somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন শিক্ষক ও আমরা ক'জন!

২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



প্রথম প্রথম পড়তে গিয়েছি। স্যারের নিয়ম, পুরো সময়ে শুধুমাত্র উনার হাতেই কলম থাকবে৷ যেকোন একজনের খাতায় তিনি লিখবেন। সবাই খুশি। যার খাতায় লিখবেন তার কপাল খোলা। একে তো প্রাইভেটের পর বসে বসে সবার সাথে খাতায় কপি করতে হবেনা, প্লাস বুঝানোর ডিটেইলস কপিটা থাকলে পরে বাসায় যেয়ে টপিক বুঝতে সুবিধা হয়। কে কবে খাতা দিবে তার লিস্ট করা হয়ে গেলো। উহূ মাখন। কিন্তু এটা হাশেম স্যারের প্রাইভেট, কিছু গরমিল থেকে যায়। দেখা গেলো একদিনেই খাতায় মোটামুটি ১০-১২ পেইজ সাইজ হয়ে যাচ্ছে । কর্নফুলী খাতার দিস্তা তখন ১৮/২২ টাকা। এত দামী খাতার হাফদিস্তা একদিনে হাপিস হয়ে যাওয়া দেখে কয়েকজন বলল -আমরা খাতা দিবো না। মাফি চাই!
এদেরই মধ্যে অতি চিকন'বুদ্ধিমান (চট্টগ্রামের ভাষায় "চ্যিয়ুন বুদ্দি") একজন (নাম মনে নেই) নিউজপ্রিন্ট খাতা নিয়ে এলো।
নিউজপ্রিন্ট দেখেই আমরা এগাল ওগাল হেসে নিলাম। চ্যিয়ূন বুদ্দি স্যারের দিকে সেই খাতা এগিয়ে দিতেই স্যার বিখ্যাত শীতল হাসি হেসে বললেন-
-এটা কি? হেহে?
-আমরাও বলে উঠলাম, হেহে❓❓

স্যারের টেবিলে দুটি পেপার ওয়েট ছিলো৷ দুই পেপার ওয়েট দিয়ে যে কত ফিজিক্স,ক্যেমেষ্ট্রি, ম্যাথ বুঝানো হইছে হিসেব ছাড়া। একদিন কি একটা বুঝাচ্ছেন স্যার। আমি পেপার ওয়েট নিয়ে বেশ কতক্ষন টুকাটুকি করছি৷ স্যার বুঝানো থামিয়ে বললেন,
-"সাব্বির কি খেলতে এসেছো? "
এই কথার পরে আসলেই আর কিছু বলার থাকেনা। এক বাক্যে কুপোকাত।

সজিবের বাসায় কিছুদিন পড়ানোর পর স্যার আমাদের তার পাঠশালায় নিয়ে যান। প্রাইভেটের জন্য সময় হিসেবে বিকাল ৫ঃ৩০ বেশ অদ্ভুত।শিশুরা যখন মাঠে খেলে আমরা তখন মাঠের পাশ দিয়ে হাসতে হাসতে বাশ খেতে যাই।
এমন সময়ে প্রতি শুক্রবার স্যারের পরিক্ষা নেয়া শুরু হয়ে গেলো। যথারিতী আমি প্রতি পরিক্ষায় ঝুলেঝুলে পাশ করতে থাকলাম। এক পরিক্ষায় আমি দূর্ভাগ্যবশত বেশী ঝুলে পড়লাম৷ স্যার আমাকে বাংলাওয়াশ করে দিলেন। সাবলীলতা সুশিলতা ও হিংস্রতার এক অপূর্ব মিশ্রন। স্যার বাসায় ফোন করলেন।

একদিন পরিক্ষায় সৌরভ ভাই নকল করতে যেয়ে ধরা খেলো। বাসায় ফোন দিয়ে ভাইকে ধুয়ে দিলেন স্যার৷। আমরা মুখ চিপে হাত পা দিয়ে হাসা শুরু করলাম।মাঝে কিছুদিন এন্টারটেইনমেন্টের ভার ঋজু একাই পুরোটা সামাল দিয়েছি।পড়া জিজ্ঞেস করা হলেই তার তিন-চার মিনিটের খুশখুশে কাশি আসা শুরু করলো। নাম দেয়া হলো যক্ষা! রিচার্ডকে সমাজ অবজেক্টিভ জিজ্ঞেস করা হলো-অর্থনীতির জনক কে ❓
উত্তর এলো,-" দুদু মিয়া! "
এর পরের কাহিনী আর না বলি, তবে অবস্থা এমন দাড়ালো যে প্রাইভেট মানেই এক দিনের ফুল এন্টারটেইনমেন্ট।শুধু কোনক্রমে ভিকটিম হয়ে গেলে খেল খতম।আর ভিক্টিম ছাড়া বাকিদের ঈদ অনন্দ দেখে কে?
স্যার যে হাসতেন না তা'নয়। স্যার হাসতেন ও হাসাতেন এবং হাসতে হাসতে বাশ দিতেন।যে বাশের সাইজ হিসেব করে বাকিরা পরিমান মত হেসে নিতো।পরিক্ষা চলছে। স্যার আগের সপ্তাহের খাতা কাটতে কাটতে পড়ে শুনালেন - সাইদুর লিখেছে-
প্রশ্ন-ব্যাপন কিভাবে হয় ?
উত্তর -"একটি লোকাল বাস প্রথমে হাসপাতাল গেইট থেকে বন্দরটিলা হয়ে তারপর ফ্রী-পোর্ট যায়। এইভাবেই ব্যাপন হয় ! "

প্রিটেষ্টের পর শুরু হলো রেগুলার অবজেক্টিভ পরিক্ষা৷ স্যার কোন এক কুখ্যাত বইয়ের পেইজ ফটোকপি করে আমাদের রীতিমত তুলোধুনো করে ছাড়ছেন৷ আমাদের তখন বেগতিক অবস্থা। কারন ততদিনে আমরা বুঝে গিয়েছি, স্কুলের পরিক্ষা জাস্ট একটা ফর্মালিটিজ। হাশেম স্যারের পরিক্ষাই আসল পরিক্ষা৷ ব্যাচের অতি উৎসুক ছেলেপেলে অবশেষে সেই নচ্ছার বইয়ের নাম খুজে পেল - "সিউর সাকসেস"।

অংকে তখন আমি বরাবরের মতো দূর্বল। আমার অংকের দুরাবস্থার কথা তিনি খুব ভালোভাবেই বুঝে ফেলেন। স্যারের বলা "ও সাব্বিরের খাতা? আগে কাটি, পরে দেখি " ডায়লগটা আমার ফেভারিট ডায়লগ লিষ্টের উপরেই আছে এবং থাকবে!
অংকে দূর্বল তাই হ্যায়ার ম্যাথ নিলাম না আমি। স্যার আমাকে বললেন, "ল্যাজ কাটা সায়েন্স৷ এই ল্যেজ কাটা সায়েন্স তো আমি ব্যাচে রাখি না! "আমি পড়লাম মহা মুসিবতে। কাটা ল্যেজ নিয়ে আমি ভয়ে ভয়ে প্রাইভেটে যেতে থাকলাম। স্যার যেদিন হ্যায়ার ম্যাথ বুঝাতেন।সেদিন আমি চুপচাপ সিরিয়াস মুডে ম্যাথ বুঝার চেষ্টা করছি ভাব ধরে আকাশ কুসুম ভাবতে ভাবতে এক ঘন্টা পার করতাম। হংসসম এই পন্ডিতদের মাঝে আমি তো দলছুট 'বক'। আমি কি করব❓
এমনি একদিনে হ্যায়ার ম্যাথ বুঝানো শেষে স্যার বললেন -
" ওকে , আজকে জেনারেল ম্যাথ ২.১ শেষ, নেক্সট উইকে এইটা পরিক্ষা৷ আর নেক্সট ক্লাসে সবাই হ্যায়ার ম্যাথ নিয়ে আসবে।"
এই শুনে আমি ইন্সট্যান্ট তব্দা খেয়ে গেলাম।
মাথায় আকাশ ভাইংগা পড়লো। হায় হায়!

লাইফের অন্যতম একটা সুন্দর মুহূর্ত যা আমার মনে ছিলোনা।এস এসসি পরিক্ষার কিছুদিন আগে স্যার আমাদের এক বিকেলে সবাইকে দেখা করে আসতে বললেন। দীর্ঘ দুই বছর যিনি আমাদের শাষন করেছেন, আদর করেছেন, আমাকে অংক শিখিয়েছেন, তার প্রতি একটা অদ্ভুত ভালো লাগা বুঝতে পারলাম সেদিন।স্যার আমাদের সাথে হাসলেন, গল্প করলেন, গান করলেন.....আর আদায় করে নিলেন এক বুক রেস্পেক্ট আর ভালবাসা।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১২:৪৭
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১৭ জুনে বিয়ে, অথচ ২২ জুনের সিভিতে ‘অবিবাহিত’? এমপি সাহেবের এই গণিত কে মেলাবে?

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৮



ধরা খাইলেই “দ্বিতীয় বিবি”! কিন্তু ১৭ জুনের বিয়ার পর ২২ জুনের সিভিতে মাইয়া 'আনম্যারিড' থাকে কেমনে?
সাতক্ষীরার এমপি সাবের এই ভণ্ডামির জট ছাড়াইতে পারবেন তো, নাকি এআই (AI) এর ওপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আজ খুশি ভাগ করতে এসেছি=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০৫



আসসালামু আলাইকুম। শুভ সন্ধ্যা। কেমন আছেন সবাই?

আলহা গত বৃহস্পতিবার আমি প্রমোশন পেয়েছি। অতিরিক্ত পরিচালক (৪র্থ গ্রেড)। খুশির সংবাদ জানাতে দেরি করে ফেলেছি সরি।

আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন, যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই।

লিখেছেন ইমরোজ৭৫, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:২০


আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই। ইন্টারনেট এর স্পিড খুবই কম। ফেসবুকে কেউ ভাইরাল হতে আসবে না। অল্প লেখায় নিজের মনোভাব ফেসবুকে পোস্ট করবে। কেউ আর পাকনা পাকনা কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজয়ী

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩২

বিজয়ী
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

বিজয়ী কখনো কখনো হেরে যায়
হঠাৎ কেউ টপকে যায় তাকে
সেরা সবসময় সেরা থাকে না
পরাজিত হয়ে সে কাঁদে, ভেঙে পড়ে।
জয়লাভ প্রায় প্রত্যেকে আনন্দিত করে
আর হার প্রায় প্রত্যেকে দুখি করে।
আমরা কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াতের দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ রাজনীতি

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২২ শে জুলাই, ২০২৬ ভোর ৫:২৮


১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ‘জামায়াতে ইসলামী’ গঠন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এটি ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×