somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন লা-মাযহাবিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কারণ কী ?

২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজকে নতুন চারটি মুখ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হলো। এর মধ্যে একজনকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে । বলছি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনের কথা। তিনি একজন লা মাযহাবি বা আহলে হাদিস ঘরানার আলেম বলে তার বিরোধীরা অভিযোগ করছেন। এই ঘরানার আলেমদের সঙ্গে দেওবন্দি ঘরানার আলেমদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় মতপার্থক্য রয়েছে। আমি লা মাযহাবি বলতে যেটা বুঝি, সেটা হলো নির্দিষ্ট কোনো মাযহাব অনুসরণ না করে সরাসরি কোরআন ও হাদিসের দলিলকে প্রাধান্য দেওয়া। পীর মাশায়েখ প্রথা, তাবলিগ জামাত এবং চার মাযহাব অনুসরণের ব্যাপারেও এই ধারার সঙ্গে দেওবন্দি হানাফি আলেমদের মৌলিক মতপার্থক্য রয়েছে।

লা মাযহাবি বা আহলে হাদিস আর দেওবন্দি ঘরানা এক জিনিস নয়। হেফাজতের বড় অংশ দেওবন্দি হানাফি ধারার সঙ্গে যুক্ত। তারা তাসাউফ বা আত্মশুদ্ধির চর্চাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে না। তবে মাজারকেন্দ্রিক এমন অনেক প্রথার সমালোচনা করে যেগুলোকে তারা বিদআত বা শরিয়তবিরোধী মনে করে। অন্যদিকে আহলে হাদিস ধারার সঙ্গে এসব বিষয়ে বিরোধ আরও তীব্র। মাজার, পীরের হাতে বায়াত, মিলাদ কিয়াম, ওরস কিংবা কিছু প্রচলিত ধর্মীয় প্রথাকে তারা অনেক বেশি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তাবলিগ জামাত নিয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে। এমনকি নামাজের কিছু ছোটখাটো বিষয় নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আছে।

বাংলাদেশের অনেক জায়গায় মসজিদ পর্যায়েও এর প্রভাব দেখা যায়। হাত কোথায় বাঁধা হবে, রফয়ে ইয়াদাইন করা হবে কি না, আমিন জোরে বলা হবে নাকি আস্তে বলা হবে, এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়েও দুই ধারার মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। কখনো কখনো সেই মতবিরোধ স্থানীয় পর্যায়ে বড় ধরনের সংঘাতেও রূপ নেয়। তবে এটাও মনে রাখা দরকার, দেওবন্দি, আহলে হাদিস কিংবা বেরেলভি সবাই নিজেদের সুন্নি ইসলামের অংশ হিসেবেই দেখে। তাই এটাকে মুসলমান বনাম অমুসলমানের বিরোধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটা মূলত সুন্নি ইসলামের ভেতরের ফিকহি, আকিদাগত এবং ধর্মচর্চার পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক।

বাংলাদেশে এই বিতর্কের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িয়ে আছে। সেটা হলো মাজার সংস্কৃতি। বেরেলভি বা সুফি ঘরানার মানুষের মধ্যে মাজার, খানকা, ওরস, মিলাদ এবং পীর মুরিদির একটি শক্তিশালী সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতি রয়েছে। অন্যদিকে দেওবন্দি আলেমরা মাজার সংস্কৃতির অনেক জনপ্রিয় প্রথার কঠোর সমালোচনা করেন। আর আহলে হাদিস ধারার অনেক আলেম এসব প্রথাকে আরও বেশি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। অনেকের মাঝে এটা নিয়েই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ও শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে বেরেলভি বা সুফি-মাজারপন্থী গোষ্ঠী। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সারাদেশে একশরও বেশি মাজার ভাঙচুর করা হয়েছে, এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। এখন যদি রাষ্ট্রে কওমি এবং সালাফি-উভয় কঠোরপন্থী ধারা সরকারের উপর প্রভাব রাখে , তবে বেরেলভি ধারার যে লোকজ সুফি সংস্কৃতি, তার ওপর চাপের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে । এর পাশাপাশি আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর সামনে সামনের দিনগুলোতে কী ধরণের ধর্মীয় চাপ নেমে আসে, তা নিয়েও গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

ধর্মমন্ত্রী হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে কুমিল্লার শাহ মোফাজ্জেল হোসাইন কায়কোবাদকে রেখেছে। তার ধর্ম মন্ত্রণালয়ে কাজ করার পুরনো অভিজ্ঞতাও রয়েছে। একই মন্ত্রণালয়ে আবার একজন প্রতিমন্ত্রী দেওয়ার প্রয়োজনটা কী? ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মতো একটি স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ে এমন দুইজন মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাদের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেম সমাজের ভিন্ন ভিন্ন অংশের ভিন্ন ধারণা রয়েছে। এখানে সরকারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার না।

সরকার কি ধর্মীয় সমাজের বিভিন্ন ধারার মধ্যে একটা ভারসাম্য তৈরি করতে চাইছে? নাকি দুই পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে রাজনৈতিকভাবে সবাইকে সন্তুষ্ট রাখতে চাইছে? নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো পরিকল্পনা আছে? এখন পর্যন্ত সেটা বোঝা যাচ্ছে না। বরং লিংকনের নিয়োগের পর যে ধরনের প্রতিবাদ শুরু হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে সরকার ধর্মীয় রাজনীতির একটি সংবেদনশীল জায়গায় হাত দিয়েছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি বাস্তবতা আছে। এখানে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে সবকিছু বোঝা যায় না। ধর্মীয় সমাজের সঙ্গে কাজ করার জন্য সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন মন্ত্রণালয়টি মসজিদ, মাদ্রাসা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন আলেম সমাজের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে। নতুন চারজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হওয়ার পর মন্ত্রিসভার আকার অর্ধশতক পার করেছে। সরকারকে তাই হাফ সেঞ্চুরির জন্য অভিনন্দন জানাতেই হয়।

দেশের অর্থনৈতিক সংকটের সময় যখন সরকার ব্যয় কমানোর কথা বলছে, তখন ৫৪ জনের মন্ত্রিসভা দেখে আমার মতো অনেকেরই একটু খটকা লাগবে। সরকার আসলে খরচ কমাতে চাইছে, নাকি আরও বেশি মানুষকে দায়িত্ব দিয়ে প্রশাসনিক খরচ বাড়াতে চাইছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। অবশ্য সরকার যদি প্রমাণ করতে পারে যে অতিরিক্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দেওয়ার ফলে প্রশাসনিক কাজে গতি এসেছে, তাহলে সমালোচনার কিছু থাকবে না। কাজের ফলাফলই শেষ কথা। কিন্তু যদি দেখা যায় মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীর সংখ্যা বাড়ল, অথচ সাধারণ মানুষের জীবনে তার কোনো প্রভাব পড়ল না, তাহলে এই নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এই জটিলতার পাশাপাশি প্রশাসনিক মূল চালিকাশক্তি ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্র করে পুরাতন খেলা চালু হয়ে গেছ। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব সুসংহত হচ্ছে । ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিশাল নেটওয়ার্ক, ফান্ড এবং জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মসজিদভিত্তিক পরিকাঠামো ব্যবহার করে দলটি নীরবে রাজনৈতিক ও আদর্শিক ঘাঁটি মজবুত করছে। চট্টগ্রামে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত কর্মসূচির বিরুদ্ধে বেরেলভি আলেমদের অতীতে প্রতিবাদ করতে দেখা গেলেও, গত ৫ই আগস্টের পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং সেখানেও একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয়েছে।

শামীম কায়সারকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করায় প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম-ইত্তেফাক ডিজিটাল ডেস্ক

ফটোকার্ড ক্রেডিট : মাইটিভি








সর্বশেষ এডিট : ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×