somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিজয় দিবস, সংবিধান, পহেলা বৈশাখ, পান্তা-মাছ কিছুই ভালো লাগে না

১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ধরুন আপনি একদিন ঘুম থেকে উঠলেন আর সিদ্ধান্ত নিলেন যে আপনার চারপাশের সবকিছুই ভুল। ক্যালেন্ডারের তারিখ ভুল, রান্নাঘরের খাবার ভুল, দেশের সংবিধান ভুল, এমনকি বাইরে যে ঝড়ো হাওয়া বইছে সেটাও আসলে ভারতের চাপিয়ে দেওয়া। আপনি তখন কী করবেন? সম্ভবত ডাক্তারের কাছে যাবেন। কিন্তু ব্যারিস্টার ফুয়াদ সাহেব গেলেন টকশোতে।

সেখানে তিনি জাতিকে জানালেন যে ১৬ ডিসেম্বর আসলে বিজয় দিবস না। ওটা ভারতের চাপিয়ে দেওয়া একটা মিথ্যা দিন। আসল বিজয় হয়েছিল ১৯৭২ সালের মার্চে, যেদিন ভারতীয় সৈন্যরা চলে গিয়েছিল। এই কথা শুনে অনেকে ভাবলেন তাহলে কি নয় মাস যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধারা জানতেনই না কখন জিতেছেন? তাঁরা কি ডিসেম্বরে ভুল করে আনন্দ করেছিলেন আর মার্চে বুঝলেন আরে এইবার তো আসলেই জিতলাম? ফুয়াদ সাহেব অবশ্য এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পরের টকশোতে চলে গেলেন।

পরের টকশোতে তিনি সংবিধান নিয়ে বললেন। ১৯৭২ সালের সংবিধান নাকি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপভাবে লেখা সংবিধানগুলোর একটি। এমনকি এটা ভারতীয়রা লিখেছে বলেও তাঁর ধারণা। এই কথা শুনে আইনের ছাত্রছাত্রীরা একটু অবাক হলেন কারণ তাঁরা জানেন যে সংবিধানটা বাংলাদেশের নিজস্ব আইনজ্ঞরা লিখেছিলেন। কিন্তু ফুয়াদ সাহেব ব্যারিস্টার, তিনি মিডল টেম্পল থেকে পাস করেছেন, তাই তাঁর কথাই ঠিক হবে এই ভেবে অনেকে চুপ থাকলেন।

এরপর এলো পহেলা বৈশাখ। ফুয়াদ সাহেব দেখলেন মঙ্গল শোভাযাত্রায় ময়ূরের আকৃতি আছে, পেঁচা আছে, বাঘ আছে। এগুলো তাঁর চোখে হিন্দু দেবতার মতো দেখায়। এই যুক্তি ধরলে বাংলাদেশের যেকোনো চিড়িয়াখানাও হয়তো সাম্প্রদায়িক, কারণ সেখানেও ময়ূর আছে। তবে সে কথা থাক। ফুয়াদ সাহেবের আপত্তির পর সরকার বাহাদুর দ্রুত ব্যবস্থা নিলেন। মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদলে হলো বৈশাখী শোভাযাত্রা। ইউনেস্কো যদিও এখনও পুরনো নামেই চেনে, কিন্তু সেটা ইউনেস্কোর সমস্যা, আমাদের না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটা এলো পহেলা বৈশাখের দিন সকালে। ফুয়াদ সাহেব টকশোতে বসে জানালেন যে পান্তা ভাতের সাথে মাছ খাওয়া একটা চরম ফাতরামি। এই ফাতরামি নাকি আমরা শিখেছি বৈশাখী মেলা থেকে। এই কথা শুনে বাংলাদেশের লাখো কৃষক পরিবার একটু ধন্দে পড়লেন। তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোরবেলা মাঠে যাওয়ার আগে পান্তার সাথে শুঁটকি বা ছোট মাছ খেয়ে এসেছেন। তাঁরা জানতেনই না যে এতদিন ধরে তাঁরা ফাতরামি করে আসছেন। ফুয়াদ সাহেব অবশ্য নিজেও স্বীকার করেছেন যে তিনি হাজার বার পান্তা খেয়েছেন। দেশি পেঁয়াজ আর মরিচ দিয়ে। মাছ ছাড়া। কারণ মাছ দিয়ে খেলেই ফাতরামি, দেশি পেঁয়াজ দিয়ে খেলে সেটা বিশুদ্ধ দেশপ্রেম।

এইবার একটু থামা দরকার আর ভাবা দরকার। একজন মানুষ যাঁর বাবা নিজে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে দাবি করা হয়, তিনি একে একে বলছেন বিজয় দিবস ভুয়া, সংবিধান ভারতীয়দের লেখা, মঙ্গল শোভাযাত্রা হিন্দুয়ানি, আর পান্তার সাথে মাছ খাওয়া ফাতরামি। প্রতিটি কথাই বাংলাদেশের একটি করে পরিচয়ের গায়ে আঁচড় কাটছে। এটা কোনো দুর্ঘটনা মনে হয় না।

তবে ফুয়াদ সাহেবের মতো লোকদের জানা উচিত , বৈশাখ কারও অনুমতির জন্য অপেক্ষা করে না। এপ্রিল মাসে কালবৈশাখী আসবেই। গরমে মানুষ তরমুজ খাবেই। পান্তার সাথে মাছ যাঁরা খেতে চাইবেন তাঁরা খাবেনই। আর পাসপোর্টে প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিককে লিখতেই হবে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। সেই পাসপোর্ট বহন করবেন ফুয়াদ সাহেবও। আরবি নামের অর্থ খুঁজতে গিয়ে বাংলা অভিধানও খুলতে হবে তাঁকেই- কবি মারজুক রাসেল ।

পৃথিবীতে কিছু সত্য আছে যেগুলো টকশোর যুক্তিতে বদলায় না। মাছে ভাতে বাঙালি ছিলাম, আছি, থাকব। বৈশাখ আসবে প্রতি বছর, ঠিক যেভাবে এসেছে হাজার বছর ধরে। কেউ পালন না করলে বৈশাখের কিছু যায় আসে না, বৈশাখ নিজেই পালিত হয়। সমস্যা হয় শুধু তাঁদের, যাঁরা নিজেদের শিকড় থেকে এতটাই দূরে সরে গেছেন যে নিজের ঘরের খাবারটাকেও এখন অচেনা লাগে।

বি :দ্র : ফটো কার্ডটি জামাতের দেশ নামে একটা সাটায়ার নিউজ পেপার থেকে ধার করা হয়েছে ।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪৬
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আইএমএফ কেন ঋণের কিস্তি আটকে দিতে চায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:০৩


একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে: "যে ব্যক্তি অর্থনীতি বোঝে না, সে রাজনীতিও বোঝে না।" বাংলাদেশের গত কয়েক বছরের পরিস্থিতি দেখলে মনে হয়, এই প্রবাদটি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ বিকেল Last Afternoon

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:০৫

এই পৃথিবীতে শেষ বিকেলে আমরা কেটে ফেলি দিনগুলো
আমাদের শরীর থেকে, আর গুনি সেই হৃদয়গুলো যা আমরা নিয়ে যাব
এবং যেগুলো যাব এখানে রেখে। সেই শেষ বিকেলে
আমরা কোনো কিছুকে বিদায় বলি না,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফাউ খাওয়ার ফাঁদ

লিখেছেন আবু সিদ, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৯

এ পাড়ায় দশ - বারো জন ছেলেপেলে মিলে আমরা খেলাধুলা করি। খেলা মানে নানান ধরনের খেলা। তার মধ্যে ফুটবল আর ক্রিকেট বেশি। আমাদের কারও ওরকম খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন নেই। তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজয় দিবস, সংবিধান, পহেলা বৈশাখ, পান্তা-মাছ কিছুই ভালো লাগে না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪১


ধরুন আপনি একদিন ঘুম থেকে উঠলেন আর সিদ্ধান্ত নিলেন যে আপনার চারপাশের সবকিছুই ভুল। ক্যালেন্ডারের তারিখ ভুল, রান্নাঘরের খাবার ভুল, দেশের সংবিধান ভুল, এমনকি বাইরে যে ঝড়ো হাওয়া বইছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরীক্ষায় নকল ও বাস্তবতা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:১৬



শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন সাহেবের বক্তব্য পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধের বিষয়টি গত কিছুদিন যাবত সোশ্যাল মিডিয়াতে খুব আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। এমনকি সামহো্য়্যারইন ব্লগেও সমালোচনা হয়েছে! বাংলাদেশে স্কুল কলেজ পরীক্ষা সহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×