somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার

০৩ রা নভেম্বর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৫ বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হলো দিনাজপুরের পার্বতীপুরে। ১৮ অক্টোবর বাড়ির সামনে থেকে উধাও হয় শিশুটি। পরদিন রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া গেল তাকে। শিশুটিকে উদ্ধার করে তাকে প্রথমে দিনাজপুরের ল্যাম্প হাসপাতাল সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তার চিকিৎসায় চলছে নানা তোড়জোড়। এলাকার সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়েছে রাস্তায় প্রতিবাদ করতে। সকলকে সাধুবাদ। অপরাধ সংঘটিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে এভাবে সমাজ-রাষ্ট্র সবাই এসে দাঁড়াবে এটাই কাম্য। কিন্তু অপরাধ যাতে না হয় তার জন্য আমরা কি করছি? ৫ বছরের একটা শিশু ধর্ষণের শিকার কেন হলো? কেন চল্লিশোর্ধ পুরুষ ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে? আমরা দেখেছি এর আগেও এর চেয়ে কম বয়সের শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আবার ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ষাটোর্ধ বৃদ্ধাও। কিন্তু কেন?

প্রতিদিনই ধর্ষণ হয়, হতেই থাকে। আমরাও প্রতিবাদী হতেই থাকি ঘটনা ঘটে যাবার পরে। রাষ্ট্র তৎপর হয়। অপরাধী গ্রেপ্তার হয় কিংবা হয় না। অপরাধীর শাস্তি হয় অথবা হয় না। তারপর আবার ধর্ষণ। মানব সমাজে ধর্ষণ কখনোই কাম্য নয়। কিন্তু তারপও হয়। কারণ আমরা ধর্ষকামী মানসিকতার পরিবর্তনে কোন কাজ করি না। না করে সমাজ আর না করে রাষ্ট্র। আর আমাদের সমাজে পরিবার এবং পারিবারিক সম্পর্কগুলো হলো রক্ষণশীল। একজন ছেলেশিশু যাতে ভবিষ্যতে ধর্ষক না হয়ে উঠে সেই শিক্ষা আমাদের সমাজে পরিবারগুলো দিতে পারে না তাদের রক্ষণশীলতার কারণে। তবে একজন ছেলেশিশু যাতে নিপীড়ক হয়ে গড়ে উঠেতে সক্ষম হয় সেই শিক্ষা সে পরিবার এবং সমাজ দুই জায়গা থেকেই পায়। প্রতিনিয়ত একজন ছেলেশিশু তার পরিবার ও সমাজ থেকে পুরুষতান্ত্রিকতা চর্চার প্রশিক্ষণ পায় আর পাশাপাশি দেখে নারীর অধস্তনতা। এভাবেই সে হয়ে উঠে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্ষমতাবান। টের পায় পুরুষ হিসাবে জন্ম নিয়ে সে গর্বিত। সমাজে তার ক্ষমতা কতখানি। আরো বুঝতে পারে পুরুষতান্ত্রিকতা চর্চায় এবং টিকিয়ে রাখায় তার দায়িত্ব কি? ধীরে ধীরে সেও হয়ে উঠে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধি।

আমাদের দেশের নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে সকলে মিলে অপরাধ কিংবা সমস্যার নানান ধরন এবং স্তর নির্ধারণ করেছেন। স্বামী তার স্ত্রীকে পেটালে সেটা পারিবারিক সমস্যা। ধর্ষণ হলে সেটা সামাজিক সমস্যা। রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়া-না যাওয়া কিংবা থাকা-না থাকার বিষয়ক হলে সেটা রাজনৈতিক সমস্যা। ফলে একজনের সমস্যায় অন্যজন কথা না বলে চুপচাপ থাকে। আর একজনের ব্যাপারে অন্যজন কথা বললে তা হস্তক্ষেপ কিংবা নাক গলানো বলে ভাবা হয়। এখানে রাজনীতি করেন রাজনৈতিক দল আর সমাজ নিয়ে কথা বলেন এনজিওরা। তাই এনজিওদের রাজনীতির বিষয়ে কোন কথা বলা মানা আর সামাজিক সমস্যা বলে যে সকল বিষয় চিহ্নিত তা নিয়ে রাজনৈতিক দল এবং তাদের নেতৃবৃন্দ চুপচাপ থাকেন। কেউ কারো দায় নিতে চায় না আবার দায়িত্ব ছাড়তেও চায় না। তাই ধর্ষণ হলে রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ কোন কথা বলেন না। কারণ তাদের অন্য আরো অনেক এজেন্ডা রয়েছে।

একজন নারীকে ধর্ষণ করা হলো পুরুষতান্ত্রিকতার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। নারীকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে পুরুষতন্ত্রের কর্তৃত্ব জাহির করা। পুরুষালি সমাজে পুরুষকেই নারীর সকল দায়িত্ব অর্পণ করা আছে। সুতরাং পুরুষ নারীকে যা খুশি তাই করতে পারে এমন একটি মানসিকতা নিয়েই সে বেড়ে উঠে। শহর কিংবা গ্রামে একটা প্রবাদ প্রায়শই বলতে শোনা যায়, ‘আরে জেল-হাজত তো পুরুষ মানুষের জন্যই।’ প্রবাদটি বলবার উদ্দেশ্য হলো পুরুষ মনেই করে যে, সেই সমাজে ক্ষমতাবান। ফলে সকল অন্যায় করার দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত আছে। তাই বিচার হবে শুধু পুরুষেই আর তাতে জেল-হাজতে যাবে শুধু পুরুষেরাই। এগুলো হলো পুরুষালি সমাজের মনস্তত্ত্ব। এমন মানসিকতা নিয়ে যদি একটি শিশু বেড়ে উঠে তবে তার পক্ষে ধর্ষক হয়ে উঠা অবাক হবার মতো কোন বিষয় নয়। দিনাজপুরে শিশু ধর্ষণ, ইয়াসমিন হত্যা, তনু হত্যা, আফসানা হত্যা, খাদিজাকে নৃশঃসভাবে কোপানো কিংবা বিসিআইসি কলেজের ছাত্রী যমজ বোনকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় পেটানো সবই এই পুরুষালি মনস্তত্ত্বের ফলাফল। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। সমাজ থেকে পুরুষালি মনস্তত্ত্ব দূর করে এটাকে সহিংসতামুক্ত করার উপায়টা তাহলে কি হতে পারে তা অবশ্যই ভাবনার দাবি রাখে। আমাদের সামনে আছে কিছু গৎবাঁধা কথা আর কিছু গৎবাঁধা কাজের নমুনা। যা আসলে সাময়িক উপশম। আমরা সকলেই জানি ইংরেজিতে একটি কথা আছে, Prevention is better than cure. কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতাসহ অন্যান্য সকল ধরনের সহিংসতা দূরীকরণে আমরা প্রিভেনশনের কথা মনেই রাখি না। আমরা শুধু উপরে উপরে বার্নিশ করে চকচকে তকতকে রাখার চেষ্টা করি আমাদের জীবনটাকে। কিন্তু এটা কি আদৌ কোন সমাধান?

নারী এই সমাজ-রাষ্ট্র-পরিবারে যত ধরনের সহিংসতার শিকার হয় তা সাধারণত তার চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী ব্যক্তির দ্বারাই হয়ে থাকে। পুরুষ নারীর চেয়ে ক্ষমতাবান হবার কারণে পুরষ কর্তৃক নারী নির্যাতনের শিকার হয়, সেটা পরিবার-সমাজ-কিংবা রাষ্ট্র যেখানেই হোক না কেন? তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, নারী আর পুরুষের সম্পর্কটা হলো ক্ষমতার সম্পর্ক। সমাজ কিংবা রাজনীতি নিয়ে কাজ করার সুবিধা যারা ভোগ করেন তারা স্বীকার করুন আর নাই করুন সকল ধরনের ক্ষমতার সম্পর্কই আসলে রাজনৈতিক ইস্যু।

আমাদের পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রে রাজনীতির বাইরে কিছুই নাই। আমার জন্ম থেকে শুরু করে বেড়ে উঠা, জীবন-যাপন, জীবনাচরণ, সম্পর্ক আমাদের সংস্কৃতি প্রত্যেকটি বিষয়ই রাজনৈতিক। অনেকেই অস্বীকার করতে পারেন। তারা মনে প্রাণে ধারণও করেন যে, শুধুমাত্র রাষ্ট্রের ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহই হলো রাজনৈতিক বিষয়। বাকীগুলো অন্যান্য এবং সংশ্লিষ্ট। যেমন পরিবারে হলে পারিবারিক, সমাজে হলে সামাজিক ইত্যাদি।

সমাজ পরিবর্তনের মূল দায়িত্ব আসলে রাজনৈতিক দলের তথা রাজনীতিকের। কিন্তু তারা এই দায় স্বীকার করতে চায় না অথবা অন্যেরা এই দায় তাদের কাছে দিতেও চায় না। অথচ রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সামাজিক অঙ্গীকার দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের সমাজে নারী এবং শিশুরা পুরুষের উপর নির্ভরশীল। একজন মেয়েশিশুকে যতই শিক্ষা দেওয়া হোক যে বাল্যবিবাহ খারাপ, এটার অনেক ক্ষতিকারক দিক আছে, এটি আইনত নিষিদ্ধ তাতে আসলে খুব একটা কাজ হয় না। পরিবারের কর্তা যখন পিতা আর তিনি যখন তার কন্যার বিয়ে ঠিক করে ফেলেন তখন আর ঐ অঙ্গীকারাবদ্ধ মেয়েটার কিছুই করার থাকে না। সুতরাং সমস্যার তৈরি হয় যারা দ্বারা তার রাজনৈতিক চেতনার ঘাটতি রয়েছে তা সহজেই অনুমেয় আর তিনি রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধও নন।

ক্ষমতা থাকলেই একজন মানুষ সহিংস হয়ে উঠবেন এমন কোন কথা কোথাও লেখা নেই। হাতে ক্ষমতা পেয়েও নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গদের উপর প্রতিশোধ নেন নি। তিনি তাদেরকে বর্ণবাদী নিপীড়নের জন্য অনুতাপ করে ক্ষমা চাইবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এতে ম্যান্ডেলার ক্ষমতা এক ফোঁটাও খর্ব হয় নি। আর তাঁর সম্মানও ক্ষুণ্ন হয় নি। বরঞ্চ তিনি আরো সম্মানিত হয়েছেন মানুষের মাঝে। মানুষ যদি তার মানবীয় চেতনায় শাণিত হন, যদি রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হন তবে অবশ্যই নারীর প্রতি সহিংসতাসহ সকল ধরনের সহিংসতা দূর হবে। ক্ষমতাবান পুরুষের মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন। মানুষ মানে মমত্ববোধ, মানুষ মানে দায়িত্ববোধ এই মর্মে অঙ্গীকার জরুরী্। তবেই কমবে খুন, ধর্ষণ থেকে শুরু করে সকল ধরনের সহিংসতা।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা নভেম্বর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:৩৭
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একান্ত ভাবনা

লিখেছেন মেহেদি হাসান শান্ত, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪০

একবার রিয়েক্টর ফিজিক্স ক্লাসে আমাদের একজন শিক্ষক বলেছিলেন, "এই দেশে আসলে সবাই সবার সঙ্গে বাটপারি করে।" কথাটা শুনে প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু যতদিন গেছে, চারপাশটা যতটুকু দেখেছি, ততই মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুর্ভিক্ষের আওয়াজ কি আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে পাচ্ছি?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩

মুচলেকা দিয়ে, গোপন সমঝোতা করে মীর জাফর কিংবা মীর কাসিমের মতো “কথিত ক্ষমতার” সিংহাসনে বসা যায় ঠিকই কিন্তু বসে বসে জনগণের সর্বনাশ দেখা ছাড়া তাদের বিশেষ কিছু করার থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্ভাবনার বন্দি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৮



বান্দরবান জেলা কারাগারের চারপাশে পনেরো ফুট উঁচু পাথর ও কংক্রিটের নিরেট প্রাচীর। তারও ওপরে পেঁচানো ধারালো কাঁটাতারের জাল।

বর্ষার কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে ৩ নম্বর ব্লকের সংকীর্ণ সেলে শান্ত হয়ে বসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?
মাজার বিদ্বেষ, বাউলগান বিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আপত্তি- এরপর কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কলেমা লেখা পতাকা টানানো; আর এখন সিলেটের বিয়ানীবাজারে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে ঐতিহ্যবাহী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাবিতে "মব সায়েন্স" পড়তে হলে কী কী যোগ্যতা লাগে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১৮



- রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৌহিদী জনতার ব্যবহার করা জানতে হবে।

- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও মবকে থামাতে না পারলে সেটাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না বলে "জনতার শক্তি" বলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×