতঙ্কের মাঝেই ছিলো বিদ্রোহের বীজ।

২০২৪ সালের নির্বাচনটা ছিল কেবল লোক দেখানো। অটো পাস করে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই বাতাসে অনেক কিছু ভাসছিল। আমেরিকার চাপ, র‍্যাবের উপর স্যাংশন, ডোনাল্ড লু'র ঢাকা সফর, পিটার হাসের বিরোধী দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আওয়ামী লীগের অন্দরে তখন ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলো। রাশিয়া আগেই সতর্ক করে দিয়েছিল যে আরব বসন্তের আদলে বাংলাদেশে কিছু একটা হতে পারে। কিন্তু কাউয়া কাদের মনে করেছিলেন, আমেরিকা-ভারতের টু প্লাস টু বৈঠকের পর হয়তো আমেরিকা আর কিছু বলবে না। সেই হিসেব মেলেনি।

ব্রিকসের প্রসঙ্গটাও মনে রাখা দরকার। নির্বাচনের চার-পাঁচ মাস আগে শেখ হাসিনা ব্রিকসে যোগ দিতে চাইলেন, কিন্তু ভারতের সমর্থন পেলেন না। তখন আমরা বন্ধুরা মিলে আলোচনা করেছিলাম ; ভারত হয়তো ভেবেছে, বাংলাদেশ ব্রিকসে গেলে আমেরিকা নাখোশ হবে। কূটনীতির এই জটিল সমীকরণে হাসিনা দিনে দিনে একা হয়ে পড়ছিলেন, কিন্তু বুঝতে পারছিলেন না।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল সার্বজনীন পেনশন স্কিম। ২০২৩-২০২৪ সাল থেকে এটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, যা সাধারণ মানুষের চেয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেশি ভাবিয়ে তুলেছিল। ব্যাংক থেকে টাকা লুটপাটের খবরের পর এই নতুন পেনশন স্কিমকে অনেকেই নতুন লুটপাটের হাতিয়ার মনে করেছিল। শেখ হাসিনার সরকরের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা তখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। ব্যবসায়ীরা ওভার-আন্ডার ইনভয়েসিং করে বিপুল পুঁজি পাচার করেছে, সরকারকে দুর্বল করার জন্যই করা হয়েছিল । এখন যে রেমিটেন্সের সুবাতাস দেখা যাচ্ছে, তার মাঝে এসব ব্যবসায়ীদের পুঁজি পাচারের টাকাও রয়েছে ।

আমলারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শেখ হাসিনার ওপর মূলত সার্বজনীন পেনশন চালু করার কারণে খেপে গিয়েছিল। তাদের সাধারণ পেনশনের সুযোগ-সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। যারা ১ জুলাই, ২০২৪ এর পর সরকারি চাকরিতে যোগ দিত, তাদের এই স্কিমের আওতায় আনার প্ল্যান ছিল। কোটা সংস্কারের পাশাপাশি এই পেনশন স্কিম বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। বাজেটের এক-তৃতীয়াংশই যখন সরকারি চাকরিজীবীদের পরিচালন ব্যয়ে যায়, তখন সরকারের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকাটাই স্বাভাবিক।

শেখ হাসিনা হয়তো ভেবেছিলেন এই স্কিম চালু করে ২/৩ বছরের মধ্যে একটা পে-স্কেল দেবেন। আর এই বুদ্ধি ছিল প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিতের। তার দেশের টাকায় দেশের উন্নয়ন ফর্মুলা থেকেই এটি গৃহীত হয়েছিল। এমনকি চারিত্রিক সনদ নিতে গেলে ৫০০ টাকা দিয়ে পেনশন স্কিমে অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে-এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়েছিল।

পাশাপাশি বড় বড় আমলাদের এপিস্টন ফাইল খোলার ঘটনাও তাদের বিচলিত করেছিল। বেনজির আহমেদের পর আর কার ওপর খড়গ নেমে আসবে, সেই ভয়ে তারা শঙ্কিত ছিল। মিডিয়ার হাওয়াও তখন শেখ হাসিনা বিরোধী হয়ে গিয়েছিল। আমলারা ভালো বুঝত, এই পেনশন স্কিম আসলে সাধারণ মানুষের টাকা লুটপাটের আরেকটা মাধ্যম। কিন্তু যখন দেখল আওয়ামী লীগ তাদের টাকার ওপরও হাত দিচ্ছে, তারা সেটা মেনে নিতে পারেনি। মজার বিষয় হলো , পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের স্কিম চালু হয়েছে কিন্তু সেখানে কোনো প্রতিবাদ হয়নি, কারণ মমতা ব্যানার্জির সরকারের ওপর শেখ হাসিনার সরকারের মতো অবিশ্বাস তৈরি হয়নি।

বিএনপির আমলে গভর্নর মনসুর স্যারকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনেও আমলাদের হাত থাকতে পারে । মন্ত্রণালয় থেকে একটা ফাইলও বের করে আনতে পারছিলেন না তিনি ; আমলারা সহযোগিতা করতে রাজি ছিলেন না। স্যার একবার সেমিনারে বলেছিলেন : সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন বন্ড মার্কেটে নিয়ে যেতে হবে। তিনি মূলত ফান্ডেড পেনশন স্কিমের কথা বলেছিলেন, যেখানে পেনশনের টাকা জমা হয়ে একটি ফান্ড তৈরি হবে এবং সেটি বন্ড মার্কেটে বিনিয়োগ হবে।

বাংলাদেশের বন্ড মার্কেট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে পেনশনের টাকা বিনিয়োগ করলে লাভও হতে পারে, আবার বড় লসও হতে পারে। আমলারা এই ঝুঁকিটা নিজেদের ক্ষেত্রে কিছুতেই মানবেন না। তারা চান নিরাপদ, নিশ্চিত, বাজেট-নির্ভর পেনশন - যেটা কোনো বাজারের উত্থান-পতনে ক্ষতি হবে না।

বাংলাদেশে সরকারি আমলাদের চেয়ে শক্তিশালী ডিপ স্টেট আর কী হতে পারে? তারা কোনো দলের নন, কোনো মতাদর্শের নন : তারা শুধু নিজেদের। সরকার বদলায়, তারা থাকেন। নীতি বদলায়, তারা থাকেন। আর যখন নিজেদের পকেটে হাত পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয় তখন তারাই নীরবে সেই হাতটা সরিয়ে দেন। শেখ হাসিনাকে দশ বছর ধরে যারা চালিয়েছেন -তারাই শেষমেশ সরে পড়েছেন । এটাই আমলাতন্ত্রের চিরন্তন নিয়ম। এই নিয়মের কোনো সংশোধনী নেই, কোনো আপিল নেই, কোনো গেজেট নোটিফিকেশনও নেই ।

বিবিসি বাংলা -সার্বজনীন পেনশনে নতুন স্কিম, কী লাভ, কী ক্ষতি?
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৫:১৭
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনু গল্প

লিখেছেন মোগল সম্রাট, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



(এক)
দশম শ্রেণির ছেলে সাদমান সারাদিন ফোনে ডুবে থাকত। বাবা-মা বকাঝকা করলে প্রায়ই অভিমান করে ভাত খেতো না। একদিন রাতে ঘরের দরজা বন্ধ। ভোরে দরজা ভেঙে সবাই স্তব্ধ। খবরের কাগজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের গল্প - ১০০

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫



আমার সাথে একজন সাবেক সচিবের পরিচয় হয়েছে।
উনি অবসরে গেছেন, ১০ বছর হয়ে গেছে। এখন উনি বেকার। কোনো কাজ নাই। বাসায় বাজার করেন অনেক বাজার ঘুরে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটু চালাক না হইলে আসলে এআইয়ের দুনিয়াতে টেকা মুশকিল।

লিখেছেন Sujon Mahmud, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:২৫



সকাল থেকে চ্যাটজিপিটি আর ন্যানো ব্যানানার কাছে ঘ্যান ঘ্যান করছিলাম, ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বলেছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তার পশ্চাৎদ্বেশ চাটে, এইটার একটা ছবি তৈরি করে দাও।

শালারা দিবেই না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডিপস্টেট তাহলে সসস্র বিপ্লবের গোলা বারুদের সরবরাহকারী! জঙ্গি আসিফ’কে কেউ প্রশ্ন করেনি ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:২৪



বাংলাদেশে একটা ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট-এর বিরুদ্ধে যখন জুলাই-আগস্ট মাসে তথাকথিত “মুভমেন্ট” চলতেছিল, তখন এটাকে অনেকে খুব ইনোসেন্টভাবে “পিপলস আপরাইজিং” বানানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্নটা খুবই সিম্পল—এইটা কি আসলেই স্পনটেনিয়াস... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমলারা কেন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলে গেলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ২:২০


ডিপ স্টেট নিয়ে আজকাল চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ফেসবুকের কমেন্ট বক্স সবখানেই বেশ জমজমাট আলোচনা। কেউ বলছেন দূতাবাস, কেউ বলছেন মিলিটারি, কেউ আবার আঙুল তুলছেন কোনো বিশেষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×