![]()
![]()
![]()
“খুশবন্ত সিং”- সদ্য প্রয়াত ভারতীয় এই অসাধারণ লেখকের লেখনীর সাথে আমার পরিচয় ঘটে বিশ্ববিদ্যালয় এ পড়বার সময় তাঁর বিখ্যাত “দিল্লী” উপন্যাসের মাধ্যমে। কিংবদন্তী এই লেখকের লেখার ধরনটাই এমন যে একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে পারা যায় না। সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ সচেতনতা, প্রেম, কলহ, যৌনতা ঘেষা সরস ও ব্যাঙ্গাত্তক রচনা তাঁর লেখার প্রান। স্বনামধন্য এই লেখকের অন্যতম সেরা উপন্যাস হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভক্তির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ৫০ এর দশকে রচিত “ট্রেন টু পাকিস্তান” যে গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৫৩ সালে “গ্রোভ প্রেস এওয়ার্ড” পান।
১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভক্তি ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই সময় ভারত ভেঙ্গে সৃষ্টি হয় দুইটি পৃথক রাষ্ট্রের- “ভারত” এবং “পাকিস্তান”। এই অশান্ত সময়ে সাম্প্রদায়িকতার যে নগ্নরুপ সাধারণ মানুষের জীবন কে আলোড়িত করেছিল তা ছিল নজিরবিহীন। অনেক মানুষ চিরতরে হারিয়ে যায়, অগুনিত মানুষ সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়ে মারা যায়, অনেক মানুষ হয় নিরাপত্তাহীনতার শিকার- নিঃসন্দেহে ইতিহাসের এই ট্রাজেডি নিয়ে লেখা অন্যতম সেরা উপন্যাস “ট্রেন টু পাকিস্তান”।
চব্বিশ বছরের পাঞ্জাবি যুবক এবং অশিক্ষিত চাষি “জুগগাত সিং” যে কিনা পুলিশের কাছে বদমায়েশ বলে পরিচিত এই উপন্যাসের মূল নায়ক। গ্রামের মুসলমান তাঁতির মেয়ে “নুরান” এর সাথে তার গভীর প্রেম।
১৯৪৭ এর সেই উত্তাল দিনগুলোতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় যখন হাজার হাজার মানুষ খুন হচ্ছে, হিন্দুরা খুন করছে মুসলমানদের আর মুসলমান খুন করছে হিন্দুদের, ট্রেন ভর্তি লাশ আসছে আর আসছে উদ্বাস্তু, ভারতের বিভিন্ন এলাকায় মুসলমানরা খুন হচ্ছে আর চলে যাচ্ছে পাকিস্তানে অনিশ্চিত ঠিকানার উদ্দেশ্য ; ঠিক সেই সময় ভারতের “মানো মাজরা” গ্রামে বিরাজ করছে শান্তির নীড়। লেখকের ভাষায়ঃ
“১৯৪৭ এর গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত অর্থাৎ নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবার সময় পর্যন্ত এক কোটি লোক- হিন্দু, মুসলমান, শিখ পালিয়ে বেড়ালো। ...... তাদের মধ্যে প্রায় দশ লাখ লোক নিহত হল। ..... ভীতির শিকার হল এক কোটি লোক, তারা পালিয়ে রইলো। প্রসারিত সীমান্তের দূরবর্তী এলাকার কয়েকটি বিক্ষিপ্ত ছোট গ্রামই শান্তির মরূদ্যান হিসেবে টিকে রইলো। এর মধ্যে একটা গ্রামের নাম মানো মাজরা।”
এই অশান্ত সময়েই মানো মাজরা গ্রামে একটা ডাকাতি আর খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটিত ঘটনার সার্থক রুপায়ন ঘটেছে এই উপন্যাসে। উঠে এসেছে- জুগগাত সিং এর সাথে নুরান এর প্রেম, মানো মাজরা গ্রামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এর ছবি।
মানো মাজরা গ্রাম থেকে ট্রেন ভর্তি মুসলমান উদ্বাস্তুদের খুন করে যখন পাকিস্তানে পাঠাবার পরিকল্পনা চূড়ান্ত ঠিক তখনি জুগগাত সিং অবতীর্ণ হল ত্রাণকর্তার ভুমিকায়। মুসলমান উদ্বাস্তু ভর্তি ট্রেনের মানুষগুলোকে সে বাঁচিয়ে দিলো নিজের প্রানের বদলে। ট্রেনটি নির্বিঘ্নে চলে গেলো পাকিস্তানের পথে; যে ট্রেনে তার প্রেমিকা নুরানও ছিল-
.... “তার উপর একসাথে অগুনিত গুলি বর্ষিত হল। লোকটি কেঁপে উঠে নিঃসাড় হয়ে পড়ে গেলো রেল লাইন এর উপর। .... তার নিঃস্পন্দ দেহের উপর দিয়ে ট্রেনটি অতিক্রম করলো। .... চলল পাকিস্তানের দিকে।“
এই লোকটি আর কেউ নয়, সে এই উপন্যাসের নায়ক জুগগাত সিং। তার করুণ মৃত্যু আর নুরানের হারিয়ে যাবার মধ্যে দিয়েই এই উপন্যাসের সমাপ্তি।
৫০ এর দশকে প্রকাশিত এই উপন্যাসকে অনেকে দেশ বিভাগের সামাজিক দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং কারো কারো মতে “ক্লাসিক” সাহিত্যর দাবী করতে পারে এই উপন্যাসটি।
দেশ বিভাগের উপর লেখা অন্যতম সেরা উপন্যাস এটি এবং একটি অবশ্যপাঠ্য।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




