আসলে আইএসটা কী ? এটা কি কোনো রাস্ট্রশক্তি না পরাশক্তি ? এটা শুধুমাত্র একটি ভুঁইফোড় সংগঠন। অবাক করার বিষয় যুক্তরাস্ট্রের মত বিশ্ব পরাশক্তি গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আইএস এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, আইএস এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে পরাশক্তি ব্রিটেন, ফ্রান্স, আঞ্চলিক শক্তি তুরস্ক, সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব রাস্ট্রগুলিও যুদ্ধ করছে। মানে ওরা দাবি করছে যে ওরা আইএস এর বিরুদ্ধে জোট গঠন করে যুদ্ধ করছে। তেমনি আইএস এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে পরাশক্তি রাশিয়া ও আঞ্চলিক শক্তি ইরান ! এতগুলো রাস্ট্র আইএস এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরেও আপাতদৃষ্টিতে ভুঁইফোড় একটি সংগঠন আইএস এর কোনো চুলও ছিড়তে পারছে না কেউ; বরং দিন দিন এর বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা যেন বেড়েই চলছে। আইএস এতই শক্তিশালী হয়েছে যে খোদ জন্মদাতা বাবার বাসভবনেও হামলা করছে ! আসলেই কি আইএস এত শক্তিশালী ?
আসলে সিরিয়া ও ইরাক হল বর্তমানে বিশ্বরাজনীতির নাট্য মঞ্চ। মঞ্চের বাইরের দৃশ্য সম্পর্কে ধারণা না থাকলে আপাতাদৃষ্টিতে আইএসকে ভয়ংকর শক্তিশালী মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। আইএস আসলে কিছুই না । আইএসের বাবা হল যুক্তরাস্ট্র, সহযোগী বাবা হল ব্রিটেন ও ফ্রান্স আর মা হল সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্র অন্যান্য রাজতান্ত্রিক দেশগুলো্। তবে আইএস সৃষ্টিতে তুরস্ক সারোগেট মা হিসাবে অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে। অবশ্যই আইএস সৃষ্টিতে ওহাবি ইসলামী আইডিওলজি একটা বিরাট প্রভাবক কিন্তু এখানে শুধু রাজনৈতিক দিকটা আলোচনা করব। আমি হলফ করে বলতে পারি যুক্তরাস্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স আজই যদি আইএসকে বিলুপ্ত করার ইচ্ছা পোষণ করে অথবা নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করে তাহলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আইএস বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু তারা সেটা করবে না ও কখনই করবে না । মূলত এখানেই ভানুমতির খেলা !
আইএস কি নিজেই অস্ত্র বানায় ? ভয়ংকর মারণাস্ত্র বানায় ? এই যে আইএস যুদ্ধ করছে তো তাদের অস্ত্রগুলো কোন দেশের ? কোন কোন দেশ তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে ও কোনো কোন দেশ তাদের অস্ত্র সহায়তা করছে ? আরো প্রশ্ন হল কেন করছে ? আইএসের উৎপত্তি ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ায় কেন ? মধ্যপ্রাচ্যে কি মার্কিন ও পশ্চিমা মিত্র রাস্ট্রের অভাব আছে ? এদের একটিতেও আইএস সক্রিয় নয় কেন ? মার্কিন ও পশ্চিমা বিরোধী রাস্ট্রগুলোতে কেন আইএস ? বিশাল অর্থ সহায়তা ছাড়া রাতারাতি আইএসের মত এত বড় একটি সংগঠন কিভাবে দাড়িয়ে গেল ? আর সেই অর্থ সহায়তা কোনো দেশ করল ? ইরাক ও সিরিয়ার তেলক্ষেত্রগুলো দখল করে সেই তেল উত্তোলন করে আইএস বিক্রি করছে কিভাবে ও কার কাছে বিক্রি করছে ? আইএস কোন কোন দেশের সাথে বৈদেশিক বাণিজ্য করছে ? আহত আইএস জঙ্গীরা কোথায় ও কিভাবে চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরী তাহলেই মঞ্চের বাইরের দৃশ্য সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও মার্কিন সিনেটর জন ম্যাককেইন আইএস নিয়ন্ত্রিত সিরিয়ার অংশে সফরে গেলে আইএস খলিফা বাগদাদির সাথে জন ম্যাককেইনের বৈঠক । সূত্রঃ সিএনএন
ওবামা বলছেন আইএস সৃষ্টির জন্য বুশ দায়ী আর বর্তমানে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা বলছেন ওবামা দায়ী ! মানে আমরা তো বটেই স্বয়ং আমেরিকার কর্মকর্তাগণও প্রকাশ্যে স্বীকার করতেছেন যে আইএস সৃষ্টিতে আমেরিকাই দায়ী।
মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আমেরিকার বৃহত্তর পরিকল্পনায় এখন পর্যন্ত কোনো চেন্জ আসেনি আর আসেনি বলেই রাশিয়ার সিরিয়ায় আইসিসের উপর হামলায় তারা বিরক্তবোধ করছে। রাশিয়া যখন হামলা করে আইসিস, আল কায়েদা ও আল নুশরার উপর তখন উহ আহ করে আমেরিকা, সৌদি ও তুর্কি ! তাই সম্ভবত রাশিয়ার হামলার বিপরীতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহনের নিমিত্তে প্যারিস হামলার নাটক মঞ্চায়িত হতে পারে।

বাগদাদির সাথে জন ম্যাককেইন

আইসিস নেতা আবু বকর আল বাগদাদি ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে দেখা করে আসার পর গর্বের সাথে ছবিসহ ম্যাককেইনের টুইটার
পশ্চিমা অন্যান্য রাস্ট্রের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারে ফ্রান্স কিছুটা হলেও দূরত্ব বজায় চেষ্টা করেছিল যদিও ফ্রান্স ২০১১/১২ তে আল কায়েদা, আইসিস ও তথাকথিত মডারেটদের অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা করেছিল বলে রিপোর্টে জানা গেছে কিন্তু পরবর্তীতে ফ্রান্স যুক্তরাস্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটে থাকলেও যুক্তরাস্ট্র ও ব্রিটেনের মত ততটা সক্রিয় ছিল না বলে অনুমিত হয়েছে। যেমন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসাবে মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল ফ্রান্স। প্যারিসে হামলার মাধ্যমে ফ্রান্সকে সিরিয়াতে সরাসরি উপস্থিত করা হল। এটা গেম প্লানেরই একটি অংশ। এর বাইরে তাদের অত্যন্ত গোপনীয় ও গভীর পরিকল্পনারও কোনো অংশ হতে পারে।তবে সিরিয়ায় রাশিয়ার উপস্থিতিতে আপাতত আসাদ বাহিনীর উপর আপাতত হামলা চালাবে না। পরে কি হবে এখনই বলা যাচ্ছে না । আইএস দমনের যুক্তরাস্ট্র এতদিন টম এন্ড জেরি খেলা খেলছিল প্যারিস হামলার মাধ্যমে সেটাই হয়তো আর দীর্ঘায়িত করা প্রচেষ্টা। অন্যদিকে প্রকান্তরে আসাদ বিরোধীদের শক্তিশালী করা। চলিত ঘটনাবলীর আলোকে বলা যায় ইরান ও রাশিয়াকে লক্ষ্য করে তারা কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে থাকতে পারে কারন মধ্যপ্রাচ্যে অঢেল জ্বালানি সম্পদ পুরোপুরি কবজা করতে ইরান ও রাশিয়া ছাড়া অন্যকেউ তাদের প্রতিপক্ষ নয়।
দিন যতই যাচ্ছিল ইরাক ও সিরিয়া নিয়ে পশ্চিমাদের মধ্যে বিভক্তি তত বাড়ছিল, কিন্তু প্যারিসে হামলা তাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে যা আমরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করছি। কানাডার নতুন প্রধানমন্ত্রী যেখানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিল তিনি এখন তা করবেন কি না তা একটি প্রশ্ন।
আসলে আইএস সহসাই বিলুপ্ত হবে না । বিলুপ্ত হবে না বলে কথা নয় তাদের বিলুপ্ত করা হবে না, তাদেরকে নির্মূল করতে দিবে না । কারা নির্মূল করতে দিবে না ও কেন দিবে না এটাই প্রশ্ন। আইএস যদি আজই নির্মূল হয় তাহলে আগামীকালই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যাবে; হুমকির মুখে পড়বে যুক্তরাস্ট্র, ব্রিটেন , ফ্রান্স, সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইসরায়েলের স্বার্থ । বিনষ্ট হবে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ । সাধারণ মানুষ কিছুই না - এরা হল বিশ্ব নেতাদের শক্তিপরীক্ষার গিনিপিগ। আমেরিকা যখন জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিউক্লিয়ার বোমা নিক্ষেপ করে তখন কি সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করছিল ? করেনি, তেমনি ফ্রান্সের প্যারিসে যা হল, বৈরুতে যা ঘটেছে, অন্যান্য দেশে জঙ্গীদের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা যা ঘটতেছে এসব আসলে বিশ্ব নেতাদের শক্তিপরীক্ষার এক একটি ক্ষেত্র ।
গত এক বছর ধরে যুক্তরাস্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা ও সৌদি, তুরস্ক জোট আইএস বিরোধী যুদ্ধের কথা বলে মূলত আইএসকে ভয়ংকর থেকে অতি ভয়ংকর দানব বানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে ইরান ও রাশিয়াকে মাইনাস করতে। আরব রাস্ট্রগুলির মধ্যে একমাত্র বাশার আসাদের সিরিয়া হল ইরান ও রাশিয়ার প্রত্যক্ষ মিত্র । তাই আসাদের উপর পশ্চিমারা ক্ষেপা তেমনি ক্ষেপা সৌদি ও তুরস্কও। এজন্যই তারা আসাদের অপসারণ চায়। ঠিক একই কারণে ইরান ও রাশিয়াই প্রকৃতপক্ষে আইএস জঙ্গীদের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। রাশিয়া যদি সিরিয়ায় আইএসের উপর হামলা না করত তাহলে হয়তো প্যারিসে আইএস বোমা হামলা করত না। একটি ঘটনার সাথে আর একটি ঘটনার যোগসূত্র আছে। সিএআইএ প্রধান ইতিমধ্যেই বলেছেন প্যারিসে হামলার ঘটনা তারা আগে থেকেই জানত ! প্যারিসের হামলায় পশ্চিমা কোনো সরকার বা কোনো গোয়েন্দা সংস্থার হাত আছে কি না তা স্পষ্ট করে না বলে বরং এটাই বলা যায় যে ফ্রাঙ্কস্টোইন আইএস সৃষ্টি করেছে সে আইএসই রাশিয়ার বিমান হামলা ও ইরান, সিরিয়া ও হিজবুল্লাহর গ্রাউন্ড আক্রমন থেকে রক্ষা পেতে অন্য কোনো দেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পরামর্শে, সহযোগিতায় বোমা হামলা ঘটিয়েছে । কারণ হল পশ্চিমাদের সিরিয়ার মাটিতে রাশিয়া ও ইরানের বিপেক্ষ দাড় করানো। সৌদি বাদশাহ মালেক সালমান ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিলে প্যারিস হামলা, বৈরুত হামলাসহ সকল জঙ্গী হামলার নেপথ্য খল নায়কদের মুখোশ উন্মোচনসহ সকল রহস্য বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন হবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




