somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্কলারশিপ পেলেই কি বিদেশে যাবেন!

০৬ ই নভেম্বর, ২০২২ সকাল ৮:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্কলারশিপ পেলেই কি বিদেশে যাবেন! =

জার্মানি থেকে বাংলাদেশি এক যুবক কিছুদিন আগে আমার সাথে কথা বললেন। উদ্দেশ্য, পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট বা পিআর হিসেবে কিভাবে কানাডায় আসা যায়? এ লেখার প্রয়োজনে যুবকের নাম দিলাম, প্রান্ত।

তার আগ্রহ শুনে আমি জানতে চাইলাম, “প্রান্ত, কানাডায় যদি পিআর এর আবেদনই করবেন, তবে জার্মানি গেলেন কেন? ওদেশে পিআর পাওয়া যায় না?”

উত্তরে তিনি বললেন, “কাহিনী একটু দীর্ঘ। চার বছর আগের কথা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বিষয়ে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন দেশে পড়াশোনার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ জার্মানি থেকে বৃত্তিসহ ভর্তির সুযোগ পেলাম। সে সুযোগ কাজে লাগাতেই আমার জার্মানি আসা।”

জার্মানির পড়াশোনা শেষ করেছেন কিনা- আমার এ প্রশ্নের উত্তরে প্রান্ত বললেন, “জ্বি, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করছি বছর দেড়েক হলো।”

- তারপর আপনার পরিকল্পনা কী?

তিনি বললেন, “জার্মানিতে স্থায়ী অভিবাসনের (পিআর স্ট্যাটাস) আবেদনের চিন্তা মাথায়। তবে, তা আমাকে দিয়ে হয়ে উঠবে মনে হয় না।”

সমস্যা কোথায় জানতে চাইলে প্রান্ত বললেন, “মূল সমস্যা ভাষায়। অর্থাৎ, জার্মানিতে পিআর পেতে হলে জার্মান ভাষার পরীক্ষায় যে ফলাফল করতে হয় তা আমাদের ব্যাকগ্রাউন্ডের লোকদের জন্য খুব কঠিন।”

:আপনাদের মতো ব্যাকগ্রাউন্ড বলতে কী বোঝাচ্ছেন”, জানতে চাইলাম।

“মানে, যারা ছোটবেলা হতে জার্মান ভাষার সাথে পরিচিত নন তাদের কথা বলছি। আমরা তো ছোটবেলা থেকে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষার সাথে পরিচিত, জার্মান ভাষার সাথে নয়”, ওপাশ থেকে উত্তর দিলেন প্রান্ত।

- তাহলে, শুরুতেই আইইএলটিএস পরীক্ষা দিয়ে কেন ইংরেজি ভাষাভাষী দেশে গেলেন না?

- ঠিক বলেছেন, সেটাই ভালো হতো। প্রথমবারে না পারলেও কয়েকবার আইইএলটিএস দিয়ে একটা ভালোমানের স্কোর তোলা অসম্ভব হতো না। সেভাবে চেষ্টা করলেই পারতাম। কিন্তু, স্কলারশিপসহ জার্মানিতে পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে অতো হিসাব-নিকাশ আর করিনি। এখন মনে হচ্ছে বৃত্তির লোভে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তখন…

এ আলোচনা থেকে কী বোঝা গেল?

আমি যা বুঝেছি তা হলো, স্কলারশিপ পেলেই দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ভোঁ দৌঁড় দেওয়া বোকামো। আপনাকে প্রথমেই ভাবতে হবে, কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন, দীর্ঘমেয়াদে এ বিদেশি পড়াশোনা থেকে আপনার অর্জন কতখানি, বা বিদেশে স্থায়ী হতে চাইলে আপনার এ পড়াশোনা বা সময় ব্যয় কতটা সুফল দেবে, বা আদৌ দেবে কিনা?

প্রান্ত (ছদ্মনাম) নামের এ তরুণের জীবনের প্রায় চার বছর জার্মানিতে কেটেছে। আর, এই বৃত্তির সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার দুটো মূল্যবান বছরও তাকে জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে। সব মিলে প্রায় অর্ধযুগ এ অনিশ্চিত যাত্রায় তিনি ব্যয় করেছেন। এর ফলাফল হয়েছে এটুকুই, জার্মানিতে যে সহজে স্থায়ী হওয়া যায় না সে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে পারা।

এ লেখায় জার্মানির নাম এলেও পৃথিবীর আরো অনেক দেশে আমাদের ভাইবোন বা সন্তানরা পড়াশোনা করতে যায় খুব বেশি চিন্তাভাবনা না করেই। দেশ ছাড়ার আগে এদের অনেকেই পড়াশোনা শেষের পর কী ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারেন তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তাভাবনা বা পরিকল্পনা করেন না অনেকেই। যে সব প্রার্থীর দেশে ফিরে যাবার বিশেষ আগ্রহ থাকে তাদের ক্ষেত্রে বিদেশে পড়াশোনার পর খুব দীর্ঘ পরিকল্পনা না থাকলেও সমস্যা নেই। কিন্তু যারা চিন্তা করেন পড়াশোনার পর নিজেকে নতুন দেশটিতে প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের ক্ষেত্রে পূর্ব-পরিকল্পনা না হলেই নয়।

নিজেদের একটা দৃষ্টান্ত দেই। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই একসময় নেদারল্যান্ডস-এ ছিলাম কিছুদিন। বাংলাদেশ সরকারের চাকরি থেকে সেদেশের সরকারের খরচে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলাম। সঙ্গত কারণেই, আমাদের মাথায় ছিল দুজনের সরকারি চাকরি ছেড়ে কোনদিন বিদেশে পাড়ি জমাবো না। কিন্তু, নেদারল্যান্ডস এর আইনশৃঙ্খলা, মানুষের স্বভাবচরিত্র, সরকারি কর্মচারীদের সততা, বাকস্বাধীনতা, নির্মল পরিবেশ, ইত্যাদি দেখে এতোটাই অভিভূত হয়ে পড়ি যে নেদারল্যান্ডস থেকে দেশে ফিরেই আমরা প্রথম বিশ্বের দেশ কানাডায় অভিবাসনের (পিআর স্ট্যাটাস) আবেদন করি। সেই সূত্রেই আমরা আজ একুশ বছর ধরে কানাডায়।

আমাদের ব্যক্তিগত কাহিনী এখানে উল্লেখের কারণ এটা বোঝাতে যে, অপেক্ষাকৃত উন্নত পরিবেশে দীর্ঘসময়ের জন্য বসবাসের সুযোগ হলে অনেকক্ষেত্রে পূর্ব-পরিকল্পনা না থাকা সত্ত্বেও উন্নতদেশে জীবনযাপনের চিন্তা মাথায় চলে আসে। আমাদের আগেও হাজারো বাংলাদেশি এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন।

কানাডা অভিবাসন বিষয়ে কিছু কথা বলে এ লেখা শেষ করি।

কানাডায় অভিবাসন নিয়ে যদি থিতু হওয়ার পরিকল্পনা যদি থাকে, তবে অন্যকোনও দেশে পড়াশোনার বৃত্তি পেয়েছেন বলে তড়িঘড়ি পাড়ি না জমানোর পরামর্শই দিবো। তার চেয়ে বরং কয়েকবার আইইএলটিএস পরীক্ষা দিয়ে হলেও কানাডায় কিভাবে প্রবেশ করা যায় সে চেষ্টা করুন।

সাধারণভাবে বলা যায়, কানাডা অভিবাসন আবেদনকারীর সম্মিলিত পয়েন্টের ভিত্তিতে হয়ে থাকে। বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা, ভাষার দক্ষতা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্যাটাগরি থেকে এই পয়েন্টগুলো হিসাব করা হয়। সঙ্গত কারণেই, কানাডা অভিবাসনে বয়স একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর বা উপাদান।

ভিন্ন দেশে পড়াশোনার জন্য কয়েকবছর কাটিয়ে দিলে বয়স বেড়ে যাওয়ায় আপনার পয়েন্ট কমে যাবে। এছাড়া, কানাডায় পড়াশোনা বা, কাজ করলে আপনি যে বাড়তি কিছু পয়েন্ট পেতেন ভিন্ন দেশে পড়াশোনা বা কাজ করে এলে তা পাবেন না। সর্বোপরি, ইংরেজি ভাষাভাষীর দেশ কানাডায় পড়াশোনা বা কাজের সুবাদে কয়েকবছর বসবাস করলে আপনার আইইএলটিএস স্কোরও বেড়ে যাবার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

এভাবে নানা আঙ্গিকে বিবেচনায় কানাডায় যাদের স্থায়ী হবার আগ্রহ তাদের উচিত হবে বৃত্তি পান বা না পান, পড়াশোনার জন্য কানাডাকেই প্রথমে বেছে নেওয়া। তাতেই কানাডা ইমিগ্রেশনের পয়েন্ট বৃদ্ধির অনুকূলে আপনার সময়, অর্থ ও শ্রমের সদ্ব্যবহার হবে।

[পুনশ্চ: কাউকে জার্মানি যেতে নিরুৎসাহিত করা এ লেখার লক্ষ্য নয়। উদাহরণ হিসেবে জার্মানির নাম এসেছে কেবল।]

Email: [email protected] FaceBook: ML Gani
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই নভেম্বর, ২০২২ সকাল ৮:৫৯
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্ভীক অভিযাত্রা

লিখেছেন আকিব হাসান জাভেদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩

আমি চলি ঐ প্রান্তে,
যেখানে অসৎ থেকে মানুষ হয়েছে সৎ।
আমি চলি উড়ে উড়ে,
ডানাহীন পাখির মতো,
যেখানে দুর্বলতাকে জয় করে
হয়েছে দুঃসাহস।
আমি চলি শক্তির সাথে,
দেহ যায় না ঝুঁকে।
করি না প্রণাম,
করি না চাটুকারিতা আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

তবুও বেঁচে আছি

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:১৫

এই নিথর নগ্ন শরীরের প্রতিটা পল্লবের করুণ আর্তচিৎকার
পৃথিবীর মাটি ভেদ করে কোনদিনও
ওই মৃত কানে পৌঁছাবে না
আমি জেনে গেছি ।

বিপন্ন আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকা
দেবতাদের প্রতারণার ফাঁদ আর মিথ্যা প্রলোভনের গল্পগুলি
আমার শুনতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৩



জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

১৫ আগস্ট আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম জুলাই মিউজিয়ামে। সেখানে গিয়ে মনে হলো- এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের বিরুদ্ধে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×