ব্যাংকের ভাইভা চলছে। বিবিএ, এমবিএ পাস করা প্রার্থী ইংরেজিতে নিজের জেলা সম্পর্কে বলতে হিমসিম খাচ্ছে। ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা বিরক্ত। এমন না যে সে ইংরেজি জানে না। ফোকাস রাইটিঙয়ে এমডিজি-এসডিজি নিয়ে দুই পৃষ্ঠার রচনা লিখেছে, অনুবাদগুলিতে ৮০% নাম্বার পেয়েছে। তাহলে সমস্যা কোথায়?
সমস্যার নাম ভাইভাভীতি। দেশের প্রায় ৮০% মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। ভাইভায় জানা বিষয় ভুলে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘামা এই রোগের প্রধান লক্ষণ।
রোগের কারণ জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাইমারিতে। রাগী চেহারার মাস্টার হাতে বেত নিয়ে ক্লাসে ঢুকল। “এই তিনের নামতা বল”। না পারলে পাছায় শপাংশপাং বাড়ি। ক্লাসের সবার লক্ষ্য স্যারের চোখের আড়াল হওয়া। ভাইভাভীতির শুরু সেখান থেকেই। হাইস্কুল, কলেজে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ। ক্লাসে স্যার এসে আগে যারা যারা তার কাছে প্রাইভেট পড়তে যায় না তাদেরকে খুঁজে বের করে। এরপর শুরু হয় একের পর এক প্রশ্ন। ফলাফল পৌনে একঘণ্টা ক্লাসে দাঁড়িয়ে থাকা। আর কিছু না বুঝলে ক্লাসে প্রশ্ন করাটা রীতিমতো কবিরা গুনাহর পর্যায়ে পড়ে। ভার্সিটিতে বিবিএ পড়তে আসলে শুরু হয় আরেক নাটক। প্রেজেন্টেশন দিতে হবে। কিছু প্রাইভেট ভার্সিটিতে এ নিয়ে অনেক গ্রুমিং হলেও পাবলিকে এ বিষয়ে টিচারদের সাহায্য পাওয়া বিরল ব্যাপার। কি করতে হবে কিছুই জানা নেই শুধু টপিকটা ছাড়া। বড় ভাই আর ইউটিউবের সাহায্য নিয়ে কোন রকম একটা প্রেজেন্টেশন দাড় করানো হয়। তাতে টিচারদের মন ভরে না। স্টুডেন্টভর্তি ক্লাসে ডায়াসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপমানিত হওয়া লাগে। দশে চার পাঁচের বেশি নাম্বার মিলে না। ক্লাসের বুদ্ধিমান ছাত্ররা বুঝে নেয় এই কয়েক নাম্বারের জন্য একটা সপ্তাহ নষ্ট না করে এই সময়ে সেমিস্টার ফাইনালের জন্য পড়লে ১০-১৫ নাম্বার বেশি পাওয়া সম্ভব। এই প্রেজেন্টেশন ফাঁকি দেয়া ছাত্ররাই আজ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। অন্যেরা যখন ৫ নাম্বারের জন্য সময় ‘নষ্ট’ করেছে তারা তখন চাকরির প্রস্তুতি নিয়েছে। বাৎসরিক যে ভাইভাটা হয় তা আসলেই উপকারী হলেও সারা জীবনের সঙ্গী ভাইভাভীতি দূর করার জন্য যথেষ্ট না।
অনেকে বলেন ইংরেজি দুর্বলতার জন্য ভাইভায় সমস্যা হয়। এটা পুরোপুরি সঠিক না। আমি চাকরি পাওয়ার আগে প্রায় চার মাস স্পোকেন ইংলিশ কোচিং করি। ভালোই ফ্লুয়েন্ট হয়েছিলাম। তারপরেও কোন ভাইভা আশানুরূপ হয়নি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ভাইভায় অনার্স, মাস্টার্সের মেজর সাবজেক্টে বেসিক কেমন যাচাই করা হয়, দীর্ঘ সময় বাংলা, সাধারণ জ্ঞান মুখস্ত করতে করতে যা শূন্যের কোঁটায় নেমে যায়।
এর সমাধান কি? সমাধান একটাই, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বাচ্চাদের কনফিডেন্স নষ্ট করা বন্ধ করতে হবে। ক্লাসে ছাত্ররা হবে প্রশ্নকর্তা আর শিক্ষকরা হবেন উত্তরদাতা। ছাত্র শিক্ষকদের মধ্যে বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক থাকবে। ছাত্ররা ক্লাসে মুখ না লুকিয়ে নিজেদেরকে যেন প্রকাশ করতে পারে সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ১০:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




