
যেকোনো দেশে শিক্ষিত নাগরিককে রাষ্ট্রের সম্পদ মনে করা হয়। তাদের জ্ঞান, বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা দিয়ে রাষ্ট্র উপকৃত হবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক সময় চিত্রটা যেন উল্টো। এখানে শিক্ষিত মানুষদের একটা অংশ রাষ্ট্রের জন্য কী করা যায়, তার চেয়ে রাষ্ট্রকে কীভাবে নিজের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সেটা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে।বাংলাদেশের মানুষের সমস্যার শেষ নেই। রোগ-শোক, দুর্ঘটনা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব আর হতাশা যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। এর মধ্যে রাষ্ট্রের কোনো ভুল সিদ্ধান্ত যদি সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে বিপদ ডেকে আনে, সেই কষ্ট কোনো সরকারি ফাইলের মধ্যে আটকে থাকে না। সেই কষ্টের বোঝা টানতে হয় সাধারণ মানুষকেই।
জুলাইয়ের কোটা আন্দোলনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার বড় পরিবর্তন হলো। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিল। সেই সরকারের প্রধান হলেন মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে একটা আশা তৈরি হয়েছিল। মনে হয়েছিল, অন্তত শিক্ষিত মানুষদের নেতৃত্বে রাষ্ট্র হয়তো আরও যুক্তি, বিবেচনা আর দক্ষতার সঙ্গে চলবে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই আশায় অনেক জায়গাতেই ধাক্কা লেগেছে। কোথাও তৌহিদি জনতার চাপ, কোথাও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নামে ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে টানাটানি, কোথাও আবার এমন সব সিদ্ধান্ত, যার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
এসব নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু হামের টিকার ঘটনাটা আমার কাছে একটু অন্যরকম। কারণ এখানে প্রশ্নটা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের নয়। প্রশ্নটা শিশুর জীবন নিয়ে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বছরের পর বছর আমরা ইউনিসেফ ও গ্যাভির মাধ্যমে হামের টিকা পেয়েছি। আওয়ামী লীগ সরকার ছিল, বিএনপি সরকার ছিল, সামরিক সরকার ছিল, ১/১১-এর সরকার ছিল। সরকার বদলেছে, মন্ত্রী বদলেছে, আমলা বদলেছে। কিন্তু এই জায়গাটায় বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। হঠাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের কেন মনে হলো, এই পুরোনো ব্যবস্থাটা ভালো না? কেন দরপত্রের মাধ্যমে হামের টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, ইউনিসেফ যদি এই সিদ্ধান্তের ঝুঁকি নিয়ে সরকারকে বারবার সতর্ক করে থাকে, তাহলে সেই সতর্কবার্তার পরও কেন সিদ্ধান্ত বদলানো হলো না? শুধু একবার না। মৌখিকভাবে বহুবার বলা হয়েছিল। লিখিতভাবেও চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, সরকারকে কে বলেছিল যে এত বছর ধরে চলে আসা ব্যবস্থা বাদ দিয়ে নতুন করে টেন্ডারের মাধ্যমে টিকা কিনতে হবে? জুলাইয়ের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত কোনো ছাত্র বলেছিল, আপনারা ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কিনবেন না ? আমলারা বলেছিল, এত বছর ধরে যে পদ্ধতিতে টিকা কেনা হচ্ছে সেটা বাদ দিয়ে নতুন ব্যবস্থা করতে হবে? তাদের নাম প্রকাশ করা হোক ।
যদি কেউ না বলে থাকে, তাহলে এই বুদ্ধিটা এলো কোথা থেকে ? এখানেই সবচেয়ে বড় ঘাপলা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশ পরিচালনা করা এবং নির্বাচন পর্যন্ত রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়া। তাহলে শিশুদের টিকা সরবরাহের মতো বছরের পর বছর ধরে চলে আসা একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থায় হাত দেওয়ার প্রয়োজনটা কী ছিল? কোনো পুরোনো ব্যবস্থা নিখুঁত নয়। পরিবর্তন দরকার হলে পরিবর্তন করতেই হবে। কিন্তু যে ব্যবস্থাটা বছরের পর বছর ধরে চলছে, সেটার পরিবর্তনের আগে অন্তত ঝুঁকিগুলো বিবেচনা করা উচিত। আর সেই ঝুঁকি নিয়ে যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আগেই সতর্ক করে, তাহলে বিষয়টা আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত ছিল।
কেউ বলতে পারেন, এটা তো একটা ভুল সিদ্ধান্ত মাত্র। ঠিক আছে। ভুল হতেই পারে। সরকারও ভুল করতে পারে, আমলাও ভুল করতে পারেন, মন্ত্রীরাও ভুল করতে পারেন। কিন্তু প্রতিটি ভুলের একটা মূল্য আছে। আর রাষ্ট্রের ভুলের মূল্য সাধারণত রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানরা দেন না। দেন সাধারণ মানুষ। এই ভুলের মূল্য যদি হয় কয়েকশ শিশুর জীবন, তাহলে বিষয়টাকে শুধু ‘ভুল’ বলে শেষ করে দেওয়াটা খুব সহজ সমাধান মনে হয় না। জুলাইয়ের আন্দোলনে গত সরকারের সময় ৮০০-এর বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। সেই আন্দোলনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যদি হামের প্রাদুর্ভাবে ৯০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে, আরো মৃত্যু ঘটানো কি জরুরি ছিলো ?
দাবি করছি না, টিকার সংকটের কারণে সব শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এমন দাবি করার মতো তথ্য আমাদের হাতে নেই। কিন্তু প্রশ্নটা তো করাই যায় -টিকার সরবরাহ ঠিক থাকলে, সময়মতো টিকাদান কর্মসূচি চালানো গেলে, কতগুলো শিশুকে বাঁচানো যেত? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা দরকার। আরেকটা বিষয়ও ভাবার মতো। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট যদি ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়ে থাকে, টিকা কেনার সুযোগ থাকে, বছরের পর বছর ধরে পরীক্ষিত একটা সরবরাহ ব্যবস্থা থাকে, এমনকি সেই ব্যবস্থা পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়েও আগেই সতর্ক করা হয়ে থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন?
আমরা যখন সরকারের কোনো প্রকল্প বা সিদ্ধান্তের ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলি, তখন খুব সহজেই বলে দিই, এটা আগের সরকারের ব্যর্থতা। কিন্তু রাষ্ট্র তো কোনো একটি সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র একটা ধারাবাহিক ব্যবস্থা। আজকের সরকার এসে আগের সরকারের সবকিছু বদলে ফেললেই সেটা সংস্কার হয়ে যায় না। কিছু ব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে ভালোভাবে চলে আসছে বলেই সেগুলো ধরে রাখতে হয়। আর কোনো কারণে বদলাতে হলে তার কারণও পরিষ্কার থাকতে হয়। হামের টিকার ব্যবস্থাটা যদি এমনই একটা পরীক্ষিত ব্যবস্থা হয়ে থাকে, তাহলে সেটা বদলানোর প্রয়োজন কেন হলো?
শেষ পর্যন্ত তাই এটাকে শুধু একটা প্রশাসনিক ভুল বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এত বছরের একটা পরীক্ষিত ব্যবস্থা বদলানো হলো। সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হলো। তারপরও সিদ্ধান্ত বদলানো হলো না। এরপর যদি টিকার সংকট তৈরি হয় এবং তার মাশুল দিতে হয় শত শত শিশুকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যারা সেই সিদ্ধান্তের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতেন, যারা সতর্কবার্তা পেয়েও ব্যবস্থা নেননি, তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই হবে। কারণ প্রায় ৯০০ শিশুর মৃত্যু কোনো প্রশাসনিক ভুলের ফুটনোট হয়ে থাকতে পারে না।
হামের টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল নীতির বলি হয়েছে অসংখ্য শিশু-জাগো নিউজ । https://www.jagonews24.com/health/news/1154752
ফটোকার্ড ক্রেডিট : আরটিভি
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




