somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস খেয়ে ধর্ম পালন করছে। মামা হাসলেন। বললেন, ধর্ম পালন করতে চাইলে মসজিদে যাও, নামাজ পড়ো, দান খয়রাত করো কিংবা রোজা রাখো। গরু খাওয়া আবার ধর্ম পালন হয় কী করে? কুরবানির ঈদ তো এখনো অনেক দূরে। আমি বললাম, মামা, তুমি এসব বুঝবে না। জুলাই আন্দোলনের পর থেকে দেশে গরুর মাংস দিয়ে জিয়াফত করে ধর্ম পালনের মতো একটা নতুন কাজ শুরু হয়েছে।

মামা বললেন, ওরস শরিফের মতো আর কী। তিনি কিছু কিছু ঘটনা জানেন। বললেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের অকাম কুকাম কম দেখেননি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, শিবির করছে, এটা বুঝলে কীভাবে মামা? মামা বললেন, বাংলাদেশে যখনই কোনো কিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু হয়, তার মধ্যে জামাত শিবির জড়িত থাকে। আমি ভাবলাম, মামা খারাপ কিছু বলেননি। মাত্র দুই দিন আগে সাতক্ষীরায় একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে পিটিয়ে মারা হয়েছে। ইসলামে স্পষ্ট নির্দেশ আছে, পাগলের সাত খুন মাফ। বিবিসির অনুসন্ধানে ঘটনার পেছনেও জামাতের লোকজনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এসেছে। এরপর মামা ফোন রেখে দিলেন।

আমি জগন্নাথের খবরটা একটু বিস্তারিত বোঝার চেষ্টা করছিলাম। এর মধ্যে টিভিতে দেখলাম, জাপানকে টপকে আগামী বছর নমিনাল জিডিপিতে বিশ্বে চতুর্থ হতে যাচ্ছে ভারত। বেশ খুশি লাগল। নরেন্দ্র মোদির এটা প্রাপ্যই ছিল। এত ঝড়ঝাপটার মধ্যেও তিনি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করেননি। ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের নতুন আইনের প্রয়োগ আপাতত স্থগিত করেছেন। এতে ভারতও স্বস্তি পেয়েছে।

এরপর সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলাম, নেটিজেনরা কী ভাবছেন দেখতে। দেখি সবাই জিয়াফতের গরু নিয়ে বিশাল বিশাল রচনা লিখে ফেলেছেন। অথচ ভারত চতুর্থ অর্থনীতি হতে যাচ্ছে, এই নিয়ে কেউ এক বাক্যও লিখছেন না। আমাদের কাছে গরু জবাই আর জিয়াফতের খবর বেশি প্রাধান্য পায়, কারণ ক্রিটিক্যাল থিংকিং করার মতো আইকিউ আমাদের কম। সোশ্যাল মিডিয়ায় যাঁরা লেখেন, তাঁদের বেশিরভাগ বিভিন্ন দলের গুপ্ত লোক।

লেখা পড়লেই বোঝা যায়। আরও বুঝলাম, দেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনার দরকার নেই। সরকার কেন আবার আইএমএফের ঋণ নিতে চায়, তাতে আমাদের ওপর কী চাপ আসতে পারে, এসব নিয়েও কথা বলার দরকার নেই। এদিকে মানুষ বাজারে গিয়ে দেখছে, জিনিসপত্রের দাম দফায় দফায় বাড়ছে। এমন উদাসীন জাতির কপালে দুর্ভোগ লেগে না থাকলে কার কপালে থাকবে?

ভারত হতে যাচ্ছে চতুর্থ, আর জাপান আগামী বছর ষষ্ঠ। জাপানের এখন সংকট চলছে। জনসংখ্যা প্রতি বছর কমছে, বৃদ্ধ মানুষ বাড়ছে, কাজ করার মতো তরুণের অভাব তীব্র। ঋণ জিডিপির তুলনায় বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, যদিও এর সঠিক অনুপাত নির্ভর করে ঋণের সংজ্ঞা ও হিসাবের বছরের ওপর। মাত্র ০.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দিয়ে এই ঋণ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ভারত উড়ছে, তাদের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশ। তবে এখানে একটা পার্থক্য আছে। জাপান চাইলে ভারতের মতো ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে পারবে না, এমন নয়; তবে বর্তমান উন্নত অর্থনীতি ও জনসংখ্যার বাস্তবতায় সেই হারে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন।

একটা দেশ যখন প্রাথমিক বা মধ্যম স্তরে থাকে, তখন রাস্তাঘাট বানিয়ে, নতুন কলকারখানা বসিয়ে, প্রযুক্তি নকল করে ৭ থেকে ৮ শতাংশ বাড়া সহজ। একে বলে ক্যাচ আপ গ্রোথ। কিন্তু দেশ একবার উন্নত হয়ে গেলে অবকাঠামো তৈরি হয়ে যায়। তখন নতুন আবিষ্কার আর উদ্ভাবনের ওপর ভর করে বাড়তে হয়, যা ধীরগতির। জাপানের মতো দেশে জিডিপি গ্রোথ ২/৩ শতাংশ হলেও অনেক বেশি হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। আর ভারত এখন যে ৭ শতাংশ পাচ্ছে, সেটা ১৫ থেকে ২০ বছর পর কমে আসতে পারে। তাই জাপান আর ভারতের তুলনা নমিনাল জিডিপি দিয়ে করা যায়, কিন্তু সেটা শুধুই একটা হিসাব।

বাস্তবে জাপানের মাথাপিছু আয় প্রায় ৩৫ হাজার ডলার, ভারতের প্রায় ২,৮০০। একজন জাপানি গড়ে একজন ভারতীয়ের চেয়ে বারো গুণ ধনী। ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৪৫ কোটি, জাপানের সাড়ে বারো কোটি। বিশাল জনসংখ্যার জোরে ভারত মোট উৎপাদনে জাপানকে ছাড়াচ্ছে, জীবনযাত্রার মানে নয়। তবু দক্ষিণ এশিয়ার বাকি সব দেশের চেয়ে ভারত ভালো করছে। রাশিয়ার সস্তা তেল তাদের জ্বালানি নিরাপত্তায় সুবিধা দিচ্ছে, আর সেই সুবিধা তারা পুরোপুরি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

আইএমএফ আরেকটা খবর দিয়েছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২,৮৮৬ ডলার, ভারতের ২,৭৫০। অর্থাৎ ১৩৬ ডলারে আমরা এগিয়ে। তবে এই লিড টিকবে ২০২৮ পর্যন্ত। ২০২৯ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ৩,৬৬২ ডলার, আর আমাদের ৩,৩৩৪। ভারতের প্রবৃদ্ধির হার যেমন অবিশ্বাস্য, তাতে ব্যবধানটা তারা শুধু মিটিয়ে ফেলবে না, বেশ বড় ব্যবধানে এগিয়েও যাবে। ১৩৬ ডলারের এই গৌরব আমরা তিন বছর ধরে রাখতে পারব। এই খুশিতে আরেকটা গরুর ভোজ হলেও হতে পারে।

এর মধ্যেই খবর এল, দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই মোটর গ্রুপ ২০৩২ সাল পর্যন্ত ভারতে ১৫.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। অন্যদিকে বাংলাদেশে টয়োটা প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে গাড়ি বিক্রি, সার্ভিসিং ও খুচরা যন্ত্রাংশের কেন্দ্র স্থাপন করতে যাচ্ছে। টাকার অঙ্কের পার্থক্যটা দেখুন। ভারতের অঙ্কটা আমাদেরটার প্রায় ৩৮৮ গুণ। অবশ্য দুটো বিনিয়োগ এক রকম নয়। টয়োটা আসছে গাড়ি বেচতে, সার্ভিস দিতে আর খুচরা যন্ত্রাংশ রাখতে। হুন্দাই বাড়াবে উৎপাদন, করবে গবেষণা, বানাবে স্থানীয় যন্ত্রাংশ, আনবে নতুন প্রযুক্তি। একজন কারখানা বসাচ্ছে, আরেকজন দোকান খুলছে।

ভারত এত বিনিয়োগ পায়, আমরা কেন পাই না, এই প্রশ্ন কেউ করে না। সব মিলিয়ে হিসাবটা সোজা। জগন্নাথে গরু জবাই হলে প্রবাসীদের কানে চলে যায় , সাতক্ষীরায় একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে পিটিয়ে মারা হলে তদন্তে নাম আসে, ছাত্র সংসদ নিয়ে আমরা আগেভাগে ফলাফল ঠিক করে ফেলি। তবে ভারত চতুর্থ হলে, হুন্দাই ১৫.৫ বিলিয়ন ঢাললে, আইএমএফ ঋণের শর্ত পাঠালে আমাদের কারও পড়ার সময় হয় না। জাতি হিসেবে আমাদের ভাবনাচিন্তা সত্যি বিশ্বমানের।

ফটোকার্ড ক্রেডিট : সমকাল

সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৫২
৯টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যাদের স্বপ্নের দেশ আমেরিকা: তাদের জন্যে আজকের পোস্ট

লিখেছেন অপলক , ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৮



এমন এক সময় ছিল, ছেলে বা মেয়ে ডিভি লটারীতে স্বপ্নের দেশে গেছে, বাপ মায়ের পাড়া প্রতিবেশী গর্বে কথা বলাই মুশকিল। সেখানে গিয়ে OC(Office Cleaner) নাকি DC(Dish Cleaner) হবে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেধা নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ই কি আমাদের রাষ্ট্রে যোগ্যতার মাপকাঠি?

লিখেছেন raselabe, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:২৯

বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয় বা ভেরিফিকেশনের কারণে প্রার্থীদের বাদ পড়ার অভিযোগ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। রাজনৈতিক দলগুলো ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নিজেদের ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম চালু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×