
ধরুন আপনি একদিন ঘুম থেকে উঠলেন আর সিদ্ধান্ত নিলেন যে আপনার চারপাশের সবকিছুই ভুল। ক্যালেন্ডারের তারিখ ভুল, রান্নাঘরের খাবার ভুল, দেশের সংবিধান ভুল, এমনকি বাইরে যে ঝড়ো হাওয়া বইছে সেটাও আসলে ভারতের চাপিয়ে দেওয়া। আপনি তখন কী করবেন? সম্ভবত ডাক্তারের কাছে যাবেন। কিন্তু ব্যারিস্টার ফুয়াদ সাহেব গেলেন টকশোতে।
সেখানে তিনি জাতিকে জানালেন যে ১৬ ডিসেম্বর আসলে বিজয় দিবস না। ওটা ভারতের চাপিয়ে দেওয়া একটা মিথ্যা দিন। আসল বিজয় হয়েছিল ১৯৭২ সালের মার্চে, যেদিন ভারতীয় সৈন্যরা চলে গিয়েছিল। এই কথা শুনে অনেকে ভাবলেন তাহলে কি নয় মাস যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধারা জানতেনই না কখন জিতেছেন? তাঁরা কি ডিসেম্বরে ভুল করে আনন্দ করেছিলেন আর মার্চে বুঝলেন আরে এইবার তো আসলেই জিতলাম? ফুয়াদ সাহেব অবশ্য এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পরের টকশোতে চলে গেলেন।
পরের টকশোতে তিনি সংবিধান নিয়ে বললেন। ১৯৭২ সালের সংবিধান নাকি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপভাবে লেখা সংবিধানগুলোর একটি। এমনকি এটা ভারতীয়রা লিখেছে বলেও তাঁর ধারণা। এই কথা শুনে আইনের ছাত্রছাত্রীরা একটু অবাক হলেন কারণ তাঁরা জানেন যে সংবিধানটা বাংলাদেশের নিজস্ব আইনজ্ঞরা লিখেছিলেন। কিন্তু ফুয়াদ সাহেব ব্যারিস্টার, তিনি মিডল টেম্পল থেকে পাস করেছেন, তাই তাঁর কথাই ঠিক হবে এই ভেবে অনেকে চুপ থাকলেন।
এরপর এলো পহেলা বৈশাখ। ফুয়াদ সাহেব দেখলেন মঙ্গল শোভাযাত্রায় ময়ূরের আকৃতি আছে, পেঁচা আছে, বাঘ আছে। এগুলো তাঁর চোখে হিন্দু দেবতার মতো দেখায়। এই যুক্তি ধরলে বাংলাদেশের যেকোনো চিড়িয়াখানাও হয়তো সাম্প্রদায়িক, কারণ সেখানেও ময়ূর আছে। তবে সে কথা থাক। ফুয়াদ সাহেবের আপত্তির পর সরকার বাহাদুর দ্রুত ব্যবস্থা নিলেন। মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদলে হলো বৈশাখী শোভাযাত্রা। ইউনেস্কো যদিও এখনও পুরনো নামেই চেনে, কিন্তু সেটা ইউনেস্কোর সমস্যা, আমাদের না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটা এলো পহেলা বৈশাখের দিন সকালে। ফুয়াদ সাহেব টকশোতে বসে জানালেন যে পান্তা ভাতের সাথে মাছ খাওয়া একটা চরম ফাতরামি। এই ফাতরামি নাকি আমরা শিখেছি বৈশাখী মেলা থেকে। এই কথা শুনে বাংলাদেশের লাখো কৃষক পরিবার একটু ধন্দে পড়লেন। তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোরবেলা মাঠে যাওয়ার আগে পান্তার সাথে শুঁটকি বা ছোট মাছ খেয়ে এসেছেন। তাঁরা জানতেনই না যে এতদিন ধরে তাঁরা ফাতরামি করে আসছেন। ফুয়াদ সাহেব অবশ্য নিজেও স্বীকার করেছেন যে তিনি হাজার বার পান্তা খেয়েছেন। দেশি পেঁয়াজ আর মরিচ দিয়ে। মাছ ছাড়া। কারণ মাছ দিয়ে খেলেই ফাতরামি, দেশি পেঁয়াজ দিয়ে খেলে সেটা বিশুদ্ধ দেশপ্রেম।
এইবার একটু থামা দরকার আর ভাবা দরকার। একজন মানুষ যাঁর বাবা নিজে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে দাবি করা হয়, তিনি একে একে বলছেন বিজয় দিবস ভুয়া, সংবিধান ভারতীয়দের লেখা, মঙ্গল শোভাযাত্রা হিন্দুয়ানি, আর পান্তার সাথে মাছ খাওয়া ফাতরামি। প্রতিটি কথাই বাংলাদেশের একটি করে পরিচয়ের গায়ে আঁচড় কাটছে। এটা কোনো দুর্ঘটনা মনে হয় না।
তবে ফুয়াদ সাহেবের মতো লোকদের জানা উচিত , বৈশাখ কারও অনুমতির জন্য অপেক্ষা করে না। এপ্রিল মাসে কালবৈশাখী আসবেই। গরমে মানুষ তরমুজ খাবেই। পান্তার সাথে মাছ যাঁরা খেতে চাইবেন তাঁরা খাবেনই। আর পাসপোর্টে প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিককে লিখতেই হবে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। সেই পাসপোর্ট বহন করবেন ফুয়াদ সাহেবও। আরবি নামের অর্থ খুঁজতে গিয়ে বাংলা অভিধানও খুলতে হবে তাঁকেই- কবি মারজুক রাসেল ।
পৃথিবীতে কিছু সত্য আছে যেগুলো টকশোর যুক্তিতে বদলায় না। মাছে ভাতে বাঙালি ছিলাম, আছি, থাকব। বৈশাখ আসবে প্রতি বছর, ঠিক যেভাবে এসেছে হাজার বছর ধরে। কেউ পালন না করলে বৈশাখের কিছু যায় আসে না, বৈশাখ নিজেই পালিত হয়। সমস্যা হয় শুধু তাঁদের, যাঁরা নিজেদের শিকড় থেকে এতটাই দূরে সরে গেছেন যে নিজের ঘরের খাবারটাকেও এখন অচেনা লাগে।
বি :দ্র : ফটো কার্ডটি জামাতের দেশ নামে একটা সাটায়ার নিউজ পেপার থেকে ধার করা হয়েছে ।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

