পদক রঙ্গ -
আমার নতুন গল্প - পড়ুন বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম হতে।
লিংক: https://bangla.bdnews24.com/arts/3329ca5a31f3
১.
মাসুদ আলী সাহেব দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে কানাডায়। টেকনিক্যাল লাইনের লোক হলেও কানাডায় করেন নন টেকনিক্যাল কাজ। পাশাপাশি লেখালেখিও করেন। ফেইসবুকে অসম্ভব রকমের সরব। বিদেশে থাকলেও বাংলাদেশের কিছুই তাঁর নজর এড়ায় না।
ফেসবুকে তিনি একাধারে কবি, দার্শনিক, রাষ্ট্রচিন্তক, সমাজসংস্কারক ও ডিজিটাল গেরিলা। কানাডার বরফের মধ্যে বসে তিনি বাংলাদেশের গরম রাজনীতি নিয়ে এমনভাবে ফুঁসতে থাকেন, যেন শাহবাগ মোড় তাঁর ড্রয়িংরুমেই অবস্থিত।
ছোটগল্পের মোটাসোটা বইও একখানা লিখেছেন কয়েকবছর আগে। প্রথম বই হিসেবে ব্যবসা মন্দ হয়নি। বইটি একটা পুরস্কারও জিতেছে। এরপর থেকেই তাঁর লেখালেখি এক নতুন স্তরে উঠল। আগে লিখতেন মনের আনন্দে, এখন লিখেন ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথা ভেবে।
এক সকালে তাঁর বাসার ফোন বেজে ওঠে। বাংলাদেশ থেকে ফোন এসেছে। ফোনদাতা সম্ভবতঃ দুই দেশের সময়ের ব্যবধান বিবেচনায় এনেই ফোনটা দিয়েছেন। কানাডায় সকাল সাতটা মানে বাংলাদেশের রাত আটটা।
‘মাসুদ আলী ভাই বলছেন? আমি বাংলাদেশ থেকে আপনার একজন বড় ভক্ত, সৈকত বলছি। কেমন আছেন?’
‘ভক্ত’ শব্দটা কানে যেতেই মাসুদ সাহেবের বুকের ভেতর কোথাও একটা পদকের ঘণ্টা বেজে ওঠে। তবে মুখে বিনয়ী স্বর, ‘জ্বি, আপনার দোয়ায় ভালো আছি।’
‘তো, আপনার সাথে একটা বড়ো পুরস্কার নিয়ে কথা বলতে চাই। পাঁচ মিনিট সময় হবে আপনার?’
‘অসুবিধা নাই, বলেন কী পুরস্কার?’
‘একুশে পদক।’
এই দুই শব্দ শুনে মাসুদ সাহেবের মাথার ভেতরে মুহূর্তেই মুহুর্মুহু আতশবাজি ফোটে। আর, মনের চোখে ভেসে ওঠে লাল গালিচা, টিভি ক্যামেরা, ফুলের তোড়া, আর ফেসবুক পোস্ট: ‘জাতির গর্ব, আমাদের মাসুদ ভাই।’
‘বলেন কি? ওই পদক পাবার মতো কি এমন লিখেছি আমি?’ - বিনয়ী জবাব মাসুদ আলীর, যদিও তিনি মনে মনে ভাবেন, 'নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছি বাংলা সাহিত্যে, নইলে পাঠক আগ বাড়িয়ে এতো বড়ো পুরস্কার দিতে চাইবে কেন?'
ওপাশ থেকে ভক্ত সৈকত বলেন: ‘কি যে বলেন প্রিয় লেখক, আপনি অনেক ভালো লেখেন। হস্তী কি কখনো তার নিজের শরীর দেখতে পায়? যাঁরা এ পুরস্কার এর আগে পেয়েছেন তাঁদের অনেকের লেখাই আপনার ধারেকাছেও না। লেখার কোয়ালিটি নিয়ে টেনশন করবেন না।’
‘কিন্তু, আমি তো লিখেছি মাত্র একখানা বই। পুরস্কার দিয়ে কি লোক হাসাবেন?’
‘ওটা নিয়ে ভাববেন না মাসুদ ভাই, মাত্র পাঁচখানা বই লিখে বিশ্ববিখ্যাত নোবেল প্রাইজ পাবার মতো দৃষ্টান্তও আছে, আর এটা তো তৃতীয় বিশ্বের কোন এক অখ্যাত দেশের এক সাহিত্য পুরস্কার কেবল - লেখার কোয়ালিটি ভালো হলে এমন পুরস্কার পেতে একখানা বইই যথেষ্ট হতে পারে। তবে আপনাকে দিয়ে আরো অন্তত দুটি বই আমরা লেখাবো। তাছাড়া, আপনি যতটা ভাবছেন তার চেয়ে ঢের বেশি মানুষ আপনাকে চেনে। এ পুরস্কার আপনার প্রাপ্য।’
‘সত্যি বলছেন তো? ভাই, আমি যে দেশে এতটা বিখ্যাত তা আপনার আগে কেউ কিন্তু বলেনি।’
‘প্রিয় কথাসাহিত্যিক, বাঙালি কি কোনোদিন কারো প্রশংসা করে বলে শুনেছেন? আপনি হাজারো ভালো কাজ করলেও কেউ আপনাকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ দেবে না, কিন্তু, একটি বড়ো মাপের খারাপ কাজ করে দেখুন তো, ফেইসবুকে আপনি ভাইরাল হয়ে যাবেন নিমেষে। এটাই টিপিক্যাল বাঙালি চরিত্র।’
‘তাই?’ - সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে মাসুদ সাহেব চুপ। কারণ, অচেনা এ ভক্তের কথাগুলোতে বেশ যুক্তি আছে।
‘হ্যাঁ, তবে, আপনাকে আমি এখনই পুরস্কারের ব্যবস্থা করছি না। পুরস্কার দেয়া হবে আরো দু বছর পর।’ - সৈকত নতুন শর্ত জুড়ে দেন।
‘বুঝলাম না, একটু খুলে বলবেন?’ - মাসুদ সাহেব এবার খানিক টেনশনে পড়লেন। কারণ, এতক্ষন ভেবেছিলেন তিনি পুরস্কারটা পেয়েই যাচ্ছিলেন।
‘শুনুন মাসুদ ভাই, পদকটা দেয়া হয় কিছু সূক্ষ্ণ হিসেবনিকেশের মাধ্যমে।’
'কিভাবে?'
‘এক বা দুজন যোগ্য লেখককে তালিকায় রেখে বাকিদের পুরস্কারটা দেয়া হয় মূলতঃ অর্থের লেনদেনে। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ থাকেন বলে আপনি হয়তো এ বিষয়গুলো তেমন জানেন না। ওই যোগ্য লেখক দুয়েকজনকে আমরা বলি, 'পুরস্কারের বলি,’ মানে, তাঁরা বলি হন অন্যদের কাছে।’
‘তাই নাকি? তাঁদেরও কি টাকা দিতে হয়?’
‘না না, 'বলি'দের কাছ থেকে কোন অর্থ নেয়া হয় না। তাঁদেরকে শুধু কিছু অলেখক-কুলেখকের পাশাপাশি সেজেগুজে মঞ্চে উপস্থিত হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করতে রাজি হতে হয় - এই যা!’
‘কিন্তু, আমার তো জমানো টাকাপয়সা তেমন নেই। জানেন তো, কানাডায় বেতনের একটা বড়ো অংশ ট্যাক্স হিসেবে সরকার নিয়ে নেয়।’
‘ভাই, আপনাকে তো এখন দিতে হবে অতি সামান্য। দুবছর পরে বাকি টাকা দিতে হবে।’
‘মোট কত টাকা দিতে হবে?’
‘কথা বলার সুযোগ যেহেতু দিয়েছেন, পুরস্কারের সব নিয়মকানুন খুলেই বলি। বিষয়টা কেবল টাকার না। আপনাকে বিভিন্নভাবে পুরস্কারের জন্য তৈরী করে তুলতে হবে।’
'যেমন?'
‘এই দুবছরে আপনাকে আরো দুইটা বই লিখে ফেলতে হবে। আপনিই তো বলেছেন, কেবল একটা বইয়ে এতবড়ো পুরস্কার দিলে তা নিয়ে সমালোচনা হবে।’
‘কথা ঠিক, একদম সঠিক। বিষয়টি আমার নিজের কাছেও বেঢপ ঠেকছে।’
‘আপনি তো ছোটগল্পের মানুষ। ওই লাইনেই লিখুন, সমস্যা নেই। তবে গল্প লেখার সময় বইগুলো জাতীয় পুরস্কারের কাজে ব্যবহার হতে পারে, এটা একটু মাথায় রাখবেন।’
'মানে?'
‘মানে, পুরস্কার যাঁরা দেন তাঁরা ক্ষেপে গেলে তো মুশকিল! আপনি তো অনেকসময় প্রথার বাইরে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে লেখেন - সেটি আপনাকে বন্ধ করতে হবে। কারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছে লেখালেখির সময় তা মাথায় রাখতে হবে।’
'আর?'
'প্রধানমন্ত্রী, তাঁর মা-বাবা, বা ঘনিষ্ঠ কোনও পরিবারের সদস্যের স্তুতি করে আপনাকে একটা উপন্যাস, বা নিদেনপক্ষে একটা বড়োসড়ো ছোটগল্প লিখতে হবে। আর, সে লেখায় তাকে একপ্রকার মহা মানবে পরিণত করে ফেলবেন।'
'ওই যে, স্বৈরাচারী হাসিনা আমলে যেভাবে শিশু রাসেলের জীবনী নিয়ে গল্প-উপন্যাস লেখার প্রতিযোগিতা চলছিল সেরকম?'
'ঠিক ধরেছেন ভাই, তেমনই। আপনার লেখাটি আমরা ভাড়াটে লোক দিয়ে ফেইসবুকে হাজার হাজারবার শেয়ারের ব্যবস্থা করবো, যতক্ষণ পর্যন্ত না তা প্রধানমন্ত্রীর নজরে পড়ে। পজিটিভ রিভিউও লেখাবো বেশ কয়েকটা।’
'তাই বুঝি?'
‘আর হ্যাঁ, এই দুবছরে ১০ লাখ টাকা জমিয়ে ফেলবেন। এটা আপনার জন্য বড়ো ব্যাপার নয় - শুনেছি আপনার ওয়াইফ, মানে, ভাবিও কানাডায় প্রফেশনাল কাজ করেন। তাছাড়া, কানাডা-আমেরিকার এক টাকায় এখানে শত টাকা হয়ে যায়। তাই, এ সামান্য টাকায় সমস্যা হবার কথা নয়। - কি বলেন?'
‘ভাই, ১০ লাখ টাকা তো অনেক টাকা! এখানে তো সংসার খরচ আর বাড়ির মর্টগেজ দিয়ে হাতে তেমন কিছু থাকে না।’
‘না না পারবেন, চেষ্টা করলে পারবেন। আরেকটা কথা, আপনার টাকা কিন্তু মার যাবে না। পুরস্কার পাবার গ্যারান্টি দেয়া হবে। পুরস্কার কমিটির সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্যের সাথেই আপনার চুক্তি হবে। এছাড়া, আপনি তো পুরস্কার পেলে লাখ চারেক টাকা ফেরতই পাচ্ছেন।’
‘কিভাবে?’
‘পুরস্কারে আপনি নগদ দুলাখ টাকা পাবেন। তারপর, ত্রিশ গ্রাম স্বর্ণ দিয়ে তৈরী যে পদকটা পাবেন তার দামও তো লাখ দুয়েকের কম না। তারমানে, অর্ধেক টাকা তো পেয়েই যাচ্ছেন।’
‘হুম! কিন্তু, স্বর্ণটা কি রিয়েল?’ - পুরস্কারে অতীতে ভেজাল স্বর্ণ দেবার খবর মাসুদ আলী জানেন।
‘অবশ্যই। এটা একটা জাতীয় পুরস্কার, এখানে ভেজাল দিলে তো সারাদেশে খবর হবে।’
পুরস্কারে বিনিয়োগের প্রায় অর্ধেক টাকা রিটার্নের নিশ্চয়তা পেয়ে মাসুদ সাহেব এবার খানিকটা শান্ত হলেন।
খানিক থেমে সৈকত সাহেব যোগ করলেন, ‘আপনি খুব ভালো লিখেন, কিন্তু সে তুলনায় বাংলাদেশে আপনার পরিচিতি সে পর্যায়ে নেই। পুরস্কারের জন্য আপনাকে আমরা রেডি করে নেবো। আপনি কয়েকটি গল্প লিখে আমাকে ইমেইল করবেন। দেশের একটা নামিদামি পেপারে নির্দিষ্ট বিরতিতে সেসব ছাপার ব্যবস্থা করা হবে।’
‘ওরা ছাপাতে না চাইলে?’
‘ওই দায়িত্ব আমার। সবকাজ নগদ নারায়ণে হবে। আপনি শুধু লিখে যাবেন। এই ধরুন, মাসে দুইটা। আপনার গল্পের গঠনমূলক সমালোচনা লেখার ব্যবস্থাও আমি করবো। রিভিউ লেখার লোক কলম নিয়ে এক পায়ে খাড়া আছেন। তবে, এসব কাজের জন্য কিছু টাকা আপনাকে সহসাই পাঠাতে হবে। বাকি টাকা পরে দিলেও চলবে।’
‘এটাতো ফেইসবুকের যুগ। ফেইসবুকে কিছু করবেন না?’ - মাসুদ আলী সারাদিন ফেইসবুকে ডুবে থাকেন। তাই, ফেইসবুকের সুবিধাও তিনি পুরোদমে নিতে চান।
‘তা তো অবশ্যই। কয়েক ডজন পাঠক ভাড়া করে আপনার লেখালেখির প্রশংসা করে নিয়মিত পোস্ট দেয়া হবে। পোস্টে ওরা আপনাকেও ট্যাগ করবে। আপনি অটোগ্রাফ দিচ্ছেন এমন ছবিও শেয়ার করা হবে। কয়েক সুন্দরী তরুণী ভাড়া করে তাদের দিয়ে আপনার সাক্ষাৎকার নিয়ে তা অনলাইনে প্রচার করা হবে। … আরো অনেক পরিকল্পনা আছে যা আপনি আমাদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করলে শুরু করা হবে।‘
‘বাহ্, বেশ তো! লেখক জাফর আলীর মতো কবর জিয়ারতের মতো কিছু করবেন নাকি?’
'সেটি আবার কি মাসুদ ভাই? একটু খুলে বলবেন?'
'কেন, আপনারা খোঁজ রাখেন না বুঝি? ওই যে, একুশে পদক পাওয়া নাস্তিক লেখক জাফর আলী - যিনি পবিত্র কোরানের কোন এক সূরার বিকৃত অনুবাদ করে বেশ বেকায়দায় পড়েছিলেন একবার - প্রতি বছর দলবল নিয়ে সাত্তার মিয়ার কবর জিয়ারত করতে যান!'
‘'বাবা' উপন্যাসের মূল চরিত্র সেই সাত্তার মিয়ার কথা বলছেন?'
'ঠিক, ধরেছেন - সে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সাত্তার মিয়া। উপন্যাসের আবেদন বাড়াতে দেশপ্রেমিক সেই সাত্তার মিয়াকে একদল 'দেশদ্রোহী' দিয়ে মেরে ফেলা হয় ২২ জানুয়ারি। আর, সেই ২২ জানুয়ারিতে প্রতি বছর সাত্তার মিয়ার ‘প্রতীকী কবর’ দলবল নিয়ে লেখক জাফর আলী জিয়ারতে যান, এবং তা ফেইসবুকে ঘটা করে প্রচার করেন।'
'এভাবে দলবল নিয়ে কবর জিয়ারত এর ছবি বা খবর শেয়ার করে তার লাভ কি মাসুদ ভাই?' - সৈকত বিষয়টা তাৎক্ষণিক ধরতে পারেন না।
'বইয়ের বিজ্ঞাপন হয় - বিক্রি বাড়ে! বাংলাদেশের মানুষ তো ভীষণ আবেগী - দেখেন না, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে বাজারে টুপি, তসবিহ, বা হিজাবের বিক্রি কেমন বেড়ে যায়!'
'লেখক জাফর আলী তো নাস্তিক মানুষ; তিনি কেন কবর জিয়ারতে যান?'
'বলেছি তো, এটা বইয়ের বিজনেস প্রমোশন - বিশ্বাস-অবিশ্বাস সে ভিন্ন জিনিস। এখানে ধর্ম বা দোয়া মুখ্য নয়, বইটির বিক্রি বাড়ানোই উদ্দেশ্য।' - মাসুদ আলী সৈকতকে জলের মতো পরিষ্কার সবকিছু বুঝিয়ে দেন।
'ঠিক বলেছেন মাসুদ ভাই। তাহলে আপনিও একটা উপন্যাস লিখুন যেখানে সাত্তার মিয়ার মতো একটা চরিত্র থাকবে। সেও দেশপ্রেমের কারণে মারা যাবে। আর, আপনার হয়ে আমরা দল বেঁধে তার কবর জিয়ারতে যাবো - আপনার বইয়ের কাটতিও হবে বেশ। কি বলেন?'
'চেষ্টা করে দেখি। … আচ্ছা, এবার আসল কথায় আসি; আপনাকে কি পুরো দশ লাখ টাকা আগাম দিতে হবে, নাকি এখন দুই লাখ দিলে চলবে?’
‘হ্যাঁ, ওতেই আপাততঃ চলবে। তবে আরেকটা কথা, বছরখানেক পর আপনাকে একবার দেশে আসতে হবে। আপনার সম্বর্ধনার আয়োজন করা হবে পত্রিকার তরফ হতে। চেনামুখের কিছু কবি সাহিত্যিককেও খরচপাতি দিয়ে উপস্থিত রাখা হবে। আপনার জন্য পুস্পমাল্য ক্রয়েও কিছু ব্যয় হবে। অনুষ্ঠানের টিভি কাভারেজও দেয়া হবে। তখন আরো লাখখানেক টাকা দিলেই হবে। বুঝলেন না, মানুষকে তো আগে থেকেই চিনতে হবে ঠিক এক বছর পরই একুশে পদক পাবেন এমন একজন লেখককে। আপনার লেখা মানসম্পন্ন হলেও পুরস্কারদাতাদের তো খুশি করতে হবে - এটা একটা বড়ো সিন্ডিকেট; বুঝলেন না?’ - একসাথে অনেক মূল্যবান তথ্য দিয়ে ফেললেন সৈকত।
'আচ্ছা, শুনেছি, অনেকসময় পুরস্কার দেবার পরও জনরোষের কারণে তা ফিরিয়ে নেয়া হয়। যতটা জানি, সম্প্রতি এক সচিবের বাবার ক্ষেত্রে তেমন ঘটনা ঘটেছিল। আমার ক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটলে তো পুরো টাকাটাই জলে যাবে। বিষয়টা ভেবেছেন?'
'তেমন কিছু না ঘটার জন্যই তো আমরা আঁটঘাট বেঁধে মাঠে নামছি; অহেতুক টেনশন নেবেন না।'
‘বুঝেছি, বুঝেছি।’ মাসুদ সাহেব সৈকতের কথায় সায় দিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, সব মিলে আট লাখে কাজটা করা যায় না?’
মাসুদ সাহেব এ কাজে আট লাখ বিনিয়োগ করবেন তা সৈকতের ধারণার বাইরে ছিল। তিনি মনে করেছিলেন, দশ লাখ টাকা চাইলে তিনি হয়তো পাঁচ লাখের প্রস্তাব দেবেন। তাই, তিনি মনে মনে খুব খুশি হলেন। বলা বাহুল্য, এ পদকের জন্য তার অন্য লেখক খদ্দেররা দুই-তিন লাখের বেশি কখনো দেননি।
তারপরও, খুশি মনে চেপে রেখে বললেন, ‘আট লাখে করলে আমার হাতে যে কিছু থাকে না ভাই! আট লাখ তো ওদেরই বিলিয়ে দিতে হবে। এই টাকার ভাগ অনেকে পায়। যাক, আপনার মতো ভালো লেখকের জন্য এই কন্ট্রাক্টটা না হয় বিনা লাভেই করলাম। গুণীর কদর করেই তো জীবন কাটালাম। ঠিক আছে, আট লাখই যোগাড় করুন। আপনার মানের একজন লেখককে পুরস্কারের আওতায় নিয়ে আসবো এটাই আমার প্রকৃত পাওয়া।’
২.
সৈকতের সাথে ফোনালাপের বিষয়টা মাসুদ আলী দিনকয় নিজের ভেতরেই লুকিয়ে রেখেছিলেন - ভয়ে স্ত্রীকে বলেন নি। কেননা, স্ত্রী তাঁর লেখালেখিতে সময় নষ্টের কারণে এমনিতেই বিরক্ত।
তবে তিনি সুযোগ খুঁজছিলেন কিভাবে বিষয়টা তাঁর স্ত্রীর সাথে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা করা যায়। পুরস্কারের জন্য অনেক টাকার বিনিয়োগ বলে কথা।
বাসায় না বলে রেস্টুরেন্টে খাবারের ফাঁকে তিনি তাঁকে কথাটা বলবেন স্থির করলেন। তখন তাঁর স্ত্রীর মনটা নিশ্চয়ই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উৎফুল্ল থাকবে।
পরের উইকেন্ডে রেস্টুরেন্টে খাবার গ্রহণের ফাঁকে সুযোগ বুঝে মাসুদ আলী সাহেব স্ত্রীকে বললেন: ‘আমি লেখালেখিতে খুব বড়ো কোন পুরস্কার জিতলে তোমার কেমন লাগবে লক্ষ্মীটি?’
‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? এতদিন পর শান্তিতে একটু রেস্টুরেন্টে খেতে এসেছি, আর এখানেও লেখালেখির কথা! তোমাকে পুরস্কার দেবেটা কে শুনি?’
‘কি যে বলো? আশ্বাস না পেলে কি এমনি এমনি তোমাকে বলি?’ - মাসুদ সাহেবের মুখে রহস্যের হাসি।
তারপর ধীরে ধীরে সেদিনের ফোনালাপের বিষয়টা স্ত্রীকে খুলে বললেন তিনি।
সব শুনে উত্তেজিত না হয়ে তাঁর স্ত্রী তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন: ‘দেখো মাসুদ, দুইনম্বরি কাজ করতে হচ্ছে বলে আমরা দুজনই কতো সুন্দর, আরামদায়ক, ফকফকা ভবিষ্যতের সরকারি চাকুরী ছেড়ে বিদেশে এসে এখনও গাধার খাটুনি খাটছি। সৎ আয়ে অনেক চেষ্টার পর অবশেষে দাঁড়িয়েও গেছি একরকম। আজ এতো বছর পর তুমি আবার দুইনম্বরি চিন্তা করছো কেন?’
'সাহিত্য পুরস্কারের বিষয় দুইনম্বরি হয় কিভাবে?'
'তুমি কি কচি খোকা যে এখানে দুইনম্বরি কিভাবে হচ্ছে তা বুঝতে পারছো না? বলতো, উন্নতদেশগুলোতে কবিসাহিত্যিকরা টাকাপয়সা খরচ করে পুরস্কার পায়?'
কয়েক মুহূর্তের বিরতি নিয়ে মাসুদ সাহেবের স্ত্রী আবার বলতে শুরু করেন, ‘খবরদার, এ নিয়ে আমার সাথে দ্বিতীয়বার কথা বলবে না। গল্প-উপন্যাস লিখতে চাইলে লিখো, তবে তা যেন ওই উদ্দেশ্যে না হয়। পুরস্কার ছাড়াই দেশে বিদেশে আমাদের অনেকে চেনে। আজকাল বাংলাদেশের পুরস্কারের যা অবস্থা, ওই পুরস্কার গ্রহণ করলেই বরং লোকে তোমাকে সন্দেহের চোখে দেখবে। মানুষকে অতো বোকা মনে করো না। পুরস্কার কেনার চিন্তা বাদ দাও।’
মাসুদ আলী সাহেবের স্ত্রী দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, বুদ্ধিমতী ও পরিশ্রমী মহিলা। দুই দশকের সংসার জীবনে মাসুদ সাহেব নানাভাবেই তাঁর স্ত্রীর বুদ্ধিমত্তা প্রত্যক্ষ করেছেন। তাছাড়া, বছর পাঁচেক আগে হঠাৎ মাসুদ আলীর চাকুরী চলে গেলে তাঁর স্ত্রী কি কঠোর পরিশ্রম ও নৈপুণ্যে সংসারের হাল ধরেছিলেন তাও তাঁর মনে পড়লো আরেকবার। সংসারের প্রতি অবদান ও ত্যাগ-তিতিক্ষা বিবেচনায় স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ আবারো জেগে উঠে তাঁর মনে। সবদিক ভেবে স্ত্রীর পরামর্শ বিনাবাক্যে গ্রহণ করলেন তিনি। একুশে পদক কেনার চিন্তাও আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললেন লেখক মাসুদ আলী।
এম এল গনি
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




