
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৫ বছর আগে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে অনেক কিছু হয়েছে। সরকার এসেছে, সরকার গেছে, সামরিক শাসন এসেছে, গণতন্ত্র এসেছে, আবার গণতন্ত্রও চলে গেছে। কিন্তু একটা কাজ এখনো শেষ হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক কে, সেটা ঠিক করা। তবে কাজ যে একেবারে এগোয়নি, তা নয়। প্রত্যেক সরকারই নিজের মতো করে বিষয়টির সমাধান করেছে। সমস্যা হচ্ছে, নতুন সরকার এসে পূর্ববর্তী সরকারের সমাধান পছন্দ করে না। ফলে আবার নতুন করে কাজ শুরু করতে হয়।
সম্প্রতি প্রথম আলোতে একটা খবর পড়লাম। ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা পরিবর্তন করা হচ্ছে। খবরটি পড়ে বেশ ভালো লাগল। অন্তত বোঝা গেল, আমাদের দেশে ইতিহাসচর্চা থেমে নেই। আওয়ামী লীগ সরকার একভাবে ইতিহাস লিখেছিল, অন্তর্বর্তী সরকার এসে সেটি সংশোধন করেছে। এখন বিএনপি সরকার এসে দেখছে, সংশোধনের মধ্যেও কিছু সংশোধন বাকি আছে। ফলে আবার সংশোধন করা হচ্ছে। বিষয়টি একটু খুলে বলা যাক।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালের সপ্তম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে লেখা ছিল, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলা চালায়। সেই রাতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে গ্রেপ্তারের আগে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এই বর্ণনায় জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার কোনো কথা ছিল না। ফলে ওই বই পড়ে একজন শিক্ষার্থীর জানার সুযোগ ছিল না যে জিয়াউর রহমানও বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলো। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিল। তারা দেখল, স্বাধীনতার ঘোষণার ইতিহাসে কিছু সমস্যা আছে। তাই ২০২৬ সালের পাঠ্যবইয়ে নতুন বর্ণনা যুক্ত করা হলো। এবার লেখা হলো, ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
এখানে একটা সুন্দর পরিবর্তন ঘটল। আগের বইয়ে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, জিয়াউর রহমানের নাম ছিল না। নতুন বইয়ে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের ঘোষণার কথাটি আর থাকল না। তবে তাঁর পক্ষে জিয়াউর রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটুকু রাখা হলো। এতে দুজনের নামই ইতিহাসে থাকল। শুধু কে কী করেছিলেন, সেই জায়গায় কিছু পরিবর্তন হলো।
এরপর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এল। তারা দেখল, অন্তর্বর্তী সরকার ইতিহাস সংশোধন করেছে ঠিকই, কিন্তু পুরো কাজটি শেষ করতে পারেনি। তাই ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে আরও বিস্তারিত বর্ণনা যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হলো।
নতুন বইয়ে বলা হচ্ছে, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এতে দেশের মানুষ নেতৃত্বশূন্য হয়ে দিশেহারা ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান গণহত্যার খবর পেয়ে চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করেন। তিনি ‘উই রিভল্ট’ বলে বিদ্রোহের ঘোষণা দেন। এরপর ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে ব্যাটালিয়নের বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের একত্র করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেই সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর ঘোষণাও দেন। বইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর এই ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।
আগের বইয়ে জিয়াউর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। নতুন বইয়ে জানা যাচ্ছে, তিনি ঠিক রাত ২টা ১৫ মিনিটে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এত দিন পর সময়টাও নির্দিষ্ট করা গেল। ভবিষ্যতে আরও গবেষণা হলে হয়তো সেকেন্ডের হিসাবটাও পাওয়া যাবে। তবে নতুন বইয়ের বর্ণনা এখানেই শেষ হয়নি। সেখানে বলা হচ্ছে, ২৭ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জিয়াউর রহমান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও লিবারেশন আর্মির সর্বাধিনায়ক হিসেবে আবার স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আরও একবার ঘোষণা দেন।
হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে, নতুন বর্ণনায় জিয়াউর রহমান ২৬ মার্চ একবার এবং ২৭ মার্চ দুবার স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রথমবার সামরিক বিদ্রোহের পর, দ্বিতীয়বার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও সর্বাধিনায়ক হিসেবে, তৃতীয়বার শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে। অর্থাৎ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার কাজটি তিনি বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই করেছিলেন।
এখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির বিষয়টিও বেশ interesting। আমরা এত দিন জেনে এসেছি, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এখন নতুন বইয়ে ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমানের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার কথা থাকছে। অবশ্য ২৭ মার্চের বেতার ঘোষণায় নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বলা আর ১০ এপ্রিলের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হওয়া এক বিষয় নয়। কিন্তু সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এসব পার্থক্য বোঝানোর প্রয়োজন আছে কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন।
আরেকটি বিষয় আমার বেশ ভালো লেগেছে। নতুন বইয়ে বলা হচ্ছে, শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশের মানুষ নেতৃত্বশূন্য হয়ে দিশেহারা ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল। এরপর জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ করলেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। এই বর্ণনা পড়লে ঘটনাগুলো বেশ সহজে বোঝা যায়। তবে ২৫ মার্চ রাতেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে যে প্রতিরোধ শুরু হয়েছিল, সেই প্রতিরোধকারীরা নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় কীভাবে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেটি নিয়ে একটু চিন্তা করতে হয়। অবশ্য ইতিহাসের সব প্রশ্নের উত্তর বারবার সংশোধন ছাড়া দেওয়া সম্ভব নয়।
এখানে একটা বিষয় লক্ষ করার মতো। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু স্বাধীনতার ঘোষকের নাম নয়, তাঁর কাজের বিবরণও পরিবর্তিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার কথা ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাঁর ঘোষণা যুক্ত হলো। বিএনপি সরকারের আমলে তাঁর বিদ্রোহ, ঘোষণার নির্দিষ্ট সময়, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পরিচয় এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরুর বিষয়টিও যুক্ত হলো। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে স্বাধীনতার ঘোষণার ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।
শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা নয়, ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে আরও কিছু বিষয় যুক্ত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকা থাকবে। জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধও যুক্ত হচ্ছে। এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের জানা প্রয়োজন। তবে কোন সরকারের আমলে কোন বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেটিও গবেষণার একটা বিষয় হতে পারে।
আমরা সম্ভবত ইতিহাসচর্চার একটা সহজ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছি। সাধারণত ইতিহাসবিদেরা পুরোনো দলিলপত্র ঘাঁটেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেন, বিভিন্ন সূত্র মিলিয়ে দেখেন। তারপর একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। আমাদের দেশে কাজটি আরও সহজ। নির্বাচনের ফলাফল জানা গেলে ইতিহাসের পরবর্তী সংস্করণ সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া যায়।
তবে একটা বিষয় নিয়ে আমার সামান্য কৌতূহল আছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যদি আমরা স্বাধীনতার ঘোষণার একটি স্থায়ী বর্ণনায় পৌঁছাতে না পারি, তাহলে আগামী ৫০ বছরে কী হবে? ধরুন, ২০৩১ সালে আবার সরকার পরিবর্তন হলো। নতুন সরকার এসে দেখল, আগের বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায় কিছু ভুল আছে। তখন আবার সংশোধন করা হবে। এরপর আরেক সরকার এসে আরেকবার সংশোধন করবে। এভাবে স্বাধীনতার শতবর্ষে পৌঁছানোর সময় আমাদের হাতে স্বাধীনতার ঘোষণার বেশ কয়েকটি সরকারি সংস্করণ থাকবে। ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য বিষয়টি নিশ্চয়ই বেশ উপকারী হবে।
আমার মনে হয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের একটা কাজ করা উচিত। স্বাধীনতার ঘোষণার অধ্যায়ের শুরুতে ছোট করে লিখে দেওয়া যেতে পারে, এই বর্ণনাটি কোন সরকারের আমলে অনুমোদিত হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের সুবিধা হবে। তারা বুঝতে পারবে, ইতিহাসের কোন সংস্করণটি পড়ছে।
অবশ্য আরও সহজ একটা ব্যবস্থা করা যায়। স্বাধীনতার ঘোষণার অধ্যায়টি প্রতি পাঁচ বছর পরপর পর্যালোচনার জন্য রাখা যেতে পারে। সরকার পরিবর্তন হলে নতুন সরকার প্রয়োজনমতো সংশোধন করবে। এতে নতুন করে পুরো পাঠ্যবই লেখার ঝামেলাও কমবে ।স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেছে। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে। আশা করি, স্বাধীনতার শতবর্ষের মধ্যে আমরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব। তবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কোন দল ক্ষমতায় থাকবে, সেটি জানা দরকার।
সরকার বদলালে বদলায় স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা, ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে নতুন সংস্করণ-সিটিজেনস ভয়েস
ফটোকার্ড : ইয়ার্কি
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



