
১
আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে গেছে, বর্ষায় টিনের কোণা মরিচা ধরেছে, তবু কোনোদিন কেউ আপত্তি করেনি। এ গলির লোকজন সাইনবোর্ড পড়ে না। তারা কেবল জানে, টাইপের কাজ হয় এখানে।
আমি টাইপ করি। বায়োডাটা, স্কুলে ভর্তির দরখাস্ত, মিটার রিডিং নিয়ে অভিযোগপত্র, ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার নালিশ, নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি, মৃত্যুর পর ওয়ারিশান সনদের আবেদন। মাসে দুয়েকটা প্রেমপত্রও করতে হয়। প্রেমপত্র টাইপ করা অসভ্য একটা কাজ। হাতের লেখা ছাড়া প্রেমপত্রের কোনো ওজন নেই। কিন্তু কাস্টমার চাইলে করতে হয়। ইউনিকোড ফন্টে প্রেম দেখতে অনেকটা পরিবেশ অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তির মতো লাগে।
আর টাইপ করি তালাকনামা।
মোহাম্মদপুরে কাজি অফিসের অভাব নেই। তাদের নিজস্ব মুহুরি আছে, নিজস্ব দালাল আছে, স্ট্যাম্প ভেন্ডর আছে। তবু লোকজন আমার এখানেই আসে। কারণ আমি সস্তায় কাজ করি, আর মুখ বন্ধ রাখি। খসড়া টাইপের জন্য নিই একশ বিশ টাকা। প্রিন্ট আলাদা। তিন কপি লাগে; স্বামীর কপি, স্ত্রীর কপি, কাজির কপি। যারা জানে না তারা এক কপি বানিয়ে চলে যায়, তারপর আবার আসে। আসার সময় মুখে একটা অপ্রস্তুত হাসি থাকে, যেন খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে এসে মনে পড়েছে শেষ পৃষ্ঠা লেখা হয়নি।
চৌদ্দ বছরে ঠিক কতগুলো তালাকনামা টাইপ করেছি, তার হিসাব রেখেছি। ড্রয়ারে আছে সেই খাতা, উইপোকা কিছুটা কেটেছে। তিনশ একষট্টি।
এ গলির লোকসংখ্যা সাতশর মতো। এবং তিনশ একষট্টি তালাকের একটাও কার্যকর হয়নি।
২
এই গলির সরকারি নাম নেই। সিটি কর্পোরেশনের নকশায় হুমায়ূন রোডের শাখা হিসেবে দাগানো, নম্বরবিহীন। ডাকপিয়ন চিঠি আনে "হুমায়ূন রোড, পেছন দিক" লেখা খামে। কিন্তু আমরা বলি জোড়াগলি।
নাম নিয়ে বয়স্করা বলেন, সাতচল্লিশের পর প্রথম যে দুটো বাড়ি এখানে ওঠে, তাদের দেয়াল ছিলো সাঁটা; একটা দেয়াল দুই বাড়ির। তাই জোড়া। কমবয়সীরা অন্য কথা বলে, এবং বলার সময় হাসে। আমি দুটোর কোনোটাই বিশ্বাস করি না, কারণ এখানে কোনো ব্যাখ্যাই শেষ পর্যন্ত টেকে না। ব্যাখ্যাগুলো গলির ভেতরে ঢুকে কিছুদিন ঘোরাঘুরি করে, তারপর আরেকটা ব্যাখ্যার সঙ্গে ঘর বাঁধে।
গলির দৈর্ঘ্য একশ চল্লিশ কদম। আমি গুনেছি, একাধিকবার, নানান ঘোরে। গলির মুখে দুই পাশে দুটো দোকান; নবী মিয়ার চা ও পান, আর মোজাফফরের ইস্ত্রি। ভেতরে তেইশটা বাড়ি, তার মধ্যে নয়টা এখনো টিনের। সতেরো নম্বরের দোতলায় সন্ধ্যার পর বাতি জ্বলে না, যদিও ওখানে লোক থাকে। শেষ মাথায় একটা পোড়া কড়ইগাছ, তার নিচে সিটি কর্পোরেশনের ময়লার ভ্যান রাত কাটায়। এই কড়ই গাছ কবে পুড়েছিলো কেউ বলতে পারে না। কিন্তু প্রতি বসন্তে ওর গা থেকে চার-পাঁচটা পাতা বেরোয়। পাঁচটার বেশি না। কেউ গোনে না, আমি গুনি।
জোড়াগলিতে যারা একবার কাউকে ভালোবাসে, তারা আর তাকে ছাড়তে পারে না। শুনতে যতটা রোমান্টিক, ব্যাপারটা তার চেয়ে অনেক বেশি ক্লান্তিকর।
জামিল আর রেখার তালাক হয়েছিলো উনিশশ আটানব্বইয়ে, আমার আসার অনেক আগে। তালাকের কারণ ছিলো জামিলের অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সেটা নিয়ে গলির মুখে তাদের সেই দিনদুপুরের চিল্লাপাল্লা। রেখার বিয়ে হয় সিলেটের এক ঠিকাদারের সঙ্গে। বছর ঘুরতে না ঘুরতে রেখা ফিরে আসে। ঠিকাদারের কথা রেখা কোনোদিন বলেনি, বললেও এমনভাবে বলেছে যেন গল্পটা অন্য কারো। এখন তাদের তিনটা ছেলেমেয়ে, বড়টা পলিটেকনিকে পড়ে।
শিপন আর মিতালি গিয়েছিলো কুয়ালালামপুর। শিপনের ভাই ওখানে গার্মেন্টসের সাপ্লাই দেয়। যাওয়ার আগে বাড়ি বিক্রি করে গেছে, আসবাব বিক্রি করে গেছে, এমনকি মিতালির সেলাই মেশিন পর্যন্ত। ফিরে আসে সাত মাস পর, একই বাড়ির নিচতলায় ভাড়াটে হয়ে। যে লোকের কাছে বাড়ি বেচেছিলো, সেই লোকও তিন বছর পরে বাড়ি বেচে চলে যায়। জোড়াগলির বাড়ির দাম কখনো বাড়ে না, কমেও না। রিয়েল এস্টেটের লোকজন এতে খুবই বিরক্ত।
বাদল আর ফরিদার তালাক আমি নিজে টাইপ করেছি, দুই হাজার এগারোর ফেব্রুয়ারিতে। কাগজে সই করার সময় ফরিদার হাত কাঁপেনি একটুও। বাদল সই করেছে দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে, কলম ধার নিয়ে। ওরা দুজনেই আমাকে বলে গিয়েছিলো, এই কাগজ যেন আমি ফেলে না দিই, দরকার হতে পারে। এখনো ফেলিনি। তারা এখনো একসঙ্গে থাকে। ঈদের আগে ফরিদা আমার এখানে ছেলের ভর্তির ফরম পূরণ করাতে আসে, বাবার নামের ঘরে বাদলের নাম লিখতে বলে, এবং ঐ কাগজের কথা কেউ কোনোদিন তোলে না।
আখতার আর শবনম জেনেভা ক্যাম্প থেকে এসেছিলো। আখতার তিনবার তালাক দিয়েছে, দুইবার মুখে, একবার কাগজে। তিনবারই শবনম ফিরে এসেছে, এবং তিনবারই আখতার দরজা খুলে দিয়েছে এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে যেন সে বাজার থেকে ফিরেছে।
এমন আরো আছে। আমার পেশাগত অভ্যাসেই এতোগুলো নাম মনে থাকে। এই তালিকা এতো লম্বা যে তালিকার শেষে কোনো যোগফল নেই।
৩
ব্যাখ্যা দিতে বহু লোক এসেছে। গলির লোকজন প্রত্যেকবার মন দিয়ে শুনেছে।
কবরের ব্যাখ্যা সবচেয়ে পুরোনো। কথিত আছে, গলির নিচে পুরোনো এক গোরস্তান ছিলো; সাতচল্লিশের আগে, হয়তো তারও আগে। সেখানে নাকি নিয়ম না মেনেই কোনো এক জোড়া মানুষকে একসঙ্গে দাফন করা হয়েছিলো। এখন সেই নিয়মভঙ্গের জের সবাই টানছে। এই গল্প যিনি সবচেয়ে ভালো বলেন তিনি আফসার মুহুরি, আদালতপাড়ায় ত্রিশ বছর কাজ করে অবসরে এসেছেন। গল্প বলার সময় তিনি মাটির দিকে তাকান, যেন নিচের মাটি তাকে শুনছে। শেষে বলেন, বিশ্বাস করার দরকার নেই, বিশ্বাস না করারও দরকার নেই।
ভূতত্ত্বের ব্যাখ্যা আসে এরপরেই। দুই হাজার পনেরো সালে একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্র এসেছিলো, মাটির নমুনা নিয়েছিলো তিন জায়গা থেকে, আর নবী মিয়ার দোকানে সাতাশ কাপ চা খেয়েছিলো। তারা বলেছিলো, এই এলাকার মাটিতে লোহার পরিমাণ বেশি; সম্ভবত পুরোনো কোনো ঢালাই কারখানার বর্জ্য। মানুষের মস্তিষ্কে চুম্বকক্ষেত্রের প্রভাব নিয়ে তারা কিছু বলেছিলো, ইংরেজিতে, খুব দ্রুত। তারপর তারা চলে যায় এবং আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। বিষয়টা লক্ষ করার মতো। যারা এখানে থাকে না, তারা সহজেই যেতে পারে।
ধর্মের দিক থেকেও ব্যাখ্যা এসেছিলো। শিয়া মসজিদের দিক থেকে একবার এক তরুণ হুজুর এসেছিলেন, খুব ভদ্র, চশমাপরা। তিনি বলেছিলেন, এখানে সমস্যা মাটির নয়, নিয়তের। মানুষ মুখে তালাক বলে কিন্তু অন্তরে বলে না, তাই আল্লাহ তালাক কবুল করেন না। হুজুরের কথা শুনে গলির লোকজন সন্তুষ্ট হয়েছিলো। কিন্তু বাদল প্রশ্ন করেছিলো, আচ্ছা হুজুর, অন্তরে না বললে তাহলে আমি কাগজে সই করলাম কেন? হুজুর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিলেন, মানুষ নিজের অন্তরের খবর জানে না। এই উত্তর এতই ভালো ছিলো যে আমরা সবাই কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গিয়েছিলাম, তারপর যে যার ঘরে ফিরে গিয়েছিলাম।
একবার একজন সাংবাদিক এসেছিলো। মেয়েটার বয়স বড়জোর ছাব্বিশ, কাঁধে ক্যামেরা, হাতে ফোন। সে তিনদিন এসে ছয়জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলো, আমার দোকানের ছবিও তুলেছিলো। তবে সেই রিপোর্ট কোনোদিন ছাপা হয়নি। মেয়েটাকে পরে একবার শ্যামলীর দিকে দেখেওছি বলে মনে হলো, তবে নিশ্চিত না। কিন্তু গলির মধ্যে গুজব চালু হয়ে গেছে যে সে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। আমার ধারণা সে ভয় পায়নি। সম্ভবত তার সম্পাদক বলেছেন, এটা কোনো খবর না, এটা একটা এলাকা যেখানে লোকজন ঝগড়া করে আবার মিলে যায়, এবং তাতে সংবাদমূল্য নেই।
রিপোর্ট বেরোয়নি, তবু নবী মিয়া তিন বছর ধরে দোকানে পত্রিকা রেখেছে। প্রতিদিনের। সন্ধ্যার দিকে চশমা পরে পাতা উল্টাতো, ভেতরের পাতাগুলো, যেখানে ছোট ছোট খবর ছাপা হয়। কী খুঁজছেন জিজ্ঞেস করলে বলতো, কিছু না। তারপর একদিন পত্রিকা রাখা বন্ধ করে দিলো। কেন বন্ধ করলো, সেটা আমি জিজ্ঞেস করিনি।
৪
আমি এখানকার লোক নই।
আমার বাড়ি ছিলো মানিকগঞ্জের দিকে, ঘিওরের কাছাকাছি। সাতাশ বছর বয়সে ঢাকায় আসি, প্রথমে গাবতলীতে এক কম্পিউটার দোকানে ছয় মাস কাজ শিখি, তারপর এখানে চলে আসি একটা সাবলেটে। উদ্দেশ্য ছিলো দুই বছর থাকবো, টাকা জমাবো, তারপর নিজের একটা দোকান দেবো আসাদ গেটের কাছাকাছি কোথাও, যেখানে ভাড়া বেশি কিন্তু কাস্টমারও বেশি। সেও ষোলো বছর আগের স্বপ্ন।
রাহেলার সঙ্গে বিয়ে হয় দুই বছরের মাথায়। ওর বাবা এই গলিতে চার নম্বর বাড়ির মালিক ছিলেন। ভদ্রলোক আমাকে পছন্দ করতেন, কারণ আমি বেশি কথা বলি না এবং টাকার হিসাব খাতায় লিখি। উনি মারা যান বিয়ের চার মাস পর, বাথরুমে পড়ে গিয়ে। মৃত্যুর সনদের আবেদন আমি নিজেই টাইপ করেছিলাম। জামাই হয়ে শ্বশুরের মৃত্যুসংক্রান্ত কাগজ টাইপ করা কেমন লাগে, এ নিয়ে কেউ কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি, তাই কোনোদিন বলাও হয়নি।
রাহেলা লম্বা না, রোগাও না। ওর গলার স্বর একটু ভাঙা, যেন সবসময় একটু ঠান্ডা লেগে আছে। প্রথম দিকে আমার খুব ভালো লাগতো। ঘুমের মধ্যে ও নিঃশ্বাসের সঙ্গে একটা শব্দ করে, খুব হালকা, প্রায় শোনাই যায় না। আমি চৌদ্দ বছর ধরে ওই শব্দ শুনে ঘুমাই।
আমাদের সংসারে বাড়তি কিছু নেই। বাড়তি ভালোবাসা নেই, বাড়তি ঝগড়াও নেই। যা আছে তা হলো ধারাবাহিকতা। সকালে ও চুলায় পানি বসায়, আমি দোকান খুলি। দুপুরে ও ভাত পাঠায়, টিফিন ক্যারিয়ারের গায়ে একটা ফাটল আছে যেটা দিয়ে ডাল চুইয়ে পড়ে; পাঁচ বছর ধরে বলছি বদলাবো, বদলাইনি। রাতে টিভিতে খবর চলে, আমরা দুজন খবরের দিকে তাকিয়ে থাকি এবং কেউ খবর শুনি না।
সন্তান হয়নি। ডাক্তার দেখানো হয়েছিলো দুইবার, দুইবারই বলেছে সমস্যা নেই। এই "সমস্যা নেই" সমস্যা আমাদের দুজনের মাঝখানে বারো বছর ধরে বসে আছে, একটা তৃতীয় লোকের মতো, যার খাবার লাগে না কিন্তু জায়গা লাগে।
প্রথমবার ও চলে যায় দুই হাজার তেরো সালের শীতে। কেন যে চলে গিয়েছিল, ঠিক মনে নেই। মনে আছে সেদিন কারেন্ট ছিলো না, এবং আমি মোমবাতির আলোয় একটা জমির দলিল টাইপ করছিলাম এবং ও পেছন থেকে কী যেন বলেছিলো যেটা আমি শুনিনি। শোনার ভান নয়, সত্যিই শুনিনি। এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় অপরাধ যা একজন মানুষ আরেকজনকে করতে পারে; শোনা না।
ও ব্যাগ গুছিয়েছিলো রাত এগারোটায়। আমি বাধা দিইনি। এটাও আমার একটা অভ্যাস, বাধা না দেওয়া। রাহেলা বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে একবার ঘুরে তাকিয়েছিলো। সেই তাকানো আমার মনে আছে, প্রিন্টের মতো স্পষ্ট। ওখানে রাগ ছিলো না, ছিলো কৌতূহল। যেন ও দেখতে চাইছিলো, ওকে ছাড়া এই ঘর দেখতে কেমন লাগে।
তারপর ও গেট খুলে গলিতে নেমে একশ চল্লিশ কদম হেঁটে বাঁয়ে মোড় নিয়ে হারিয়ে গেলো।
আমি ঘড়ি দেখেছিলাম। রাত এগারোটা সাতচল্লিশ।
৫
ও ফিরে আসে পরদিন বিকেলে।
তখন ভেবেছিলাম, যাক, রাগ পড়ে গেছে। মানুষের রাগ এক রাতের বেশি টেকে না, বিশেষ করে শীতকালে; শীতকালে রাগ ধরে রাখতে যে পরিমাণ উষ্ণতা লাগে তা মানুষের থাকে না।
ও ঘরে ঢুকে ব্যাগ রাখলো, হাত-মুখ ধুলো, তারপর চুলায় পানি বসালো। কোনো কথা হলো না। আমার মনে হলো, এইতো স্বাভাবিক।
কিন্তু ওই রাতে ভাত খেতে বসে ও কাঁচা মরিচ চাইলো।
রাহেলা ঝাল খায় না। কোনোদিন খায়নি। বিয়ের প্রথম বছরে ওর জন্য আলাদা তরকারি রান্না হতো, কারণ শাশুড়ি ঝাল দিতেন বেশি। এই তথ্য আমাদের সংসারের সবচেয়ে পুরোনো তথ্যগুলোর একটা।
আমি মরিচ এগিয়ে দিয়েছিলাম, কিছু বলিনি। ও দুটো মরিচ কামড়ে ভাত খেয়েছিলো, কোনো অসুবিধা হয়নি, চোখে পানি আসেনি।
পরের কয়েক মাসে আরো কিছু জিনিস চোখে পড়ে।
ওর ডান হাতের কনুইয়ের নিচে একটা লম্বা দাগ, চার আঙুলের মতো, শুকিয়ে সাদা হয়ে যাওয়া। আগেতো ছিলো না। জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিলো, ছোটবেলার। বলার সময় ওর গলা ভাঙা ছিলো না বরং এতো স্পষ্ট ছিলো যে আমি রীতিমতো একটা ধাক্কা খেলাম।
আলমারির নিচের তাকে একটা বাসের টিকিট পেয়েছিলাম। শ্যামলী পরিবহন, ঢাকা থেকে সিলেট, তারিখ পড়া যাচ্ছিলো না। রাহেলা কোনোদিন সিলেট যায়নি।
দ্বিতীয়বার ও যায় দুই হাজার ষোলোতে, তৃতীয়বার উনিশে। দ্বিতীয়বার ফেরে চার দিনে, তৃতীয়বার একই দিন রাতে। প্রতিবারই ফিরে এসে ও চুলায় পানি বসিয়েছে। প্রতিবারই ফেরার পর নতুন কিছু যোগ হয়েছে, আর পুরোনো কিছু বাদ পড়েছে।
দ্বিতীয়বার ফেরার দিন ও দোকানে এসে জিজ্ঞেস করেছিলো, শাটার আধা নামানো কেন। বলেছিলাম, চার দিন বন্ধ ছিলো। ও হেসেছিলো, যেন আমি রসিকতা করছি। মুখে হাসি লেগে ছিলো আরো কয়েক সেকেন্ড। চোখ থেকে সরে গিয়েছিলো তার আগেই।
তৃতীয়বারের পর ও আর ওর মায়ের নাম মনে করতে পারে না। মানে, নাম বলতে পারে, কিন্তু বলার সময় একটু থামে; যেভাবে মানুষ পরীক্ষার হলে সহজ প্রশ্নের উত্তর লেখার আগে থামে।
আমি তখন খাতায় হিসাব শুরু করি। তালাকনামার নয়, অন্য খাতা। ওখানে আমি লিখে রাখি কে কতবার গেছে, কতদিন পরে ফিরেছে, আর ফেরার পর কী বদলেছে।
শিপন ফিরে এসে মালয় ভাষার তিনটা শব্দ বলতে পারতো, ছয় মাস পর আর পারতো না, কিন্তু সাতাশ কেজি ওজন কমে গিয়েছিলো এবং সেটা আর কোনোদিন ফিরে আসেনি।
আখতার তৃতীয়বার শবনমকে দরজা খুলে দিয়ে বলেছিলো, ভেতরে আসো। শবনম ভেতরে ঢুকেছিলো, এবং জুতা খোলার সময় ঘরের দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিলো যেন এই ঘর সে আগে দেখেনি।
খাতার পাতা ভরে উঠছিলো। আমি ভেবেছিলাম শেষে একটা মিল বেরিয়ে আসবে। বেরোয়নি। আনোয়ারার জন্য।
আনোয়ারা থাকে সতেরো নম্বর বাড়ির দোতলায়, একা। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, ভারী শরীর, হাঁটার সময় ডান দিকে একটু কাত হয়ে যায়। গলির লোকজন তাকে এড়িয়ে চলে। কেন এড়ায় জিজ্ঞেস করলে কেউ পরিষ্কার করে বলতে পারে না। শুধু বলে, মহিলা একটু অন্যরকম।
সে গলি ছেড়ে গিয়েছিলো দুই হাজার সালে, স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায়। ফিরেছে চোদ্দ বছর পর। এখানকার হিসাবে চোদ্দ, তার নিজের হিসাবেও চোদ্দ। দুটো হিসাব মিলে যায়।
আর সে সব মনে রাখে।
খুলনার ব্যাংকপাড়ায় যে বাসায় ছিলো তার নম্বর মনে রাখে। দ্বিতীয় স্বামীর নাম মনে রাখে, লোকটার শ্বাসকষ্টের অসুধের নাম মনে রাখে। ওখানে জন্ম দেওয়া দুই ছেলের নাম মনে রাখে, বড়টার সামনের দাঁত ভাঙার তারিখ মনে রাখে, ছোটটার মাথার পেছনে চুলের যে ঘূর্ণিটা ছিলো সেটাও মনে রাখে। কেউ শুনতে চাইলে বলে। না চাইলেও বলে। এই জন্যই লোকজন তার সামনে দাঁড়ায় না। ছেলেরা এখনো খুলনায়। তারা আসে না। আনোয়ারাও যায় না।
একটা জিনিসই সে মনে করতে পারে না। কেন ফিরে এসেছিলো। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও বলেছিলো, বাজারে গেছিলাম। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলো। কারণ খুলনা থেকে মোহাম্মদপুরের বাজার অনেক দূর।
এই নাম আমার পুরো খাতা অকেজো করে রেখেছে। নিয়ম থাকলে আনোয়ারা থাকতো না। আর নিয়ম না থাকলে বাকি নামগুলো অচেনা।
খাতাটা তিন মাস বন্ধ রেখেছিলাম। তারপর আবার খুলেছি, কারণ হিসাব রাখা আমার পেশা এবং পেশা ছাড়া দিন যায় না। এখন আর মিল খুঁজি না। শুধু লিখে রাখি।
মানুষ এটাকে ভালোবাসা বলে। বাইরে থেকে দেখতে ঠিক ভালোবাসার মতোই দেখায়। যে ফিরে আসে সে ক্ষমা চায় না, আর যে দরজা খোলে সে কৈফিয়ত চায় না। কারো কাছে কারো কোনো নালিশ থাকে না।
আনোয়ারার নালিশ আছে। আনোয়ারা একা থাকে।
খাতায় আমি নিজের নাম লিখিনি। এটা ইচ্ছাকৃত ছিলো, আবার ছিলোও না। হিসাবরক্ষক নিজেকে হিসাবের বাইরে রাখে, এটা পেশার নিয়ম। কিন্তু মাঝে মাঝে রাতে মনে হয়, আমি কি সত্যিই এই ষোলো বছর একটানা এখানে ছিলাম?
প্রমাণ আছে। দোকানের ট্রেড লাইসেন্স আছে, বিদ্যুতের বিল আছে, ব্যাংকের বই আছে। কিন্তু কাগজ কেবল সেটুকুই প্রমাণ করে যা কাগজে লেখা। উনিশশ চুরানব্বই সালে আমাদের গ্রামে এক লোক ছিলো, নাম তালেব, যার তিনটা জাতীয় পরিচয়পত্র ছিলো তিনটা আলাদা নামে, এবং তিনটাই আসল। কাগজ কোনোদিন কাউকে বাঁচায়নি।
আমার একটা জিনিস মেলে না। আমি সিগারেট খেতাম, দিনে বারো-চোদ্দটা। ছেড়ে দিয়েছি এগারো বছর আগে, রাহেলার চাপে। এটা আমার মনে আছে, দিনক্ষণসহ মনে আছে। অথচ ছাড়ার পরের দুই বছরের কথা মনে করতে গেলে ভেতরটা কেমন যেন মসৃণ লাগে, কোনো খাঁজ নেই, কিছু আটকায় না। দুই বছর অনেক সময়। এই সময়ে মানুষ একটা ভাষা শিখে ফেলতে পারে।
৬
সিদ্ধান্ত নিতে আমার এগারো মাস লেগেছে।
আমি ঝোঁকের মাথায় কিছু করি না, এটা আমার দোষ বলা যায়, গুণও বলা যায়। যেদিন প্রথম মনে হলো আমাকে যেতে হবে, সেদিনই ভেবেছিলাম কীভাবে যাবো। তারপর প্রতিদিন একটু একটু করে গোছালাম।
প্রথমে টাকা। দোকানের ক্যাশ থেকে প্রতি মাসে দুই হাজার করে সরিয়েছি, এমনভাবে যাতে খাতায় না মেলে না। এগারো মাসে বাইশ হাজার। পুরোনো একটা ল্যাপটপ বিক্রি করেছি এগারো হাজারে। মোট তেত্রিশ।
তারপর কাগজ। এটা জরুরি ছিলো। আমি নিজের হাতে নিজের তালাকনামা টাইপ করেছি। কাজটা করতে আমার তিন সন্ধ্যা লেগেছে; টাইপ করতে না, ভাষা ঠিক করতে। তিনশ একষট্টিটা তালাকনামা টাইপ করার পর নিজের ভাষা নিয়ে দ্বিধায় পড়া হাস্যকর, কিন্তু পড়েছি। শেষে যে খসড়া দাঁড়ালো সেটা একদম সাধারণ, যেন কোনো ভাড়াটে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ। আমার নাম, ওর নাম, বাবার নাম, ঠিকানা, তারিখের জায়গা ফাঁকা।
আমি প্রিন্ট করিনি। ডেস্কটপে ফাইল রেখে দিয়েছি, নাম দিয়েছি "ফরম-১৭"। আমার ডেস্কটপে সাতচল্লিশটা ফাইলের নাম "ফরম" দিয়ে শুরু। কেউ খুঁজে পাবে না।
কেন প্রিন্ট করিনি, সেটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। আমি আসলে ওকে ছাড়তেই চাইনি। আমি চেয়েছিলাম জানতে, ওকে না ছাড়া আমার সিদ্ধান্ত, নাকি এই গলির।
তারপর দিন ঠিক করলাম। বৃহস্পতিবার। বৃহস্পতিবার এই গলি ফাঁকা থাকে, লোকজন কৃষি মার্কেটে যায়।
শেষ রাত স্বাভাবিক কেটেছে। রাহেলা ভাত বেড়েছে, আমি খেয়েছি, টিভিতে খবর চলেছে যেটা আমরা দুজন দেখিনি। ঘুমানোর আগে ও বলেছিলো, টিফিন ক্যারিয়ারটা এবার বদলাও, ডাল পড়ে যায়। আমি বলেছিলাম, আচ্ছা।
ওর নিঃশ্বাসের সেই হালকা শব্দ শুরু হওয়ার পর আমি উঠেছি। ব্যাগ আগেই গোছানো ছিলো, দোকানের পেছনের তাকে। তিনটা জামা, একটা লুঙ্গি, চার্জার, টাকা, আর আমার হিসাবের খাতা।
গলিতে নেমে আমি কদম গুনতে শুরু করেছি। স্রেফ অভ্যাসবশেই। একশ চল্লিশ কদমে গলির মুখ। আমি গুনেছি একশ একচল্লিশ। একটা বেশি।
গলির মুখে দাঁড়িয়ে আমি একবারও পেছনে তাকাইনি। এ নিয়ে আমার কোনো গর্ব নেই। তাকালে কী হতো কে জানে, আর এখন জানার কোনো উপায়ও নেই। বইপত্রে লেখে, পেছনে তাকালে নাকি সব শেষ হয়ে যায়। বাস্তবে সম্ভবত কিছুই হয় না। আর সেটাই সবচেয়ে বেশি ভয়ের।
৭
গাবতলী পর্যন্ত হেঁটেছি।
রাত তিনটার দিকে টার্মিনালের অবস্থা একটা যুদ্ধশেষ ময়দানের মতো। কাউন্টারের সামনে চেয়ারে মানুষ ঘুমায়, মাথা পেছনে ফেলে, মুখ হাঁ করে। কুকুরগুলো তখন দিনের তুলনায় আত্মবিশ্বাসী থাকে। বাসগুলো ইঞ্জিন চালু রেখে দাঁড়িয়ে থাকে, কেন জানি না; সম্ভবত ইঞ্জিন বন্ধ করলে আর চালু হবে না বলে।
আমি আরিচার একটা লোকাল বাসে উঠলাম। ভাড়া একশ ষাট। জানালার পাশে সিট পেলাম, কাচটা ভাঙা এবং তার ওপর স্কচটেপ মারা।
বাস ছাড়লো তিনটা পঞ্চাশে।
আমি জানালা দিয়ে ঢাকা শহরকে শেষ হতে দেখলাম। যত নাটকীয় হওয়ার কথা ছিলো, তত হয়নি। শহর শেষ হয় খুব অগোছালোভাবে; প্রথমে দোকান কমে, তারপর বিল্ডিং কমে, তারপর সাইনবোর্ড কমে, তারপর হঠাৎ দুই পাশে অন্ধকার এবং সেই অন্ধকারের ভেতরে টিমটিমে আলো, এবং তখন বুঝতে পারো তুমি বেরিয়ে এসেছো। কোনো সীমানা নেই। কেউ ঘোষণা দেয় না।
আমি অপেক্ষা করছিলাম।
কিছু একটা ঘটবে বলে অপেক্ষা করছিলাম। বাসের চাকা পাংচার হবে, ড্রাইভার হঠাৎ ঘুরিয়ে ফেলবে, আমার বুকে ব্যথা উঠবে, কিছু একটা। এমনকি একটু মন খারাপও ঠিক ছিলো।
কিছুই ঘটলো না।
সাভার পার হলাম। নবীনগর পার হলাম। ভোরের দিকে আকাশ ফরসা হলো, ধানখেতের ওপর কুয়াশা বসে ছিলো, এক লোক সাইকেলের পেছনে দুধের ক্যান নিয়ে যাচ্ছিলো। সব স্বাভাবিক। আমি ষোলো বছর পর এই দৃশ্য দেখছি এবং দৃশ্যটা আমাকে চিনতেই পারলো না।
পেছনের সিটে দুটো লোক সারা রাস্তা বসের গালি দিয়ে গেলো। সামনের সিটে এক মহিলা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ঘুমাচ্ছিলো, বাচ্চাটা জেগে ছিলো এবং জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলো এবং একবারও কাঁদেনি। বাচ্চারা যখন কাঁদে না তখন তাদের দেখতে বুড়ো মানুষের মতো লাগে।
মাঝখানে একবার মনে হলো, আমি কি কিছু ফেলে এসেছি? পকেটে হাত দিলাম। মানিব্যাগ আছে, ফোন আছে, চাবি আছে। দোকানের চাবি তখনো আমার পকেটে, এটা লক্ষ করে হাসি পেলো। যে মানুষ পালাচ্ছে সে দোকানের চাবি সঙ্গে নেয় না। কিন্তু আমি চাবি ফেলে দিইনি। জানালার কাচ ভাঙা ছিলো, ফেলে দেওয়া সহজ ছিলো।
আরিচা ঘাটে নামলাম সকাল সাতটার দিকে।
ঘাটে চায়ের দোকান অনেক। আমি যে দোকানে বসলাম সেটার কোনো নাম নেই, শুধু একটা বেঞ্চ আর একটা চুলা। দোকানদার বয়স্ক লোক, গায়ে সোয়েটার, মাথায় মাফলার। চা বানানোর সময় সে কাপটা অনেক উঁচু থেকে ঢালে, যেটা দেখতে ভালো লাগে কিন্তু চা ঠান্ডা হয়ে যায়।
চায়ে চুমুক দেওয়ার পর লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আপনে কি মোহাম্মদপুরের?
আমি চমকাইনি। জিজ্ঞেস করলাম, বুঝলেন কীভাবে।
লোকটা কিছু বললো না। আরেকটা কাপে চা ঢাললো, উঁচু থেকে।
তারপর বললো, হুমায়ূন রোডের পেছনের গলি। আমার নাম কালাম। আমি এগারো বছর ধইরা এইখানে আছি।
আমি কিছু বললাম না। মানুষ যখন সত্যি কথা বলে তখন তাকে থামানো উচিত না।
কালাম বললো, প্রত্যেক বেস্পতিবার যাই। সকালে যাই, বিকালে ফিরা আসি। এগারো বছর ধইরা যাইতেছি।
জিজ্ঞেস করলাম, কে আছে ওখানে।
লোকটা তখন চুলার দিকে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, সেইটাই তো ভাই। কে আছে জানি না। কিন্তু বেস্পতিবার হইলে যাইতে হয়। গিয়া গলির মুখে খাড়ায়া থাকি। তারপর ফিরা আসি। আইসা মনে করবার চেষ্টা করি ক্যান গেছিলাম। মনে পড়ে না।
সে হাসলো। দাঁতে পানের ছোপ।
তারপর বললো, ভিতরে যাই না। গলির মুখে খাড়ায়া থাকি, তারপর ফিরা আসি।
জিজ্ঞেস করলাম, ভেতরে গেলে কী হয়।
কালাম কাপ ধুতে ধুতে বললো, জানি না। এগারো বছরে একবারও জানবার ইচ্ছা হয় নাই। এইটা নিয়া আমি মাঝে মাঝে ভাবি, ভাই। ইচ্ছা না হওয়াই আসল কথা।
আমি চা শেষ করে দাম দিলাম। দশ টাকা।
উঠে দাঁড়ানোর সময় কালাম বললো, আপনে যাইতাছেন কই।
আমি বললাম, জানি না।
সে মাথা নাড়লো, যেন এটাই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য উত্তর।
৮
আমি জানি না কতক্ষণ ঘাটে বসে ছিলাম।
ফেরি এলো, গেলো। ট্রাক উঠলো, নামলো। একটা ছেলে সিদ্ধ ডিম বিক্রি করছিলো, দুইবার আমার সামনে দিয়ে গেলো, দ্বিতীয়বার আমাকে চিনতে পারলো না। নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে পানি আসে, এটা বাতাসের কারণে; নদীর ধারে বাতাস চোখের ভেতর ঢুকে যায়।
তারপর আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং ঢাকার বাসে উঠলাম।
কারণটা খুব সাধারণ, এবং সাধারণ কারণগুলো লিখতে লজ্জা লাগে। আমার যাওয়ার জায়গা ছিলো না।
মানিকগঞ্জে বাড়ি নেই, বিক্রি হয়ে গেছে। ভাই দুবাইতে, বোন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আমার হাতে তেত্রিশ হাজার টাকা এবং একটা ব্যাগ। এই বয়সে নতুন করে কোথাও গিয়ে দাঁড়ানো যায় না, এটা কেউ বলে দেয় না, নিজে টের পেতে হয়।
তবু আমি নিশ্চিত না। ঠিক এই কারণেই আমি ফিরেছি, নাকি কারণটা আমার মাথায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং তার আসল জায়গায় অন্য কিছু ছিলো যা আমার আর মনে নেই। এই সন্দেহই খারাপ। প্রমাণ করা যায় না, খণ্ডনও করা যায় না। সন্দেহ থেকে যায়, এবং প্রতি রাতে একটু করে বড় হয়।
গলির মুখে পৌঁছালাম বিকেলে। নবী মিয়া চা বানাচ্ছিলো। আমাকে দেখে বললো, ভাই আজকে দেরি হইলো নাকি।
আমি বললাম, একটু।
সে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না।
দোকান খুললাম। সাটার তুলতে গিয়ে দেখি তালায় মরিচা, অথচ সকালে বন্ধ করার সময় ছিলো না। কিন্তু এই ধরনের জিনিস আমি এখন আর গুনি না।
কম্পিউটার চালু করলাম। উইন্ডোজ উঠতে সময় নিলো, পুরোনো মেশিন তো!
ডেস্কটপে "ফরম-১৭" খুঁজলাম।
ফাইল আছে। কিন্তু ফাইলের গায়ে তারিখ দেখাচ্ছে দুই হাজার সতেরো সালের ছাব্বিশে মার্চ। আমি ফাইল বানিয়েছি এগারো মাস আগে, দুই হাজার চব্বিশে।
খুললাম।
পূরণ করা কাগজ। আমার নাম, ওর নাম, বাবার নাম, ঠিকানা। তারিখের ঘরে তারিখ বসানো। আর নিচে দুই পাশে দুইটা স্ক্যান করা সই। একটা আমার। বাঁকা, শেষে একটা টান দিই আমি, ওটা আমার। আরেকটা রাহেলার, গোল গোল অক্ষরে, শেষের 'আ'-টা লেজ ছাড়া।
আমি সইয়ের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। এতটাই যে স্ক্রিনের আলোয় চোখ জ্বালা করতে শুরু করলো।
স্ক্যানার আমার। প্রিন্টার আমার।
সাত বছর।
আমি হিসাব করার চেষ্টা করলাম। সাত বছর আগে আমার বয়স ছিলো আটত্রিশ। ওই বছরে কী হয়েছিলো মনে করতে বসলাম, চোখ বন্ধ করে, যেভাবে হারানো জিনিস খোঁজার সময় শেষ কোথায় রেখেছিলাম ভাবতে হয়।
মানুষ বছর মনে রাখে ঘটনা দিয়ে। কার বিয়ে হলো, কে মরলো, কোন বছর গলিতে কোমরসমান পানি উঠেছিলো।
ঋতু দিয়ে শুরু করলাম। শীত মনে পড়লো না। বর্ষা মনে পড়লো না।
তারপর কাস্টমার দিয়ে চেষ্টা করলাম। কাস্টমারের মুখ আমি ভুলি না, এটা আমার পেশার একমাত্র গর্ব। সাত বছর আগের কোনো মুখ এলো না।
শেষে মনে পড়লো, ওই বছর দোকানে নতুন প্রিন্টার এসেছিলো। সাদা, ঢাকনার ওপর একটা ফাটল, ডেলিভারির দিন থেকেই।
আর কিছু না।
আমি ফাইল প্রিন্ট করিনি। মুছেও ফেলিনি। "ফরম" নামের বাকি ছেচল্লিশটা ফাইলের সঙ্গে ওটাকে একটা ফোল্ডারে ঢুকিয়ে দিলাম। ফোল্ডারের নাম দিলাম "পুরাতন"।
তখন পেছন থেকে রাহেলার গলা পেলাম। ও সিঁড়ি দিয়ে নামছে, হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। বললো, ভাত বেড়ে রাখছি, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
আমি বললাম, আসছি।
ও দাঁড়ালো। তারপর বললো, তুমি সিগারেট আনতে গেছিলা না?
আমি হাতের দিকে তাকালাম।
হাতে কিছু নেই। কিন্তু ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমার ফাঁকে নিকোটিনের একটা হলুদ দাগ। আমি এগারো বছর আগে সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


