জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও) বিশ্ব খাদ্য পূর্বাভাস (জানুয়ারি-২০১১) প্রতিবেদনে বলেছে, গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন চালের রপ্তানিমূল্য ৪ শতাংশ কমে ৫৪২ ডলার হয়েছে। অথচ দেশের বাজারে চালের দাম বেড়েই চলছে।
চাহিদার তুলনায় আমদানির পরিমাণ বা দেশে উৎপাদন খরচ যা-ই হোক, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে দেশেও তা বাড়ে। ছয় মাস ধরেই চালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল। কিন্তু গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমলেও দেশে উল্টো বাড়ছে।
আবার গমের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে সম্পর্কের হিসাবও মিলছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে চাল ও গমের দামের পার্থক্য প্রতি টনে ২০০ ডলার হলেও দেশে বিক্রি হচ্ছে প্রায় একই দামে, অর্থাৎ, ৩৩ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে।
সরকারি হিসাবে আমনে প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচ পড়েছে ২১ টাকা। চলতি অর্থবছর দেশের চাহিদার ৩ শতাংশ চাল আমদানি করতে হবে। সরকার নিজেই আমদানি করছে। এফএওর দেওয়া হিসাবে গমের দাম প্রতি টন ৩৪০ ডলার। গম থেকে আটা করতে কেজিতে সর্বোচ্চ দুই টাকা যোগ হয়। এই হিসাবে বাজারে আটার কেজি ৩০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ৩৩ থেকে ৩৬ টাকায়।
বেসরকারি খাতে প্রায় এক লাখ টন চাল আমদানি হলেও তা মূলত সুগন্ধি-চিকন চাল। সাধারণ ক্রেতারা এই চাল কেনেন না। কিন্তু তার পরও কেন চালের দাম বাড়ছে, তার ব্যাখ্যা দিয়ে এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বোরো মৌসুমে সরকার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চাল সংগ্রহ না করায় এবং মজুদ কম হওয়ায় দাম বাড়ছে। চলতি বছর বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমাণে চাল উৎপাদন হয়েছে বলে এফএওর হিসাবে দেখা গেছে।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোর ধান কাটা শুরু হয়। নতুন চাল বাজারে আসা শুরু করায় দামও কমতে থাকে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানের চাল পর্যায়ক্রমে বাজারে আসা শুরু হওয়ায় ধীরে ধীরে দাম কমতে থাকবে। ফলে এই সময়টাতেই সরকারের উচিত চাল আমদানির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া।
খাদ্য বিভাগের মহাপরিচালক আহমদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল-গম আমদানির চেষ্টা সরকার প্রতিনিয়ত করছে। চালকলের মালিকদের পাশাপাশি বড় কৃষক, চালের পাইকারসহ বিভিন্ন স্তরে চালের মজুদ করা হচ্ছে। এই চাল বাজারে এলে দাম কমে আসবে। তিনি আরও জানান, চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীদের জন্য চলতি সপ্তাহে রেশন চালু হচ্ছে। ওএমএস ডিলারের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ৪০ লাখ গ্রামীণ হতদরিদ্র মানুষকে মাসে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। এতে দাম কিছুটা কমে আসবে।
গত জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত এফএওর প্রতিবেদন অনুযায়ী এশিয়ার প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে চালের সরবরাহ বাড়িয়ে দেওয়ায় দাম কিছুটা কমেছে। থাইল্যান্ড প্রতি টন চাল বর্তমানে ৫৪২ ডলারে বিক্রি করছে। এই দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ কম এবং ২০০৮ সালের তুলনায় ৪৪ শতাংশ কম।
এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার চাল ও আটার দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে রাজধানীতে গত এক মাসে মোটা চালের দাম প্রতি কেজিতে এক টাকা ও চিকন চাল দুই থেকে চার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে আটার দামও গত এক মাসে কেজিতে এক টাকা বেড়েছে। গত এক বছরে আটার দাম ৫১ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এফএওর আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে বাংলাদেশ ধান-গমসহ দানাদার শস্য ও কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদনে নতুন রেকর্ড করেছে। দানাদার শস্যের উৎপাদন নিয়মিতভাবেই বাড়ছে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও খাদ্যের দাম বাড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
গত বোরো মৌসুমে উল্লেখ করার মতো খরা হয়নি। কৃষকদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে সার বিতরণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও ডিজেলের সরবরাহে তেমন ঘাটতি হয়নি। বীজের মানও ভালো ছিল। ফলে সব কটি মৌসুমে বাম্পার ফলন হয়েছে। শীতকালীন ফসল গমের উৎপাদনও গত বছরের তুলনায় ছয় শতাংশ বেড়ে নয় লাখ টন হয়েছে। দেশে প্রতিবছর ২৫ থেকে ২৮ লাখ টন গমের প্রয়োজন হয়, যার বেশির ভাগ রাশিয়া, কানাডা, ইউক্রেন, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু চলতি বছর রাশিয়া ও ইউক্রেন গম রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বেড়েছে।
খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত খাদ্যের দামবিষয়ক নীতি ও কৌশল প্রণয়নকারী সংস্থা খাদ্য পরিধারণ ও মূল্যায়ন ইউনিট গত জানুয়ারি মাসে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার-পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে বলা হয়েছে, বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতি কেজি চালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের প্রায় সমান জায়গায় পৌঁছেছে। দেশে প্রতি টন চাল ৪৫৭ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের কলকাতায় প্রতি টন চাল বিক্রি হচ্ছে ৪০২ ডলারে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ সকাল ১১:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




