তাহমিমা আনামের গার্মেন্টস গল্পটিকে কে, কীভাবে দেখছেন জানি না। তবে আমার মতে, গল্পটির বিষয়বস্তুতে নানা দিক আছে। গল্পটি ইংরেজি সাহিত্যের। গল্পটাতে এমন আহামরি কিছু নেই যার জন্য তাকে 'ও হেনরি' পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ছোট গল্পকার ও’ হেনরির নামে এই পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়েছে। ১৯১৮ সাল থেকে ছোট গল্পের জন্য ও’ হেনরি সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয়। তাহমিমা আনাম ৯৯তম পুরস্কার লাভ করেন।
ইরোটিক সাহিত্যের উপাদান এতে বিদ্যমান। গল্পটাকে অশ্লীলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিতে সব আয়োজন গল্পটাতে আছে। এ পুরষ্কার প্রাপ্তির একটিই কারণ, সেটা হচ্ছে, রানা প্লাজার ঘটনা ও বাংলাদেশের গার্মেন্টসের প্রসঙ্গ ওঠে আসা। এই ওঠে আসাটা এদেশের জন্য সুখকর নয়! এই গল্প এখানে-ওখানে প্রচার করে দেশের মান-সম্মান যতোটা গেছে, তা 'ও হেনরি' কী পুষিয়ে দিতে পারবে? আর বড়ো প্রশ্ন তার গল্প প্রসঙ্গ এ সমাজের সাথে কতোটুকু মেলে? যদি মিলে যায় আমার কোনো সমস্যা নেই। বাংলাদেশে সমালোচনা হচ্ছে, তাহমিমা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার জন্য।
বর্তমান বাংলাদেশে আর পঞ্চায়েত প্রথা চালু আছে বলে আমার জানা নেই। বিদেশের পাঠকরা সেটি বুঝতে পারবেন না। গল্পে দেখানো হয়েছে, ঘরভাড়া নেওয়ার জন্য তিনজন নারী গার্মেন্টকর্মী একজন পুরুষকে একসঙ্গে কাজি অফিসে বিয়ে করছে। ঢাকার প্রেক্ষাপটে খুবই অবাস্তব একটি ঘটনা। গার্মেন্টকর্মীদের জন্য মেসের ব্যবস্থা আছে। বিয়ে না করেই হাজার হাজার মেয়ে থাকছেন সেখানে। মালা ছাড়া বাকিদের নাম স্বাক্ষর করতে না পারার বিষয়টিও আরোপিত হয়েছে। এ-ও দেখানো হয়েছে, দুলাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বড়ো দোকানে কাজ করে, তার স্ট্যাটাস গার্মেন্টকর্মীদের ওপরে। অথচ দেখা যাচ্ছে, সে স্ত্রীদের কাছে পালা করে থাকে, খায় এবং স্ত্রীদের টাকায় নিজের অক্ষমতার চিকিৎসা করাবে বলে চিন্তা করছে। বাংলাদেশের সংগ্রামী গার্মেন্টকন্যাদের এতো ঠ্যাকা পড়েনি যে, ঘরভাড়া নেওয়ার জন্য অক্ষম এক পুরুষকে বিয়ে করে সারা রাত তার পিঠ চুলকে দিতে হবে! গার্মেন্টকর্মীরা এখন অনেক বেশি স্বাবলম্বী। গল্পে আরও দেখানো হয়েছে শীতকাল। অথচ জেসমিন নতুন ভাড়া বাড়িতে উঠে দেখে ফুটো চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে মেঝেতে পানি জমে গেছে। এসব বিষয় হয়তো বিদেশি পাঠকের নজরে আসবে না, কিন্তু এ দেশের পাঠকের কাছে বিষয়টি ঠিকই চোখে পড়বে।
গল্পের কাহিনী যে কোনো গল্পের মূল আকর্ষণ। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির মেয়েদের জীবন তুলে ধরা হয়েছে ওই গল্পে। গল্প কিন্তু দেশ, কাল ও সময়কে চিহ্নিত করে। গল্পের কাহিনী যেহেতু বাংলাদেশের বর্তমান সময়কে চিহ্নিত করছে সেহেতু সময়টাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সময়ের সঙ্গে গল্পের কাহিনীর সাংঘর্ষিক কিছু আছে কি-না সেটাও বিবেচ্য বিষয়। কল্পকাহিনী দিয়ে গল্প হয়, তবে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি কোনো কল্পকাহিনী নয়। এখানে রক্তঝরা শ্রম দিয়ে যারা এই ইন্ডাস্ট্রিকে পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তাদের প্রতি আমাদের সম্মানটা সেভাবেই দেওয়া উচিত, কোনো কল্পকাহিনী দিয়ে নয়।


সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুন, ২০১৭ ভোর ৪:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




