somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভারত ছাড়া আমাদের চলেই না ....

০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ছবিতে যাকে দেখছেন তিনি জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হোসেন টুকু। জুলাইয়ের বিশ তারিখের পর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না, কোথায় ছিলেন কী করছিলেন কেউ জানত না। আজ হঠাৎ তিনি ফিরে এলেন, আর ফিরেই একেবারে শব্দবোমা ফাটালেন। ভারতের হাইকমিশনারের কাছে আরও বেশি ডিজেল চেয়ে বসলেন তিনি। ব্যস, টুকু সাহেব রাতারাতি ভাইরাল হয়ে গেলেন।

গতকালই বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল তুঙ্গে। শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল মিটিংকে ঘিরে যে মাত্রার ভাঙচুর বা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তেমন কিছুই আসলে ঘটেনি। আর ঠিক তার পরদিন সকালেই টুকু সাহেব হাজির হলেন, খবর দিলেন যে ভারতের কাছে ডিজেল চেয়েছেন। তাকে ধন্যবাদ জানানো উচিত, কারণ এভাবেই বোধহয় তিনি ভারতীয় আধিপত্যের মোকাবেলা করে যাচ্ছেন।

অথচ দেশে যখন গ্যাস আর বিদ্যুৎ সংকট চলছিল, তখন এই মানুষটাকে কোথাও দেখা যায়নি। খোদ বিএনপির নিজের লোকজনই শুরু থেকে তার কাজের মান নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। হয়তো জ্বালানি বিষয়ে তিনিই বিএনপির সবচেয়ে যোগ্য মানুষ, কিন্তু তার অতীতের রেকর্ড নিয়ে মানুষের মনে দুশ্চিন্তা থেকেই যায়। শোনা যায় আগের আমলেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে অন্যের কথায় হতাশ হয়ে বসে থাকতে চাই না। শাহরুখ খানের এক ছবির সংলাপ মনে পড়ে, পৃথিবী সবাইকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। সেই বিশ্বাস থেকেই চাই টুকু সাহেব সফল হোন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার জ্বালানি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কোনো পত্রিকায় বা কোনো সাক্ষাৎকারে চোখে পড়েনি।

এই মানুষটাই আজ ডিজেল চাইতে গিয়ে অন্তর্জালে ভাইরাল হয়ে গেলেন। গণমাধ্যম এই খবর প্রচার করে মিলিয়ন ভিউ কামিয়ে নিয়েছে। পালিয়ে থাকা লীগ নেতারা গর্তের ভেতর থেকেই উল্লাস করছে আর বলাবলি করছে , আমাদের নেত্রীর দূরদর্শিতাতেই আজ তারা ভারত থেকে হাত পেতে তেল আনার সুযোগ পাচ্ছে। আর টুকু সাহেবও যেন নিজের কাজ দিয়ে আওয়ামী লীগের সেই মিথ্যা বয়ানকেই সত্যি প্রমাণ করার জন্য মাঠে নেমে পড়েছেন।

ভারত থেকে আমরা মোট কত ডিজেল আনি? বছরে মাত্র চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টন। অথচ টুকু সাহেবের কথা শুনলে মনে হয় দেশের পুরো ডিজেলের জোগানই বুঝি ভারত থেকে আসে। সাধারণ মানুষ এত হিসাব নিয়ে মাথা ঘামায় না, তারা সহজেই একটা মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত গল্পে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। দেশে মোট ডিজেলের চাহিদা প্রায় ষাট লাখ টন। বাকি ডিজেল আমরা নিজেরা পরিশোধন করি অথবা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করি, কিন্তু সেই খবর কখনো এভাবে ভাইরাল হয় না। অথচ সংকট যখন চরমে ওঠে, গ্যাস আর বিদ্যুতের হাহাকারে দেশের মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা হয়, তখন টুকু সাহেবের টিকিটির দেখা মেলাও ভার ।

এদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় প্রকল্পের খবর কে রাখে ? সর্বশেষ যা জানা গিয়েছিল তা হলো ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এক বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দেবে। সরকারের তরফ থেকে নাকি সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে গেছে, কাজ শুরু হবে ২০২৭ সালে আর শেষ হবে ২০৩০ সালে । পুরো প্রকল্পের খরচ পড়বে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকা। আইডিবির ঋণ বাদ দিলে বাকি টাকা কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে কোথাও কোনো আলোচনা নেই। টুকু সাহেবের মাথায় এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা তাও অজানা। ইপিসি ঠিকাদার খোঁজার জন্য টেন্ডার দেওয়া হয়েছিল বলে শোনা গিয়েছিল, কিন্তু তার কোনো আপডেট আজও চোখে পড়েনি। প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্বে আছে একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান, ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড।

এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সাল থেকে এই রিফাইনারির পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে। দশ বছর ধরে দায়িত্বে থেকেও প্রকল্পের কাজ কার্যত এগোয়নি। অথচ পরামর্শক ফি বাবদ ডলারে টাকা তারা ঠিকই নিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে বিপিসিএল যখন নুমালিগড় রিফাইনারিতে তাদের সাড়ে একষট্টি শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দেয়, তখন অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড আর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের একটি জোট সেই শেয়ার কিনে নেয়। ফলে ইআইএল নুমালিগড়ে সরাসরি প্রায় সাড়ে চার শতাংশ শেয়ারের মালিক হয়ে যায়, আর সেই মালিকানা আজও বহাল আছে।

বাংলাদেশের এই রিফাইনারি প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে নুমালিগড় রিফাইনারিরও শেয়ারহোল্ডার, যে রিফাইনারি থেকেই পাইপলাইনে বাংলাদেশে ডিজেল রপ্তানি হয়। এখানেই একটা স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। যে প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের নিজস্ব রিফাইনিং সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্পে গতি এনে দেওয়ার দায়িত্বে আছে, সেই একই প্রতিষ্ঠানের নিজের বিনিয়োগ আছে এমন এক রিফাইনারিতে, যেটার ব্যবসা কমে যাবে যদি বাংলাদেশের নিজের রিফাইনারি সফল হয়। তাহলে এই প্রতিষ্ঠানের আসলেই কি প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সদিচ্ছা থাকে, এই প্রশ্ন তোলাটা মোটেও অযৌক্তিক নয়।

এর মানে এই নয় যে ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করানো হয়েছে। তবে এই কাঠামোগত স্বার্থের সংঘাত নিয়ে পাবলিক অডিট বা সংসদীয় তদন্ত হওয়া দরকার, এটা একেবারেই যৌক্তিক দাবি। সরকার থেকে সরকার পর্যায়ের এমন পরামর্শক নিয়োগে সাধারণত স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ করা আর নিয়মিত স্বাধীন পর্যালোচনা হওয়া উচিত ছিল। বাংলাদেশে এই ধরনের কোনো প্রকাশ্য পর্যালোচনা এই সরকারের আমলে দেখা যায়নি।

ভারত থেকে ডিজেল আনার এই পুরো প্রক্রিয়াটা আসলে দুই দিক থেকেই লোকসানের। একদিকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড দশ বছর ধরে পরামর্শক ফি বাগিয়ে বসে আছে অথচ প্রকল্পের কাজ এগোয়নি। অন্যদিকে ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশ ভারত থেকে, বিশেষ করে নুমালিগড় থেকে, ডিজেল আমদানি ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে, যেখানে সেই একই ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের শেয়ার রয়েছে। যদি রিফাইনারি প্রকল্পটা সময়মতো শেষ হতো, তাহলে বছরে মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হতো।

সরকার যদি সত্যিই এই নতুন রিফাইনারি বানাতে না পারে, তাহলে বরং প্রকল্পটা বন্ধ করে দিক, আর যেভাবে এখন আমদানি চলছে সেভাবেই চলুক। কারণ যে প্রকল্প শুরুতে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার ছিল, চৌদ্দ বছরে সেটা এখন দাঁড়িয়েছে একত্রিশ হাজার কোটি টাকায়, প্রায় চার গুণ বেশি। এমনকি সবশেষ প্রাক্কলন ছিল তেতাল্লিশ হাজার কোটি টাকা, যা থেকে বারো হাজার কোটি টাকা কমিয়ে একত্রিশ হাজারে নামানো হয়েছে।

খরচ বাড়া আর সময় পেরিয়ে যাওয়া এই দুটো ব্যাপার একসঙ্গেই চলছে। যত দেরি হচ্ছে, নির্মাণসামগ্রী, শ্রম আর প্রযুক্তির দাম তত বেড়ে যাচ্ছে, ফলে প্রকল্পের খরচও বেড়ে যাচ্ছে। এটা একটা দুষ্টচক্রের মতো, দেরি হলে খরচ বাড়ে, খরচ বাড়লে অর্থায়নে জটিলতা তৈরি হয়, আর তাতে আরও দেরি হয়। আর এই পুরো সময় জুড়ে বাংলাদেশ ডিজেল আমদানি চালিয়ে যাচ্ছে, যার একটা অংশ যাচ্ছে সেই একই নুমালিগড় রিফাইনারিতে, যেখানে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের শেয়ার রয়েছে।

ফটোকার্ড ক্রেডিট : ইত্তেফাক










সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:৪১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৭


আজ দেশজুড়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ২৪ -এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভ্ন্নি সময়ে বহু নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরেছে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ ছাড়াও নাম জানা-অজানা হাজারো ব্যাক্তি তাদের প্রাণ হারিয়েছেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

তেহরানের ছায়া কি এখন ঢাকা সেনানিবাসে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:০১


সোমবার সকালে জলসিঁড়িতে একটা অনুষ্ঠান হলো। ফিতা কাটা, ফুলের তোড়া, বক্তৃতা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, স্বাভাবিক একটা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যা যা থাকে সবই ছিল। সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান নিজে হাজির, পাশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাতিঘর (Lighthouse)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৪৬



বাতিঘর (Lighthouse)

বাতিঘর নিয়ে সেই ছোট্টবেলা থেকেই আমার অনেক কৌতুহল ছিল। কেন ঐ বয়সেই বাতিঘর নিয়ে আমার এতটা আগ্রহ ছিল, তার কারণ আজও খুঁজে পাই না। অথচ আমি নিজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

"‘৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে’- একটি বক্তব্যের রাজনৈতিক পাঠ"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯



"‘৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে’- একটি বক্তব্যের রাজনৈতিক পাঠ"

"৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে। শেখ হাসিনার প্রয়োজন ছিল বিশ্রাম। আওয়ামী লীগের দরকার ছিল শুদ্ধিকরণ। অন্যান্য দলগুলোরও... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে বিষয়ে মজিবর ও হাসিনা এক বিন্দুও ভুল করেনি!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


বাংলাদেশের ইতিহাসে মজিবরের শেষ শাসন কাল ও হাসিনার শেষ শাসন কাল দুটি ভিন্ন সময়ে হলেও গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত মিল বহন করে। নির্বাচনী বৈধতার নিরিখে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সংগে ২০১৪, ২০১৮... ...বাকিটুকু পড়ুন

×