somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কারখানা তো রাজনীতি করে না !

২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ২:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


৫ই আগস্ট ২০২৪ তারিখটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেকদিন মনে থাকবে। কিন্তু ইতিহাসের বড় বাঁকগুলোর মতো এই পরিবর্তনেরও একটা দাম ছিল, যেটার হিসাব আমরা এখনও পুরোপুরি মেলাতে পারিনি। ক্ষমতার পতনের উল্লাসের আড়ালে যা ঘটেছিল, তার ধাক্কা কোনো একটা রাজনৈতিক দলের গায়েই শুধু লাগে নি । সেটা গিয়ে লেগেছে পুরো দেশের অর্থনীতিতে, লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে। সেদিনের সবচেয়ে বড় ক্ষতির জায়গাগুলোর একটা ছিল রূপগঞ্জের গাজী টায়ার কারখানা।

সেদিনের দৃশ্যটা এখনও ভুলিনি। আনন্দ মিছিল শেষে যখন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের দিকে ফিরছিলাম, চোখে পড়ল গাজী গ্রুপের কারখানাগুলো ঘিরে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। শুধু রাজনৈতিক কর্মী নয়, সেখানে ছিল দোকানদার, দিনমজুর, ভিক্ষুক পর্যন্ত। যার যা নেওয়ার সুযোগ হয়েছে, নিয়েছে। কেউ মেশিনের পার্টস খুলে নিয়ে গেছে, কেউ লোহার রড, কেউ টায়ার, কেউ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ। এরপর শুরু হয়েছে আগুন দেওয়া। বিশাল কারখানার দেয়াল হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। ৬ই আগস্টও লুটপাট চলেছে। টায়ার ভাগাভাগি নিয়ে একদল টোকাই আর দুর্বৃত্তের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ পর্যন্ত হয়েছে। যে নিজের চোখে দেখেনি, তার পক্ষে এই ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রাটা আসলে ঠিকমতো ধরা কঠিন।

মানুষের ক্ষোভের কারণ ছিল না এটা বলছি না। গোলাম দস্তগীর গাজীর বিরুদ্ধে বহুদিন ধরে অভিযোগ ছিল যে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এলাকার মানুষের জমি কম দামে বা জোর করে নেওয়া হয়েছে। সেই ক্ষোভ বছরের পর বছর ধরে মানুষের মনে জমে ছিলো । প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। গাজী গ্রেপ্তার হওয়ার পর জমির মালিকরা ফেরতের দাবিতে একজোট হন। মসজিদের মাইকে মানুষ ডাকার ঘটনাও শোনা গেছে। অর্থাৎ রাগের একটা বাস্তব ভিত্তি ছিল, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একজন মানুষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ কি তার সচল কারখানা জ্বালিয়ে দেওয়ার অধিকার দেয়?

কারখানা কোনো রাজনীতি করে না। ভোটও দেয় না। কারখানা শুধু মানুষের কাজের ব্যবস্থা করে। মালিক অন্যায় করলে আইন আছে, বিচার আছে। কিন্তু হাজার হাজার শ্রমিকের সংসার চলে যে কারখানায়, সেটা পুড়িয়ে দিলে শাস্তিটা আসলে কার হয়? সেই শ্রমিকের, যে মাস শেষে বেতন পেয়ে বাড়িতে টাকা পাঠান ।

গাজী টায়ারের বেলায় সেটাই হয়েছে। শ্রমিকরা চাকরি হারিয়েছেন, বেতন আটকে গেছে, অসংখ্য পরিবার অনিশ্চয়তার ভেতরে পড়েছে। শুধু শ্রমিকরাই নন, পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চাকা থেমে গেছে। রূপগঞ্জে যে হাজার হাজার পরিযায়ীী শ্রমিক কাজ করার জন্য এসেছিলেন, তাদের অনেককেই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাড়িওয়ালাদের ওপর, দোকানদারদের ওপর, পরিবহন শ্রমিকদের ওপর, চায়ের দোকান থেকে মুদি দোকান পর্যন্ত সবার ওপর। একটা কারখানা ধ্বংস হওয়া মানে শুধু একটা ভবন পোড়া নয়, পুরো একটা এলাকার জীবন থমকে যাওয়া।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এই ক্ষতি দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী নিজেই স্বীকার করেছেন যে এত রোডশো, বিনিয়োগ সম্মেলন আর প্রচারণার পরও প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি। জাপানের একটি শীর্ষ থিঙ্কট্যাঙ্কের বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন গাজী টায়ার ধ্বংসের দৃশ্য দেখে জাপানি বিনিয়োগকারীরা রীতিমতো হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এখনও বাংলাদেশে বিনিয়োগের কথা উঠলে এই ঘটনার কথা উঠে আসে। বিদেশি বিনিয়োগকারীর প্রশ্নটা আসলে একেবারে সহজ, যে দেশের মানুষ নিজেদের চালু কারখানা রক্ষা করতে পারে না, সেখানে কোটি কোটি টাকা ঢালা কতটা নিরাপদ?

এর চেয়েও বড় একটা বিড়ম্বনা আছে। যে টায়ার কারখানা আমরা নিজেরাই জ্বালিয়ে দিলাম, সেই একই টায়ার এখন বেশি দামে বিদেশ থেকে আনতে হচ্ছে। আর সেই বাড়তি দামটা শেষমেশ কে দিচ্ছে? রিকশাচালক দিচ্ছে, ভ্যানচালক দিচ্ছে, মোটরসাইকেলওয়ালা দিচ্ছে, ছোট ব্যবসায়ী দিচ্ছে। প্রতিশোধের আনন্দ সেদিনই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু দামটা এখনও দিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। শত্রুকে শাস্তি দিতে গিয়ে আমরা কখন নিজের পায়েই কুড়াল মারি, সেটা নিজেরাও টের পাই না ।

বাংলাদেশের মিডিয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আর দলীয় ঝগড়াই সবচেয়ে বেশি জায়গা পায়। অর্থনীতি, শিল্প, কর্মসংস্থান এই বিষয়গুলো মানুষের মনোযোগে খুব একটা আসে না। অথচ একটা দেশ দীর্ঘমেয়াদে কেমন থাকবে সেটা এই বিষয়গুলোই ঠিক করে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হারানো যায় নির্বাচনে, আদালতে, আইনের মাধ্যমে। কিন্তু একটা কারখানা একবার ধ্বংস হলে সেটা গড়তে বছরের পর বছর লেগে যায় ।

সাংবাদিকদের এখানে একটা বড় দায়িত্ব আছে। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য আর দলাদলির খবর দিলে হবে না, শিল্প ধ্বংসের খবর, বিনিয়োগ সংকটের খবর, কর্মসংস্থান হারানোর খবর সেগুলোও মানুষের সামনে আনতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে একটা কারখানা শুধু মালিকের সম্পদ নয়, সেটা হাজার পরিবারের সংসার, একটা এলাকার প্রাণ, আর বাইরের দুনিয়ার কাছে এই দেশের পরিচয়।

গাজী টায়ারের ঘটনাকে তাই শুধু একটা রাজনৈতিক প্রতিশোধের গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা অর্থনৈতিক শিক্ষা, একটা সামাজিক শিক্ষা, এবং রাষ্ট্রের জন্য একটা সতর্কসংকেত। জমি দখল হলে বিচার হোক, ক্ষমতার অপব্যবহার হলে বিচার হোক, সেটা অবশ্যই হওয়া দরকার। কিন্তু বিচার আর প্রতিশোধ একই জিনিস নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে যদি আমরা নিজেরাই কারখানা জ্বালাই, মানুষের কাজ পুড়িয়ে দিই, আর সারা বিশ্বের সামনে নিজেদের একটা অস্থির দেশ হিসেবে দেখাই, তাহলে শেষমেশ ক্ষতি কোনো একক ব্যক্তির হয় না। ক্ষতিটা হয় পুরো বাংলাদেশের।


বিদেশি বিনিয়োগের ‘আশায় গুড়েবালি’ ও গাজী টায়ার ট্র্যাজেডি-বিডিনিউজ২৪

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারীতে এই বিষয়ে লেখা আমার ব্লগের লিংক : Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে যে-সব সাবেক চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবার সম্ভাবনা একেবারেই নাই

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২

এ দলটি ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৪ সালে তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। ২০১৮ ও ২০২২ সালে তারা মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহা! ছবি।

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২৮ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০০

কত দিন হয়ে গেলো....................


এ মাসেতো একটাও পোস্ট দেওয়া হলো না........................


ইদে গ্রামের বাড়ি গিয়ে কিছু ছবি তুলেছিলাম।







আজকের ছবি ব্লগে থাকছে সেই ছবিগুলো।








---------------------------------------------------
































---------------------------------------------------------------



















------------------------------------------------------------------






















... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

মেট্রোরেল পুরো বাংলাদেশের জন্য শান্তির বিষয়।
শুধু মেট্রোরেল না পদ্মাসেতুও। দারুণ এক কাজ হয়েছে। আগে মতিঝিল থেকে মিরপুর বা উত্তরা যেতে খবর হয়ে যেতো। তিন ঘন্টার বেশি সময় লাগতো। এখন মুহুর্তেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারণে অকারণে ছবি

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬

আমি ছবি তুলি। পরে সেগুলো দেখি। বেশ ভালো লাগে। ফোনের স্টোরেজ এ আজ দেখলাম মোট ছবি ৬৮৯৩ টি। ব্লগে কখনোই ছবি দিয়ে লেখা হয়নি। আজ মাইদুল ভাইয়ের লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ বাবার প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন সামিয়া, ২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:০৩



একটা মাস হয়ে গেল।
ইউনাইটেড হাসপাতালের সিসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছে রিপা। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, নার্সরা ডিউটি বদলাচ্ছে, ডাক্তাররা আসছেন, যাচ্ছেন। শুধু একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×