
সংসদ ভবনের লাল ইটের দেয়ালগুলো যদি কথা বলতে পারত, তবে হয়তো তারা লজ্জায় শিউরে উঠত অথবা স্রেফ অট্টহাসি হাসত। আমাদের রাজনীতির মঞ্চটা ইদানীং এক অদ্ভুত সার্কাসে পরিণত হয়েছে, যেখানে ভাঁড় আর খলনায়কদের পার্থক্য করা দায়। এই তো সেদিনের কথা, যখন আওয়ামী লীগের দোর্দণ্ড প্রতাপের সময় মুরাদ হাসান ওরফে 'মুরাদ টাকলা' নামক এক প্রতাপশালী প্রতিমন্ত্রী অডিও ক্লিপে এক অভিনেত্রীকে নিয়ে যে পর্যায়ের কদর্য এবং যৌন হয়রানিমূলক আলাপ করেছিলেন, তা শুনে আমাদের আমাদের সবার মাথা লজ্জায় নত হয়ে গিয়েছিল।
ক্ষমতার মত্ততায় অন্ধ হয়ে নারীকে পণ্য ভাবা সেই সংস্কৃতিটা আমরা ভেবেছিলাম সময়ের সাথে বিদায় নেবে। কিন্তু হায়! আয়নার ওপাশে শুধু মুখগুলো বদলেছে, নোংরামিটা রয়ে গেছে একদম আগের মতোই । এখনকার মঞ্চে নতুন করে আবির্ভূত হয়েছেন কুষ্টিয়ার সেই স্বঘোষিত ধর্মতাত্ত্বিক ও মাননীয় সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা।
যিনি কি না পবিত্র ওয়াজ মাহফিলের মঞ্চে বসে পরম শান্তিতে নারী সংসদ সদস্যদের শরীর নিয়ে কদর্য রসিকতা করেন। তিনি সরাসরি নাম ধরে বললেন, "রুমিন ফারহানা আপা আছে, মন্ত্রী পটলের মেয়ে আছে, ফারজানা শারমিন। আমার ডানে-বামে এমন ভুঁড়িওয়ালা লোক পেয়েছি... আল্লাহর ইশারা ভেতরে গিয়ে দেখি, আমার ডানে-বামে ভুঁড়িওয়ালা। এমন বড় বড় ভুঁড়ি, আমার মনে হয় ভুঁড়ি ছিঁড়লে ভেতর থেকে ব্রিজ-কালভার্ট বের হবে। মহিলারা ওদের দেখলে লজ্জা পাবে।"( মহিলাদের শরীর নিয়ে আরো পচা কথা ছিলো )
কী অদ্ভুত কল্পনাশক্তি আর কী জঘন্য রুচি ! অথচ রুমিন ফারহানা যখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে সংসদীয় আসনের বিন্যাস অনুযায়ী আমির হামজার ডানে-বামে তাদের বসার কোনো সুযোগই নেই, তখন বেরিয়ে এল এক নগ্ন ধূর্ততা। অর্থাৎ, জনসমক্ষে সস্তা হাততালি আর হাসির খোরাক জোগাতে তিনি স্রেফ মিথ্যে গল্পের জাল বুনেছেন।
রুমিন ফারহানা এই চরম অসভ্যতার বিরুদ্ধে সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে স্পিকারের কাছে বিচার চাইলেন। তিনি এটাকে "কদাকার ও কুৎসিত ভাষা" বলে অভিহিত করে নিজের এবং সহকর্মীদের সম্মান রক্ষার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কারিগরি অজুহাতে সেই পয়েন্ট অব অর্ডার গ্রহণই করলেন না। অর্থাৎ একজন নারী এমপিকে নিয়ে প্রকাশ্য জনসভায় এমন কুরুচিপূর্ণ বডি-শেমিং করার পরও সংসদীয় নীতিমালার মারপ্যাঁচে কোনো বিচারই মিলল না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই আমির হামজাদের মতো মানুষদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
এই আমির হামজার বিতর্কের ঝুলি অবশ্য বেশ পুরনো এবং বিচিত্র। কখনো তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মদ দিয়ে কুলি করার গল্প ফেঁদে বসেন, কখনো বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আজান না হওয়ার মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের রাগিয়ে তোলেন। আবার কোনো মন্ত্রীকে অবলীলায় 'আপাদমস্তক নাস্তিক' ফতোয়া দিয়ে ১০০ কোটি টাকার মানহানি মামলা নিজের ঘাড়ে টেনে নেন। এমনকি রসিকতা করতে গিয়ে রাসুল (সা.)-কে সাংবাদিক বলতেও তার বুক কাঁপে না। এই যে বারবার 'মুখ ফসকে' অসভ্যতা করা আর পরে 'ক্ষমা চাই' বলে পার পেয়ে যাওয়া-এটি এখন জাতির সাথে তামাশায় পরিণত হয়েছে।
আসলে রাজনীতির এই পচা ডোবায় মুরাদ হাসানরা যায় আর আমির হামজারা আসে, কিন্তু মাঝখান দিয়ে সাধারণ মানুষের মাথা নিচু হয়। যখন ক্ষমতার দম্ভ আর ধর্মের অপব্যাখ্যা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন আসলেই মনে হয় হুমায়ুন আজাদের সেই আক্ষেপটাই সত্যি—সব কিছু চলে যাবে নষ্টদের দখলে। কারণ যে সংসদে নীতি-নির্ধারণ হওয়ার কথা, সেখানে এখন সহকর্মীদের শরীর নিয়ে ঠাট্টা আর কুৎসিত মিথ্যাচারের মহড়া চলে। আর সেই নোংরামির বিচার যখন মহান সংসদেও পাওয়া যায় না, তখন আমাদের গন্তব্য কেবল অন্ধকারের দিকেই এগোবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


