
বাঁধনের ওপর হামলা নিন্দনীয়- কিন্তু নীতির মাপকাঠি কি সবার জন্য এক?
আজমেরী হক বাঁধন ইতালিতে হেনস্তা ও হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই- আগস্টের আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করা হয়েছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে ইতালির পুলিশের কাছে অভিযোগও করেছেন বলে জানিয়েছেন।
কে এই আজমেরী হক বাঁধন?
তিনি শুধু একজন অভিনেত্রী নন- ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সক্রিয়ভাবে দৃশ্যমান থাকা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম মুখ ছিলেন। সেই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই যদি আজ তাঁকে বিদেশের মাটিতে একটি দল হেনস্তা করে থাকে, তাহলে অবশ্যই তার নিন্দা হওয়া উচিত।
মবের বিচার কখনোই বিচার নয়।
কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই শেষ নয়।
আজ যারা বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় নীতি-নৈতিকতার বিশাল সবক দিচ্ছেন, তাঁদের কাছেই প্রশ্ন—
মব যখন মেহের আফরোজ শাওনের ওপর হামলে পড়েছিল, তখন কি একই নৈতিকতা জেগেছিল?
মুন্নি সাহার ক্ষেত্রে?
আরও বড় প্রশ্ন-
রাজশাহীতে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হলো। মানুষটি আগের হামলায় একটি পা হারিয়েছিলেন; সেই মানুষটিকেই আবার পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
তখন কোথায় ছিল এই নীতিবোধ?
কোথায় ছিল মানবাধিকার?
কোথায় ছিল সেই ‘মববিরোধী’ বিবেক?
ছাত্রলীগ বাদই দিলাম- এরকম হাজারো উদাহরণ তৈরী হয়ে আছে ৫ আগষ্টের পর থেকে।
মানসিকভাবে অসুস্থ তোফাজ্জল হোসেনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। ঘটনায় একাধিক শিক্ষার্থী আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
তখন কি একইভাবে সোচ্চার হয়েছিল সবাই?
নাকি মবের হাতে নিহত মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়টাই ঠিক করে দেয়-
তার জন্য কাঁদা যাবে কি যাবে না?
গত দুই বছরে মব-সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনায় একই কণ্ঠে, একই তীব্রতায় প্রতিবাদ আমরা দেখিনি।
তাহলে সমস্যা মবের মধ্যে, নাকি মবের শিকার ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ে?
বাঁধনের ওপর হামলা অন্যায়- এটা পরিষ্কার।
কিন্তু একই সঙ্গে এটাও পরিষ্কার হওয়া দরকার-
মবের বিরুদ্ধে অবস্থান যদি সত্যিই নীতিগত হয়, তাহলে সেই নীতি দল, মত, পরিচয় দেখে বদলাতে পারে না।
আজ বাঁধনের জন্য মায়াকান্না, কাল অন্য কারও মৃত্যুতে নীরবতা-
এটা মানবিকতা নয়।
এটা নির্বাচিত মানবিকতা।
আর নির্বাচিত মানবিকতা শেষ পর্যন্ত মানবিকতাকেই অপমান করে।
ইউনূস সরকারের সময় যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন, প্রতিহিংসা এবং মব-সংস্কৃতি আরও দৃশ্যমান হয়েছে- তার দায় থেকে কেউই মুক্ত নয়। ক্ষমতা বদলালেই যদি বিচারবোধের সংজ্ঞা বদলে যায়, তাহলে আমরা রাষ্ট্র বদলাই- সমাজ বদলাই না।
তাই সুশীলতার মুখোশ পরে কাউকে নৈতিকতার সার্টিফিকেট দেওয়ার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর দিন-
মব যখন ‘আপনার লোককে’ আঘাত করে তখন যদি সেটা সন্ত্রাস হয়, আর ‘অন্যের লোককে’ আঘাত করলে যদি সেটা ন্যায্যতা হয়-তাহলে আসলে আপনার লড়াই মবের বিরুদ্ধে নয়; আপনার লড়াই শুধু মবের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেটা নিয়ে।
মবের কোনো দল নেই।
মবের কোনো ধর্ম নেই।
মবের কোনো নৈতিকতা নেই।
আর মবের হাতে ন্যায়বিচার কখনো প্রতিষ্ঠিত হয় না।
আজ বাঁধন- কাল যে কেউ হতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



