মম চৌধুরী
আমার দেশকে অন্ধকারে ঢেকে দিতে এগিয়ে আসছে কালোমেঘ। এই মেঘ রুখে দিতেই হবে। কেননা, ২০১১ সালের শেষ প্রান্ত ১৮ ডিসেম্বর এসে ২০০৪ সালের জঙ্গি সংগঠন জেএমবি'র মতো সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে রাজধানীজুড়ে অস্থিরতা চালানোই ছিল জামায়াত-শিবির আর বিএনপির উদ্দেশ্য। এ লক্ষ্যেই সেদিন ভোর থেকেই তারা মাঠে নামে। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা আগেভাগে বিএনপি-জামায়াতের এ পরিকল্পনা সরকারকে অবহিত করায় পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ কারণে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে তারা বোমার বিস্ফোরণ ঘটালেও পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। যদিও ঘটনার পরপরই রাজধানীজুড়ে জ্বালাও- পোড়াও ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পরে রাজধানীজুড়ে কড়া সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সচিবালয়, হাইকোর্ট, বিমানবন্দর, মন্ত্রীপাড়া, সংসদ ভবন, রেলস্টেশন, লঞ্চ টার্মিনালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে র্যাব ও পুলিশের টহল। গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, বিএনপি ও জামায়াতের লোকজন রাজধানীজুড়ে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও বোমা হামলা চালিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তবে রাজধানীর কমপক্ষে ৫০টি স্থানে বোমা হামলা চালানোর টার্গেট ছিল তাদের। অরাজকতার মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এ জন্য রাজধানীর বাইরে থেকেও বোমাবাজদের ঢাকায় আনা হয়। তারা ঢাকায় এসে পৌঁছানোর পরেই হামলা শুরু হয়। ভোরের দিকে একটি বাসযোগে বরিশাল থেকে কিছু লোক প্রেসক্লাবের সামনে পৌঁছে। তারা বিএনপি আহূত যুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে যাওয়ার কথা বললেও নাশকতার জন্যই তারা ঢাকায় আসে। তাদের সঙ্গেই পুলিশের প্রথম মারামারি বাধে। হামলার নীলনকশার ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করা হয়। সবগুলো হামলাই ছিল চোরাগুপ্তা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বাধা পেয়ে তারা পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। র্যাব-৩-এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদেরকে জানান, এ ধরনের হামলা হতে পারে-এমন খবর আগেই জানতে পারে র্যাবের গোয়েন্দারা। হামলা প্রতিরোধে সেভাবেই প্রস্তুতি নেয়া হয়। র্যাবের ২২টি ইউনিটকে ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোতায়েন করা হয়। এর পাশাপাশি চলে গোয়েন্দা নজরদারী। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও র্যাবের সতর্কতার কারণে হামলাকারীরা তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বোমা হামলা চালাতে ব্যর্থ হয়েছে। অপর একটি গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের কাছে দেয়া প্রতিবেদনে মুক্তাঙ্গন, পল্টন, শান্তিনগর, বাংলামটর, গাবতলী, সোনারগাঁও ক্রসিং ও ইউবিএল ক্রসিংয়ে বিএনপি ও জামায়াতের লোকজন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে এবং হামলা চালাতে পারে বলে আগেই খবর দিয়েছিল। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা জানান, পুলিশ আগেই হামলার আশঙ্কার বিষয়টি জানতে পেরে সতর্ক অবস্থান নেয়। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পল্টন, নয়াপল্টন, মতিঝিল ও প্রেসক্লাব এলাকায় হামলাকারীরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। ফলে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালাতে না পেরে বিচ্ছিন্নভাবে তারা নগরীর কয়েকটি স্থানে চোরাগুপ্তা হামলা চালায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা গেছে, মতিঝিলে হামলায় হাবিবুর রহমান নামে এক হামলাকারীকে হাতে নাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, বিএনপি ও জামায়াতের পরিকল্পিত এই হামলার উদ্দেশ্যই ছিল অরাজকতা তৈরি করা। যার সূত্র ধরে নগরীজুড়ে বোমা ভাংচুর ১২টি গাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে বিএনপি-জামায়াত জড়িত। শুধু কি তা-ই? তখনও সূর্যের আলো ফোটেনি। কনকনে শীত। ঠান্ডায় জবুথবু মানুষ। রাজপথে লোকজনের চলাচল ছিল সামান্য। নগরবাসীর অধিকাংশই তখনও ঘুমিয়ে। এ সময়ই হঠাৎ বোমার শব্দে কেঁপে ওঠে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল। হামলাকারীদের তান্ডবে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গোটা নগরী। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হাতবোমা, গাড়িতে আগুন ও ভাংচুর চালানো হয়। এতে নগরজুড়ে আতঙ্ক ও ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনায় জড়িত থাকায় পুলিশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৪৯ জনকে আটক করেছে। মতিঝিলে হাতবোমা বিস্ফোরণে আরিফুজ্জামান আরিফ (২৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে তিনজন। তবে ধারনা করা হচ্ছে, হাতবোমা বহন করতে গিয়ে আরিফ নিহত হন। যদিও আরিফের ককটেল বহনের কথা অস্বীকার করেছে তার পরিবার। এ হামলার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানো, দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতে বিরোধীদলীয় নেতার নির্দেশে এ হামলা চালানো হয়। আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকায় হামলাকারীদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। এত ঘটনা ঘটানোর পর আবার ‘চোরের মার বড় গলা’র মত করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেন, বিএনপির পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বানচাল করতে সরকারদলীয় নেতাকর্মী ও পুলিশ দিয়ে এ হামলা চালানো হয়। রাজধানীর ঘটনা কিছু সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে দেশের কয়েকটি এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর চালানো হয়। শুধু রাজধানী-ই নয়, সারাদেশে তান্ডব চালিয়েছে বিএনপি-জামায়াত চক্র। সিলেট নগরীর ১০টি স্পটে অর্ধশতাধিক গাড়িতে ভাংচুর চালানো হয়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে একটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগে ঘটনাস্থলেই একজন মারা যান। নিহতের পরিচয় পাওয়া যায়নি। সিরাজগঞ্জে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা একটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ করে। এতে তাড়াহুড়া করে নামতে গিয়ে ১০ জন আহত হন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক হামলার প্রতিবাদে দুপুরের পর বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন মিছিল-সমাবেশ করে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সহিংস ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা বিএনপি-জামায়াতের কর্মী। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১২টি গাড়িতে আগুন দেওয়া ও ভাংচুর করা হয়। এর মধ্যে দুটি পুলিশের গাড়ি। ভাংচুর চালানো হয় বেশ ক'টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও। হঠাৎ তাণ্ডবের পর রাজধানীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে গতকাল নগরজুড়ে যান চলাচল ছিল খুবই কম। ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো মানুষ। দুপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও সন্ধ্যার পর রাজধানীতে আরও ক'টি এলাকায় গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএনপির মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় জামায়াত নেতা গোলাম আযমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুষ্ঠানস্থলে আসতে পথে পথে বাধা দেওয়া হয়। এরপর রাজধানীর বেশ ক'টি স্পটে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। জানা যায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (সদর দফতর) হাবিবুর রহমান জানান, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, শান্তিনগর, পল্টন, প্রেস ক্লাবসহ কয়েকটি এলাকায় জামায়াত-শিবির কর্মীর তান্ডব চালায়। অন্যান্য এলাকায় তাদের সঙ্গে বিএনপি কর্মীরা সক্রিয় থেকে এসব সহিংস ঘটনা ঘটিয়েছে। এসময় দিগন্ত টিভির সাংবাদিকদেরকেও হামলা করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ করেছে প্রত্যক্ষদর্শীরা। ঘরোয়া রেস্তোরাঁর উল্টো পাশে অগ্রণী ব্যাংকের মতিঝিল শাখার সামনে একটি বাস থামে। সেখান থেকে ৮-১০ যুবক নেমে আসে। এরপরই আশপাশ থেকে আরও ১৫-২০ যুবক হোটেলটির সামনে জড়ো হয়। তারা জামায়াতের বন্দি নেতাদের মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিয়ে মিছিল শুরু করলে পুলিশ ধাওয়া দেয়। মিছিলকারীরা গাড়ি ভাংচুর শুরু করে। এক পর্যায়ে মিছিলকারীরা কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গলির ভেতর চলে যায়। এ সময় রোড ডিভাইডারের (সড়ক বিভাজন) ওপর এক যুবককে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শী আনসার সদস্য মজিবুর রহমান ও মতিঝিল পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই বজলুর রশীদ বলেন, ওই যুবক দৌড়ে পড়ে যাওয়ার পরই দুটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। এরপরই তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখা যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তার পকেটে থাকা ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখে তার নাম আরিফুজ্জামান আরিফ বলে জানা যায়। মতিঝিল থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন বলেন, নিজের কাছে থাকা বোমার বিস্ফোরণে নিহত হন ওই যুবক। তার সঙ্গে থাকা আরও তিন যুবক পালাতে সক্ষম হলেও রোড ডিভাইডারের কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে যান আরিফ। এ সময় তার কাছে থাকা বোমা বিস্ফোরিত হয়। বোমায় আহত দু'জনের বক্তব্য হলো, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শহীদ নূর হোসেন চত্বর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন সোনালী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখার কর্মকর্তা সালে আহম্মেদ মজুমদার (৫৭)। তিনি জিপিও মোড়ে পৌঁছলে বিকট শব্দে একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তার ঘাড়ের কিছু অংশ ঝলসে যায়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। হাসপাতালে আহম্মেদ মজুমদার জানান, জিপিও মোড়ে জামায়াতের মিছিল চলছিল। মিছিলের পাশ দিয়েই তিনি হেঁটে অফিসে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই বিস্ফোরণের শব্দ। অন্য আহত জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি শেয়ারবাজারে একজন বিনিয়োগকারী। গতকাল সকালে তিনি মতিঝিলে সিটি ব্যাংক থেকে হেঁটে সেনা কল্যাণ ভবনের দিকে যাচ্ছিলেন। শাপলা চত্বরের সামনে হঠাৎ ককটেল বিস্ফোরণে তিনি দু'পায়ে আঘাত পান। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে শুয়ে পড়েন। তিনি বলেন, একটি মিছিল থেকে ককটেল ছুড়ে মারা হয়। এই হলো বাংলাদেশ, যেখানে যুদ্ধাপরাধীদেরকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধাপরাধী সমর্থক গোষ্ঠি উঠে পড়ে লেগেছে। উঠে পড়ে লেগেছে তাদের দোসর বিএনপিও।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






