somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বান্দর হোলা

০৩ রা মে, ২০১৮ রাত ১:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



তখন বয়স কত আর হবে?
ক্লাস সেভেন এ পড়ি, তার মানে বারো বা তেরো।

প্রতিদিন সকালে মসজিদের মক্তবে যেতাম আরবি পড়ার জন্যে - বাড়ির কাছেই, যদিও পাশেই না।
বাবা রোজ মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ শেষে ফিরে আমাকে ডেকে তুলতেন।
তখন আমি, আমার ছোট ভাই আর আমাদের কাছাকাছি বয়সের কয়েকজন, পাশাপাশি কয়েকটি ঘর থেকে এই প্রায় আট-দশ মিনিটের পথ হেটে মসজিদে যেতাম।

ততক্ষণে মুসুল্লিরা ফজরের নামাজ শেষ করে বের হয়ে গেছে। মসজিদের বারান্দায় বসে আমরা আরবি পড়তাম; ছেলেমেয়ে মিলিয়ে সর্বসাকুল্যে বিশ জনের মত। আমরা ছেলেরা বসতাম বারান্দার দক্ষিনে, আর মেয়েরা উত্তর দিকে। কোন এক অজ্ঞাত কারণে হুজুর মেয়েদেরকে বারন্দার পাকা বেঞ্চে বসতে দিতেন; কিন্তু, ছেলেদের এই সুযোগ ছিল না, বসতে হত ফ্লোরের উপর ।

এ নিয়ে আমাদের মনে কিছুটা ক্ষোভ কাজ করত।
হুজুরের বেতের ভয়ে, বলার সাহসও পেতাম না। ক্ষোভ প্রকাশের অন্য কোন উপায়ও খুঁজে পাইনি - বরং এই অবিচারের সমালোচনা এবং মেয়েদের সামনে আমাদেরকে ছোট করার নিন্দা প্রকাশ নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

তবে, এই বাড়তি সুবিধা নেয়ার কারণে মেয়েদের উপরও কিছুটা রাগ হত।
আমার সমবয়সী কয়েকজন মেয়ে আবার এই সুবিধাটা একটু দেখিয়ে দেখিয়েই উপভোগ করতো, যা দেখে প্রায়ই উপায় খুঁজতাম – কিভাবে এদেরকে কিছুটা হলেও শিক্ষা দেয়া যায় যে, আমরা ফ্লোরে আর তারা বেঞ্চের উপর বসলেও আসলে আমরাই তাদের চেয়ে বেশী মর্যাদার দাবীদার এবং তারা যে মাঝে মাঝে বেঞ্চে বসে অনেকটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে আমাদের দিকে তাকায়, সেটা রীতিমত শাস্তিযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

একদিন বিকেলে বাড়ির পিছনের ঝোপঝাড়ের মধ্যে খেলতে গিয়ে রোকনের গায়ে এক জংলী ফলের ঘষা লেগে যায়।
কিছুক্ষন পরেই, শুরু হয় চুলকানি এবং চুলকাতে চুলকাতেই বেচারা কান্না শুরু করে দেয়। রোকনের চামড়া ফুলে যাওয়া দেখে এবং তার কান্নার ভয়াবহতায় আমরা খেলা বাদ দিয়ে ছুটলাম তার বাড়ির দিকে।

পরের কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা বান্দর হোলা কি জিনিস – তা বুঝে ফেলেছি। এতদিন আমরা শুধু চুতরা পাতা চিনতাম।
এবার চিনলাম নতুন এক ফল – যা চুতরা পাতার চেয়েও ভয়াবহ। এক প্রিয় খেলার সাথীর যন্ত্রণার মাধ্যমে হলেও বান্দর হোলার কারিশমায় আমরা মুগ্ধ। সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপারটা হল, এই ফলের গায়ে যে ছোট ছোট লোম থাকে, সেই লোম বা হুলগুলো চাইলেই একটু সতর্কতার সাথে আলাদা করা যায় এবং লুকানোও সম্ভব।

কার উর্বর মাথা থেকে উৎপত্তি হয়েছিল মনে নেই, তবে আমরা আমাদের এই নব্য অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাস্তবে প্রয়োগের জন্যে কিছু হুল কাগজের ঠোঙ্গায় ভরে লুকিয়ে রাখলাম। পরের দিন সকাল সকাল মসজিদে গিয়ে মেয়েরা যে বেঞ্চের উপরে বসে সেখানেই এক পাশে ছিটিয়ে দিলাম। হুলগুলো এমনই যে, খুব ভালো করে খেয়াল করলেও সিমেন্টের বেঞ্চে সহসা চোখে পড়ার সম্ভাবনা নেই।

অন্যদিন মেয়েদের দিকে তাকানোর চেষ্টা কিছুটা কম করতাম কারণ তারা হুজুরকে পড়া দেয়ার পরে বেঞ্চের উপর বসে আমরা যারা ফ্লোরে বসে আছি তাদের দিকে একটু ভাব নিয়ে তাকাতো – যা দেখে রীতিমত অপমানিত বোধ করতাম। কিন্তু, আজ একটু পর পর তাকাচ্ছি, মেয়েরা কে কোথায় বসছে দেখার জন্যে।

যথারীতি পড়া শুরু হল। হুজুর একজন একজন করে পড়া নিচ্ছেন, আর যার পড়া দেয়া শেষ, সে ফিরে গিয়ে নিজের জায়গায় বসছে। মেয়েদের মধ্যে থেকে দুইজন হুজুরের কাছে পড়া দিয়ে গিয়ে বসলো বেঞ্চের হুল ছড়িয়ে দেয়া অংশের উপর। ভাব নিয়ে তাকানোর মধ্যেই প্রথমে হালকা অস্বস্তি চোখে মুখে ফুটে উঠতে দেখলাম। এতগুলো ছেলের সামনে যতটুকু সম্ভব শালীনতার সাথে হালকাভাবে চুলকানি শুরু করলো, কিন্তু একটু পরেই এটা আর নিয়ন্ত্রনের মধ্যে থাকলো না। ছটফট করতে করতে চুলকানি আর তারপরেই শুরু হল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না।

পড়া নেয়ায় মশগুল থাকায়, হুজুর এতক্ষন খেয়াল করেননি।
কান্নার শব্দে চোখ তুলে তাকালেন, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলেন না।
আমরা যারা এর সাথে জড়িত, আমাদের চোখ মুখ ততক্ষণে শুকিয়ে গেছে।
দুষ্টামি করার নিয়তে করলেও কাজটা যে রীতিমত বোকামি এবং ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে মোড় নিচ্ছে – সেটা অনুধাবন করে ফেলেছি। মেয়ে দুইজন কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বাসায় ফেরার আরজি জানালে, সাথে সাথেই তা মঞ্জুর করা হয়।
তারা চলে যাওয়ার পর, হুজুর কি যেন চিন্তা করলেন, তারপর আমাদেরও ছুটি দিয়ে দিলেন।

ঐদিন বিকেলের মধ্যেই খবর পেয়ে গেলাম যে, আমাদের পুরো কুকীর্তি ফাঁস হয়ে গেছে।পরের দিন মসজিদে গেলাম ভয়ে ভয়ে। মেয়ে দুজনের কেউ আসেনি। তবে অন্যরা জানাল যে, তারা আগামী কয়েকদিন আসতে পারবে না। আর, হুজুর হাতে কিছু বেতের বাড়ি মেরে তারপর জানালেন যে, হুজুরকে গতকালই তাদের বাসা থেকে ডেকে পাঠিয়েছিল। হুজুরের কাছ থেকে বিস্তারিত জানার পরে, হুজুরকে বলা হয়েছে যে, আমাদেরকে কোন শাস্তি দেয়ার প্রয়োজন নেই। অবশ্য, আমরা যেন শাস্তি পেলেই বরং বেশি স্বস্তি পেতাম।

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০১৮ দুপুর ১:১২
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"কর্পোরেট_ফ্যাক্টসমুহ"

লিখেছেন মামুন রেজওয়ান, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪

"কর্পোরেট_ফ্যাক্ট_২১"



সব সময় ইন্টার্ভিউ দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমরা জানতে পারি অনলাইনে। কিন্তু যারা ইন্টার্ভিউ নেন বিভিন্ন পজিশনের জন্য তাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা জানা হয়না আমাদের। তাই আমরাও যারা মোটামুটি এক্সপেরিয়েন্স... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা: (দ্বিতীয় পর্ব)

লিখেছেন মৃত্যুঞ্জয়, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০০

কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?

দ্বিতীয় পর্ব: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বিভাজন এবং অসম প্রতিযোগিতা

একটি শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবদাস, কালজয়ী উপন্যাস এবং চিত্রনাট্যের পটভূমি

লিখেছেন মেহবুবা, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৮


প্রথম ১৯২৮ সনে নির্বাক "দেবদাস" মুক্তি পায় ফনী বর্মা এবং তারকবালা অভিনীত ছিল সেটি। এরপর প্রমথেশ বড়ুয়া এবং যমুনা বড়ুয়া অভিনীত সবাক দেবদাস মুক্তি পায় ১৯৩৫ সনে। তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৪৩




যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে
শান্ত গৌরবে, সেই আত্মারা কোথায় বেঁচে রয়।
দয়ার প্রতিটি বীজ সর্ন্তপণে বপন করা হয়,
সপ্তাকাশে উজ্জ্বল ফসল তবে অবধারিত রয়।

সাত আকাশের চরাচরে , ছায়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কেমনের দিনে

লিখেছেন শাওন আহমাদ, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫



মাঝেমধ্যেই মনের ক্যানভাসটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত রং হারিয়ে যায় অচেনা পথের বাঁকে। কোনো সংকেত ছাড়াই একরাশ এলোমেলো বিষণ্ণতা এসে জেঁকে বসে মনের কার্নিশে। চারপাশের চেনা জগৎটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×