somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিএনপি কেন “গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশ” বাতিল করতে চায় ?

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


"গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিলের বিরোধিতা করলাম। এই অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত আমাদের এমন ধারণা দেয় যে বিএনপি গুমের মতো নিকৃষ্ট অপরাধের বিলোপ করতে উৎসাহী নয়। তারা কেন এটা বাতিল করতে চায় সে ব্যাপারে জাতিকে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাও দেয়নি। আমি ভীষণ হতাশ বোধ করছি।" বলেছেন একজন বিএনপি সমর্থক। যিনি দলটাকে ভালোবাসেন, ভোট দিতে চান, কিন্তু দলের এই সিদ্ধান্ত মানতে পারছেন না। এই একটা মন্তব্যই বলে দেয় গুম অধ্যাদেশকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক জটিলতা কত গভীর ।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে একটি গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ জারি করে। এর পেছনে কারণ ছিল। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ জাতিসংঘের গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশনে সই করে। সেই কনভেনশন অনুযায়ী গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক ছিল। অধ্যাদেশে গুমকে "চলমান অপরাধ" হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কাগজে কলমে এটা ছিল একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

এরপর এলো বিএনপি সরকার। সংসদের বিশেষ কমিটি সুপারিশ করল, এই অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন করা হবে না। ১০ এপ্রিলের পর এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারাবে। কিন্তু "বাতিল" শব্দটা মুখে আনা যাবে না। বলা হলো "পরে আরও শক্তিশালী করে আনা হবে।" এটা একটা চমৎকার কৌশল। সরাসরি "না" বললে সমালোচনা আসত। "পরে" বললে সমালোচনা আসে না, জবাবদিহিও লাগে না। "পরে" মানে কবে, কেউ জানে না। "পরে" মানে হয়তো কোনোদিনই না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য মুখ খুলেছে। তাদের বক্তব্য হলো "গুম একটি সংবেদনশীল অপরাধ, এর সঙ্গে শৃঙ্খলা বাহিনীর দায় সম্পৃক্ত।" এই স্বীকারোক্তিটুকু অন্তত সৎ। কিন্তু সমাধান হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে নিষ্ক্রিয়তা।

বিএনপির ভেতরে কিন্তু এই অধ্যাদেশ নিয়ে একটা বাস্তব টেনশন কাজ করছে। সরকারের আপত্তির জায়গাগুলো দেখলেই বোঝা যায়। তারা চায় জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্ব অনুমতি লাগবে। অর্থাৎ গুম হবে কিনা সেটা ঠিক করবে যে বাহিনী গুম করে, সেই বাহিনীর তদারককারী সরকারই। সিভিল সোসাইটি বলছে , যে কারণেই কাউকে আটক করা হোক, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে না আনলে সেটা সংবিধানের লঙ্ঘন। কিন্তু সংবিধানের লঙ্ঘন আর রাজনৈতিক সুবিধার মাঝখানে পড়লে বাংলাদেশের সরকারগুলো সবসময় দ্বিতীয়টা বেছে নেয়।

জামায়াত-এনসিপির অবস্থান এখানে আলাদা। কমিটিতে তারা ভিন্নমত দিয়েছে, বলেছে অধ্যাদেশ টিকিয়ে রাখতে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় তারা গুমের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো দলই নিঃস্বার্থভাবে মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়ায় না, এটা ইতিহাস বারবার বলেছে। জামায়াতের এই অবস্থানের পেছনে ঠিক কী হিসাব কাজ করছে, সেটা সময়ই বলবে।

এই পুরো ঘটনার মাঝে সবচেয়ে তিক্ত অধ্যায়টা হলো বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে। তিনি নিজে একজন গুমের শিকার। আওয়ামী লীগ আমলে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, নিপীড়ন করা হয়েছিল। সেই মানুষটির মন্ত্রণালয় থেকেই এখন সুপারিশ এসেছে, গুম প্রতিরোধের আইন এখনই দরকার নেই। বিরোধীদলীয় সদস্য রফিকুল ইসলাম খান এটাকে "খুবই দুঃখজনক" বলেছেন। দুঃখজনক শব্দটা কি আসলেই যথেষ্ট ?

আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী গুম হয়েছেন। মায়ের ডাক সংগঠনটি বিএনপির হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল, গুমের শিকার পরিবারগুলোর কান্না সামনে রেখে। সেই কান্না দিয়ে রাজনীতি হয়েছে, আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায় হয়েছে। আর এখন সেই একই দল ক্ষমতায় বসে গুম প্রতিরোধের আইনটা "পরে" বলে সরিয়ে রাখছে। এটা দেখে স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন মাথায় আসে , আওয়ামী লীগ আমলে আসলে কতজন সত্যিকার অর্থে গুমের শিকার হয়েছিলেন আর কতজনের গল্প ভিন্ন ছিল। স্বাধীন তদন্ত ছাড়া সেই উত্তর কোনোদিন মিলবে না। আর সেই তদন্তের আইনটা এখন "পরে" বলে বাদ পরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে , আর সেটা বিএনপির হাত ধরেই।

https://thedeltalens.com/national/news-details-189305

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কাউকে আটক করা হলে তা গুম নয় : যুক্তিতে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ- Delta Lens

সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০২
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দুর্ঘটনা নয়, এগুলো আগে থেকেই তৈরি করা মৃত্যু

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:০৫

চারপাশ থেকে কালো ধোঁয়া ঘিরে ধরছে। দুই চোখ প্রচণ্ড জ্বলছে । সুন্দর করে সাজানো হলরুমের প্লাস্টিক, ফোম, সিনথেটিক সবকিছু পুড়ে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে বিষাক্ত গ্যাসে। ঘরের অক্সিজেন প্রতি সেকেন্ডে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সব কিছু চলে গেছে নষ্টদের দখলে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৫৭


সংসদ ভবনের লাল ইটের দেয়ালগুলো যদি কথা বলতে পারত, তবে হয়তো তারা লজ্জায় শিউরে উঠত অথবা স্রেফ অট্টহাসি হাসত। আমাদের রাজনীতির মঞ্চটা ইদানীং এক অদ্ভুত সার্কাসে পরিণত হয়েছে, যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান যুদ্ধ: স্বাধীনতা নাম দিয়ে শুরু, এখন লক্ষ্য ইরানকে প্রস্তরযুগে নিয়ে যাওয়া

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:২৩


আমার আট বছরের ছেলে ফোনে ফেসবুক পাতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "বাবা, এটা কিসের ছবি"? আমি তার মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর বৃথা চেষ্টা করে অবশেষে বললাম, এটা আমেরিকা- ইসরায়েলের ইরানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি কেন “গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশ” বাতিল করতে চায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৮


"গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিলের বিরোধিতা করলাম। এই অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত আমাদের এমন ধারণা দেয় যে বিএনপি গুমের মতো নিকৃষ্ট অপরাধের বিলোপ করতে উৎসাহী নয়। তারা কেন এটা বাতিল করতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিখোঁজ সংবাদ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৫২



কাজকর্ম, রোজা, ঈদ, ছুটি, গ্রামের বাড়ি - সকল কিছুর পরেও আমি মাঝে মাঝেই ব্লগ পড়ি, পড়ার মতো যা লেখা ব্লগে প্রকাশিত হচ্ছে কম বেশি পড়ি। এখন তেমন হয়তো আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×