somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

৫৫ বছরে কেন আরেকটা রিফাইনারি হলো না ?

১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রাশিয়া থেকে তেল আনতে হলে আমেরিকার অনুমতি লাগবে। এই একটা বাক্য পড়লে অনেকে ভাববেন এটা কোনো রাজনৈতিক ভাষণের অংশ, কিংবা অতিরঞ্জন। কিন্তু এটা ২০২৬ সালের বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লেগেছে, হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ, বাংলাদেশে তেলের সংকট, আর এই সংকটে সস্তায় তেল কিনতে গেলে রাশিয়ার দিকে যেতে হয়। কিন্তু যাওয়া যাচ্ছে না। কারণটা এতটাই গভীরে প্রোথিত যে শুধু "আমেরিকার চাপ" বললে পুরো ছবিটা ভালোভাবে বোঝা যায় না।

১৯৬৩ সালের কথা । পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তীরে একটা তেল পরিশোধনাগার তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন, পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ীরা আর ব্রিটিশ কোম্পানি বার্মা অয়েল মিলে এটা বানাল। ফ্রান্সের কোম্পানি টেকনিপ নির্মাণ করল, ফরাসি অর্থায়নে। ১৯৬৮ সালে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড চালু হলো। বাংলাদেশ তখনো স্বাধীন না, আমরা তখনো পাকিস্তানের অধীনে। এই রিফাইনারিটাই আজ পর্যন্ত আমাদের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ৫৫ বছর কেটে গেছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ১৭ কোটি মানুষের অর্থনীতি। কিন্তু সেই পাকিস্তান আমলের রিফাইনারিটা এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, একা। দেশের মোট তেলের চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ সে পূরণ করতে পারে। বাকি ৮০ শতাংশ আসে বিদেশ থেকে, রিফাইন করা অবস্থায়। আর রিফাইন করা তেল সবসময় অপরিশোধিত তেলের চেয়ে দামি। প্রতি ব্যারেলে ৮ থেকে ১৫ ডলার বেশি। বছরের পর বছর ধরে এই বাড়তি খরচটা কোথাও না কোথাও যাচ্ছে, আমাদের পকেট থেকে বের হয়ে।

এখন প্রশ্ন হলো কেন পারিনি। এই "কেন"টা অনেক সহজ উত্তরে শেষ হয় না। অনেকে বলেন টাকা ছিল না। কিন্তু রাশিয়া রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১২ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল। ইচ্ছা থাকলে দ্বিতীয় রিফাইনারির জন্য দেড় বিলিয়ন ডলারও পাওয়া যেত। অনেকে বলেন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হয়নি। কিন্তু পরিকল্পনা হয়েছিল ২০১০ সালে, অনুমোদন হয়েছিল ২০১৩ সালে, একটানা একই সরকার ছিল পনেরো বছর। তবুও হয়নি।

আসল উত্তরটা আছে আন্তর্জাতিক ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স কর্পোরেশন, বা সংক্ষেপে আইটিএফসির অর্থায়নের ভেতর। এটা ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অংশ, সদর দপ্তর সৌদি আরবের জেদ্দায়। প্রতি বছর এই সংস্থাটা বাংলাদেশের পক্ষে সৌদি আরামকো আর আমিরাতের অ্যাডনকের কাছে তেলের দাম পরিশোধ করে। বাংলাদেশ পরে কিস্তিতে সেই টাকা ফেরত দেয়। ২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন নিজেই স্বীকার করেছে, আইটিএফসির সহায়তা ছাড়া তেল আমদানি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব না, কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এত বড় লেটার অব ক্রেডিট দিতে পারে না।

এখানেই আসল ফাঁদটা। আইটিএফসি শুধু ওআইসি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে কাজ করে। রাশিয়া ওআইসির সদস্য না। তারা নিজেরাই সরাসরি সৌদি আরামকো আর অ্যাডনককে পেমেন্ট করে বাংলাদেশের পক্ষে। মানে তেলের উৎসটাও তারা ঠিক করে দেয়। কোথাও লেখা নেই যে রাশিয়া থেকে কিনতে পারবে না। কিন্তু পুরো আর্থিক কাঠামোটাই এমনভাবে তৈরি যে রাশিয়া বা আফ্রিকার দেশগুলো থেকে কেনার কোনো ব্যবস্থাই নেই। এটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমান নিয়ন্ত্রণ, যেখানে কোনো নিষেধ লেখা থাকে না।

আজ , যদি দ্বিতীয় রিফাইনারি থাকত। তাহলে বাংলাদেশ নিজে ভারী অপরিশোধিত তেল কিনত, নিজে পরিশোধন করত। অপরিশোধিত ভারী তেল ইরাক থেকে আসুক, নাইজেরিয়া থেকে আসুক, কাজাখস্তান থেকে আসুক। এগুলোতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। প্রতি ব্যারেলে ৮ থেকে ১৫ ডলার সাশ্রয় হতো। বছরে ২০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আর আইটিএফসির উপর নির্ভরতাও কমে আসত, কারণ অপরিশোধিত তেল কিনতে অন্য ধরনের ঋণ পাওয়া যায়।

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার তেলের দাম বিশ্ববাজারে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেল। ভারত সেই সুযোগ নিল, চীন নিল। বাংলাদেশও চাইল। কিন্তু পরিশোধন ক্ষমতা নেই, তাই নেওয়া গেল না। ততদিনে রুপপুরের জন্য রাশিয়া ১২ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। সেই টাকার এক অষ্টমাংশও যদি রিফাইনারিতে দিত, দেশের চিত্র অন্যরকম হতো। রুপপুরে ১২ বিলিয়ন ডলার দিতে পারলে দেড় বিলিয়ন ডলারে রিফাইনারি কেন হলো না, এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অদক্ষতায় নয়, স্বার্থের হিসেবেও আছে।

ভারতের পাইপলাইনের ঘটনা এর সাথে জড়িত। শেখ হাসিনা সরকার ২০১৭ সালে চুক্তি করেছিল। আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ডিনাজপুরে ডিজেল আসবে পাইপলাইনে। ১৫ বছরের চুক্তি। অনেকে সমালোচনা করেছেন কেন ভারতের উপর এত নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু যদি একটু গভীরে ভাবি, হাসিনা সরকার হয়তো বাধ্য হয়েছিল। রাশিয়া থেকে সরাসরি নিতে পারছে না রিফাইনারি না থাকায়, আইটিএফসির গালফকেন্দ্রিক অর্থায়ন ব্যবস্থায় বিকল্প নেই, তখন ভারতের রিফাইনারিতে যদি রাশিয়ার ভারী তেল পরিশোধন হয়ে আসে, সেটাই সবচেয়ে সহজ রাস্তা ছিল। এখন ২০২৬ সালেও বর্তমান সরকার ভারতকে বলছে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল নুমালিগড়ে পরিশোধন করে বাংলাদেশে পাঠাও। মানে রাশিয়ার তেল পেতে হলেও ভারতের মাধ্যমে যেতে হচ্ছে।

এখন ২০২৬ সালে যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লাগল, বাংলাদেশ দেখল তার শক্তি নিরাপত্তার পুরো ভিত্তিটাই কতটা নড়বড়ে। কাতার ফোর্স ম্যাজর ঘোষণা করল, সৌদি সরবরাহ কমে গেল। হঠাৎ দেখা গেল রাশিয়া থেকে ছয় লাখ টন ডিজেল আনতে আমেরিকার কাছে অনুমতি চাইতে হচ্ছে। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বড় অংশ যায় আমেরিকায়। তাই রাশিয়ার সস্তা তেলের দিকে যাওয়া মানে আমেরিকার সাথে সংঘাত। তেলের সংকটে কোথায় যাবে সেই প্রশ্নের উত্তরও অন্যরা ঠিক করে দিচ্ছে।

সিঙ্গাপুরের কথা ভাবুন একবার। ১৯৬৫ সালে স্বাধীন হওয়া ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র, নিজের কোনো তেল নেই। কিন্তু আজ সিঙ্গাপুর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল পরিশোধন কেন্দ্র। অন্যের কাঁচা তেল এনে পরিশোধন করে বিক্রি করে। পাকিস্তান পর্যন্ত ছটা রিফাইনারি আছে। ভিয়েতনাম ১৯৭৫ সালের পর দুটো বানিয়েছে। আর বাংলাদেশ ১৯৬৮ সালের একটা রিফাইনারি নিয়ে ২০২৬ সালে বসে আছে। পাকিস্তান আমলের একটা রিফাইনারি দিয়ে আমরা স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার করলাম।

মূল সমস্যাটা হলো বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব শক্তি কূটনীতি গড়ে তোলেনি। আর্থিক স্বাধীনতা, বিকল্প পেমেন্ট চ্যানেল, নিজস্ব ঋণ ব্যবস্থা, এগুলো তৈরি না করে শুধু প্রকল্পের পর প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যেখানে অন্যরা অর্থায়ন করে, তাদের শর্তে। তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের পছন্দের উৎস থেকে পণ্য কিনতে হয়। এই চক্র থেকে বেরোতে হলে শুধু রিফাইনারি নয়, একটা সম্পূর্ণ আর্থিক কাঠামো দরকার যেটা বাংলাদেশের নিজের।

৫৫ বছরে এটা হয়নি। ইআরএল-২ শেষমেশ অনুমোদন পেয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। হলে ভালো। কিন্তু শুধু রিফাইনারি হলেই যথেষ্ট না। সেই রিফাইনারি চালাতে যে অপরিশোধিত তেল লাগবে, তার অর্থায়নের ব্যবস্থাও নিজেদের করতে হবে। নইলে আইটিএফসির জায়গায় অন্য কেউ আসবে, আবার তাদের শর্তে তাদের পছন্দের উৎস থেকে কিনতে হবে। ফাঁদটা বদলাবে, বের হওয়া যাবে না। এই ব্যর্থতার দায় কোনো একটা সরকারের না, প্রতিটা সরকারের। প্রশ্নটা শুধু তেলের না, এটা এই দেশের মানুষের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর।

জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার নির্মাণে আবার বিদেশি ঋণ চায় সরকার - প্রথম আলো ।

বন্ধ দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার: কতদিন চলবে এই সংকট? - ডেইলি যুগের আলো ।

ইস্টার্ন রিফাইনারির ২য় ইউনিটের দরপত্র মে মাসে, ২০২৯ সালে ট্রায়াল রান শুরুর লক্ষ্য: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী- টিবিএস রিপোর্ট

Photo card credit : Civic Circus

সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:০১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিজয় দিবস, সংবিধান, পহেলা বৈশাখ, পান্তা-মাছ কিছুই ভালো লাগে না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪১


ধরুন আপনি একদিন ঘুম থেকে উঠলেন আর সিদ্ধান্ত নিলেন যে আপনার চারপাশের সবকিছুই ভুল। ক্যালেন্ডারের তারিখ ভুল, রান্নাঘরের খাবার ভুল, দেশের সংবিধান ভুল, এমনকি বাইরে যে ঝড়ো হাওয়া বইছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অণুগল্প ; ম্যাজিক

লিখেছেন মোঃমোস্তাফিজুর রহমান তমাল, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:০৩


ছবি: জেমিনি
ঘ্রাণে পুরো ঘরটা মউ মউ করছে। ঘ্রাণ শুঁকেই তপু অনুমান করতে পারে, আজ খাবার প্রচন্ড সুস্বাদু হয়েছে। তার তখনই পেটে মোচড় দিয়ে ক্ষুধা লাগলো। তার আর তর সইছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরীক্ষায় নকল ও বাস্তবতা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:১৬



শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন সাহেবের বক্তব্য পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধের বিষয়টি গত কিছুদিন যাবত সোশ্যাল মিডিয়াতে খুব আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। এমনকি সামহো্য়্যারইন ব্লগেও সমালোচনা হয়েছে! বাংলাদেশে স্কুল কলেজ পরীক্ষা সহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইচ্ছেগুলো

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৩৩

ইচ্ছেগুলো অনিচ্ছেতে হঠাৎ বদলে যাক।
তোমায় পাওয়ার ইচ্ছে আমার অনিচ্ছেতে থাক।
ইচ্ছেরা সব ছুটি নিয়ে যাক না বহু দূরে।
অনিচ্ছেরা কাছে এলে হতেম ভবঘুরে।
মনের যত গোপন কথা মনের মাঝেই থাক।
ইচ্ছেগুলো অনিচ্ছেতে হঠাৎ বদলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-১১)

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৬:১৪



সূরাঃ ১১ হুদ, ৬৯ নং থেকে ৭৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৯। আমার ফিরিশতাগণ তো সুসংবাদ নিয়ে ইব্রাহীমের নিকট এসেছিল। তারা বলল, সালাম, সেও বলল, সালাম।সে অবিলমন্বে এক কাবাবকৃত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×