somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একান্ত ভাবনা

২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একবার রিয়েক্টর ফিজিক্স ক্লাসে আমাদের একজন শিক্ষক বলেছিলেন, "এই দেশে আসলে সবাই সবার সঙ্গে বাটপারি করে।" কথাটা শুনে প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু যতদিন গেছে, চারপাশটা যতটুকু দেখেছি, ততই মনে হয়েছে স্যার আসলে ভুল বলেননি। স্যার উদাহরণ হিসেবে ১৯৪৫ সালে জাপান-অধিকৃত মাঞ্চুরিয়ায় সোভিয়েত-মঙ্গোলিয়ান আক্রমণের সময়কার একটি ঘটনা বলছিলেন। সে সময় জাপান নিয়ন্ত্রিত বাহিনীর কিছু মঙ্গোলীয় সৈন্য ও কমান্ডার পক্ষ বদলে জাপানিদের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে কয়েকজন জাপানি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হ/ত্যা করে। যদিও এই ঘটনা স্যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে যে জাপানিজ উধ্বর্তন কর্মকর্তারা মঙ্গোলিয়ান সৈন্যদের সামনের যুদ্ধের নিয়ম মেনে সম্মান জানাতে বো (Bow) করলে মঙ্গোলিয়ানরা তাদের হ/ত্যা করেন। কিন্তু এতো কিছুর পরেও জাপানিজরা যুদ্ধে জয়ী হয় এবং নীতি নৈতিকতার দিক দিয়ে অনেক উন্নত।


পাঠকের বুঝার সুবিধার্থে আমি নিচে একটা সিচুয়েশন উল্লেখ করলাম।

A, B, C তিনজন ব্যক্তি, এখন এদের একটা ছোট্ট দৃশ্য কল্পনা করুন। A ঠকাল B-কে। C এসে ঠকাল A-কে। আবার B গিয়ে ঠকাল C-কে। তিনজনই একেক সময়ে সময়ে ভিকটিম, আবার একেক সময়ে অপরাধী। কিন্তু এরা প্রত্যেকেই নিজেকে শুধু ভিকটিম ভাবে। নিজেকে অপরাধী ভাবার ভাবনাটা এদের মধ্যে আসেনা।

আসলে এরা সমাজের আলাদা কোনো চরিত্র নয়, বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোতে এরা আমাদের সমাজেরই অংশ।

আমরা প্রতিদিন নীতি নৈতিকতার কথা বলি, কিন্তু সেই নৈতিকতাটা আমাদের কাছে পরিস্থিতিমতো বদলায়। নিজেদের লোক অন্যায় করলে আমরা এর পেছনে নানা কারন খুঁজে পাই, কিন্তু অন্য কেউ করলে সেটাকে আমরা সেই ব্যক্তির চরিত্রের সমস্যা বলে মন্তব্য করি। যে মানুষটা সারাজীবন অন্যের হক মেরে দিয়ে এসেছে, সেই মানুষটাও আরেকজনের অসততায় ক্ষুব্ধ হয়। অথচ এই ব্যক্তি নিজেই নিয়ম নীতি ভেঙে বড় হয়েছে, আজ সে অন্যকে নিয়ম শেখাচ্ছে।

কাউকে তার পাওনা না দেওয়া, বিশ্বাসের সুযোগে ঠকানো, দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মানুষের ক্ষতি করা এগুলা ছোটখাটো ব্যাপার নয়। এই আচরণগুলো শেষমেশ মানুষের মধ্যে যেটুকু বিশ্বাস থাকে সেটুকু শেষ করে দেয়। আর যে সমাজে মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারে না, সেখানে কোনো সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়াও সম্ভব না।

আমার কাছে সবচেয়ে ভয়াবহ অনুভূতি সম্ভবত এটাই। "আমি না করলে অন্য কেউ করবে", "সবাই যখন করছে আমি বাদ কেন" এই চিন্তাগুলো এখন আমাদের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এটা এখন আমাদের দৈনন্দিন সংস্কৃতিরই একটা অংশ বলে আমি মনে করি। তারপর দিনশেষে আমরাই অবাক হয়ে বলি, দেশটা এমন কেন?

আমরা যতোদিন না বুঝতে পারবো আমাদের দেশ এমনি এমনিই এরকম হয়ে যায়নি ততদিন আমাদের মুক্তি নেই। প্রতিদিনকার ছোট ছোট আপস, ছোট ছোট অন্যায়, ছোট ছোট সিদ্ধান্ত মিলেই এই সমাজ তৈরি হয়। আর দীর্ঘদিন এই সমাজে থাকলে একসময় নিজের সততাকেই অস্বাভাবিক মনে হতে শুরু করবে।

অভ্যুত্থানের পরে মনে হয়েছিল হয়তো কিছু একটা বদলাবে এই সমাজের। যেহেতু ফ্যাসিবাদের বিরূদ্ধে সকল স্তরের মানুষ হাতে হাত মিলিয়ে প্রতিবাদ করেছিলো, এতো এতো রক্তক্ষরণের ফলে নতুন বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের দেখা পাওয়ার আশায় ভেবেছিলাম অন্তত এখন নিজেদের দিকে তাকাবো আমরা। ভালোমন্দ বিচার করতে শিখব। কিন্তু জানা ছিলোনা মানুষ আসলে আশায় বাঁচে আর বেঁচে থাকলে হতাশ হয়। সমস্যা হলো আমরা নিজের নৈতিকতার সঙ্গে দরকষাকষি করতে করতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে এখন আর অনৈতিক কিছুকে আর মন্দ মনে হয় না।

একটা দেশ শুধু অর্থনীতি কিংবা অবকাঠামো দিয়েই উন্নত হয় না, এখানে মানুষের চরিত্র আর পারস্পরিক আস্থাও প্রয়োজন হয়। নীতি নৈতিকতা একটি দেশের মহামূল্যবান সম্পদ। আর আমাদের সবচেয়ে বড় সংকটও এখানে।
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩২


একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা
শুধু ২১ আগস্টের সেই ভয়াল গ্রেনেড হামলাই নয- বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে ১৯৮৮ সাল থেকে আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা - প্রমাণ

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:১২



ব্লগার সাহেব আমেরিকা থেকে লিখেছেন, “অমুক আসলে মুক্তিযোদ্ধা নন।”

আমি বন্ধুকে ফোন করলাম।
বললাম, “তুমি নাকি ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা?”

সে বলল, “বুঝতে পারছি না।”

“কেন?” আমি প্রশ্ন করলাম।

“১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন লা-মাযহাবিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কারণ কী ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৩২


আজকে নতুন চারটি মুখ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হলো। এর মধ্যে একজনকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে । বলছি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনের কথা। তিনি একজন লা মাযহাবি বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুর্ভিক্ষের আওয়াজ কি আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে পাচ্ছি?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩

মুচলেকা দিয়ে, গোপন সমঝোতা করে মীর জাফর কিংবা মীর কাসিমের মতো “কথিত ক্ষমতার” সিংহাসনে বসা যায় ঠিকই কিন্তু বসে বসে জনগণের সর্বনাশ দেখা ছাড়া তাদের বিশেষ কিছু করার থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×