somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কোটা আন্দোলনের পর নারায়ণগঞ্জের মানুষ কেমন আছে ?

০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


২০২৩ সালের নভেম্বর। ঢাকার কোলাহল পেছনে ফেলে আমরা যখন নারায়ণগঞ্জে পা রাখলাম, আমাদের চোখে তখন স্থায়ী ঠিকানার স্বপ্ন। ঢাকায় জমি দখল হয়ে গেছে, ফেনীর জমি জোর করে কেড়ে নিয়েছে এক প্রভাবশালী নেতা। সহায়-সম্বলহীন আমাদের শেষ ভরসা ছিল নারায়ণগঞ্জের এই এক চিলতে জমি। পরিকল্পনা ছিল এখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে, কয়েকটা ঘর ভাড়া দিয়ে সংসারটা অন্তত সচ্ছলভাবে চলবে। চট্টগ্রাম-নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ জানে, নিজের ভিটেমাটি না থাকলে আত্মীয়-স্বজনের কাছেও কদর নেই। তাই এই জমিটুকু ছিল আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।

ভাড়াটিয়া হিসেবে যে বাড়িতে উঠলাম, তার মালিক ছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা গোলাম দস্তগীর গাজীর ঘনিষ্ঠ সহচর। তখন কি জানতাম, এই বাড়ি থেকেই একদিন জুলাইয়ের কোটা আন্দোলন দেখব? কে জানত, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সরকারকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে? জীবন সত্যিই বড় বিচিত্র। আজ গাজী কারান্তরীণ, আর তার সেই ঘনিষ্ঠ সহচর এখন পলাতক। জুন-জুলাই নাগাদ বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু তখনই চারদিকে বিদ্রোহের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে। আমাদের এলাকাটি ছিল শ্রমিক অধ্যুষিত; কারখানা ঘিরে গড়ে ওঠা বস্তিতে হাজারো মানুষের বাস। হঠাৎ এলো ৫ই আগস্ট।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে দেখলাম গাজীর কারখানায় হামলা হয়েছে। প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিকের অন্নসংস্থানের এই বিশাল কারখানাটি যখন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, বুকটা কেঁপে উঠল। দেখলাম বিশাল হাতুড়ি দিয়ে কারখানার দেয়াল ভাঙা হচ্ছে। শোনা গেল, ক্ষমতার দাপটে অবৈধভাবে জমি দখল করে কারখানা বাড়ানো হয়েছিল। চারদিকে এক চরম আতঙ্ক। অতল বিস্ময়ে দেখলাম, একদল মানুষ দেশপ্রেমের আবরণে লুটপাটে মত্ত। তারা ছাত্র নয়; তারা আশপাশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বস্তিবাসী, চালক কিম্বা ভবঘুরে। নিজের দেশের সম্পদ তারা পরম উল্লাসে ধ্বংস করছে। গাজীর ফ্যাক্টরির টায়ার থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ—সব লুট হয়ে যাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত ছিল স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহল। সবাই মিলে যেন এক ‘লুটতরাজ উৎসবে’ মেতেছে।

পরদিন সকালে এক সেলুনে গিয়ে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হলো। এলাকার সিংহভাগ মানুষ যখন সেই পরিত্যক্ত কারখানায় লুটপাটে ব্যস্ত, এমনকি দোকানদাররাও দোকান বন্ধ করে গেছে চুরির মালামাল সস্তায় কিনতে, তখন সেই হিন্দু নাপিত স্থির হয়ে নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "দাদা, আপনি গেলেন না?" তিনি নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিলেন, "না দাদা, অন্যের সম্পদ মেরে খাই না। আমি কর্ম করে খাই।" সেই দৃশ্যটি আজীবন মনে থাকবে। অন্যদিকে দেখলাম ভিখারিরা কারখানার বড় বড় প্লাস্টিকের পানির ট্যাংক টেনে নিয়ে আসছে আর স্থানীয় দোকানে পানির দামে বিক্রি করে দিচ্ছে। একটা গোটা জনপদ কীভাবে এভাবে নীতিভ্রষ্ট হয়ে পড়ে, ভাবতেই শিউরে উঠি।

এর কিছুকাল পর শুরু হলো পরিণাম। কারখানার শ্রমিকরা যখন দেখল তাদের রুটি-রুজির আধার শেষ হয়ে গেছে, তারা প্রতিরোধের চেষ্টা করল। কিন্তু যা হারিয়ে গেছে, তা আর ফেরানো সম্ভব ছিল না। অচিরেই আশপাশের আরও কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। হাজার হাজার শ্রমিক রাতারাতি কর্মহীন হয়ে পড়ল। এলাকাটি যেহেতু শ্রমিকদের ঘিরেই চলত, তাই স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামল। যেসব দোকানদার লুটপাটে অংশ নিয়েছিল, তাদের কাছে শ্রমিকদের বড় অংকের টাকা বকেয়া ছিল। সেই শ্রমিকরা যখন নিঃস্ব হয়ে এলাকা ছাড়ল, তখন সেই দোকানদারদের কপালে হাত। একেই হয়তো বলে কর্মফল।

আমাদের স্বপ্নও মুখ থুবড়ে পড়ল। শ্রমিক নেই, তাই নতুন ঘর তুলে ভাড়া দেওয়ার আশা নেই। শেষমেশ আব্বা-আম্মা ঢাকা ফিরে গেলেন, আর আমি জীবিকার প্রয়োজনে অন্যত্র পাড়ি দিলাম। তবে মানুষের আশার কি শেষ আছে? এখন ভাবি, যদি কখনো ঢাকার সেই হৃত জমিটুকু ফিরে পাই!

সমকালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জের এই ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতির চিত্রটি স্পষ্ট হয়েছে। ডাব বিক্রেতা থেকে বড় পাইকারি আড়তদার—সবার কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। যে চালের বাজারে হাজার কোটি টাকার লেনদেন হতো, সেখানেও আজ মন্দার কালো ছায়া। গত দুই বছরে ব্যবসা প্রায় ২০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে অসংখ্য আটাকল। কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় পাটের শহর হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের সেই ঐতিহ্য আজ মলিন। রড ও নিট গার্মেন্ট খাতের দুর্দশায় লক্ষাধিক মানুষ আজ বেকার।

এই অর্থনৈতিক সংকটের বিষবাষ্প এখন সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে। সঞ্চয় হারিয়ে মধ্যবিত্ত যখন নিঃস্ব, তখন শ্রমজীবী মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই বা চুরির মতো অপরাধে। আমি স্বচক্ষে দেখেছি কীভাবে একবেলার পেটের ক্ষুধা একজন সাধারণ মানুষকে অপরাধী করে তোলে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বাইরের ব্যবসায়ীরা এখন নিতাইগঞ্জের মতো বড় পাইকারি বাজারে আসতে ভয় পাচ্ছেন। এর ওপর যুক্ত হয়েছে ঋণের উচ্চ সুদহার আর গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট। সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৫ই আগস্টের সেই লেলিহান শিখা আর লুটতরাজের দৃশ্য আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে যে, ধ্বংস করা সহজ কিন্তু গড়া খুব কঠিন। সেই নাপিতের কথাটি আজও কানে বাজে—কর্মই একমাত্র পথ। যারা সেদিন লুটে মত্ত ছিল, আজ তারাই অভাবের তাড়নায় হাহাকার করছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের পথে। আগামী দিনের নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রার্থনা—তারা যেন পূর্ববর্তী ভুলের পুনরাবৃত্তি না করেন। অর্থনীতির এই ক্ষয়ে যাওয়া চাকা সচল করাই হোক তাদের প্রথম কাজ। আমরা ঢাকা ছেড়েছিলাম স্বপ্ন নিয়ে, ফিরেছি দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে। তবুও 'হয়তো'র ওপর ভর করেই আমরা বেঁচে থাকি। হয়তো একদিন ঢাকার জমি ফিরে পাব, হয়তো নারায়ণগঞ্জ আবার কর্মচঞ্চল হবে, হয়তো দেশটা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। এই 'হয়তো'টুকুই এখন আমাদের একমাত্র সম্বল।

সমকাল : দেশের মুখচ্ছবি নারায়ণগঞ্জের দর্পণে ।
সমকাল: নারায়ণগঞ্জে ব্যবসায় মন্দা

সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৩:১২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমরা যেন পারষ্পরিক সম্মান আর ভালোবাসায় বাঁচি....

লিখেছেন জানা, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৪২



প্রিয় ব্লগার,

শুভেচ্ছা। প্রায় বছর দুয়েক হতে চললো, আমি সর্বশেষ আপনাদের সাথে এখানে কথা বলেছি। এর মধ্যে কতবার ভেবেছি, চলমান কঠিন সব চিকিৎসার ফলে একটা আনন্দের খবর পেলে এখানে সবার সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালাদেশের নির্বাচনী দৌড়ে বিএনপি–জামায়াত-এনসিপি সম্ভাব্য আসন হিসাবের চিত্র: আমার অনুমান

লিখেছেন তরুন ইউসুফ, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৩



বিভিন্ন জনমত জরিপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা এবং মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা বিশ্লেষণ করে ৩০০ আসনের সংসদে শেষ পর্যন্ত কে কতটি আসন পেতে পারে তার একটি আনুমানিক চিত্র তৈরি করেছি। এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম পরে, আগে আল্লাহ্‌কে মনে রাখো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:৩৭

প্রিয় শাইয়্যান,
পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্‌কে তুমি যখন সবার আগে স্থান দিবে, তখন কি হবে জানো? আল্লাহ্‌ও তোমাকে সবার আগে স্থান দিবেন। আল্লাহ্‌ যদি তোমার সহায় হোন, তোমার আর চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনঃ কেন আমি বিএনপিকে ভোট দিবো?

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২৯



আসছে ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন হবে বিতর্কমুক্ত এবং উৎসবমুখর পরিবেশে। আমার অবশ্য এই দুই ব্যপারেই দ্বিমত... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ - আবারও পড়লাম!

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আহমদ ছফা'র ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটা আরাম করে পড়ার মতো না। এটা এমন এক আয়না, যেটা সামনে ধরলে মুখ সুন্দর দেখাবে- এমন আশা নিয়ে গেলে হতাশ হবেন। ছফা এখানে প্রশংসা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×