somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রক্তের অক্ষরে লেখা শহীদের নাম ভেসে গেছে ভ্যালেন্টাইনের জোয়ারে.. ১৪ ফেব্রুয়ারী, স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস। আসুন জানি- কি ঘটেছিল সেদিন

০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ১০:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রক্তের অক্ষরে লেখা শহীদের নাম ভেসে গেছে ভ্যালেন্টাইনের জোয়ারে..
১৪ ফেব্রুয়ারী, স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস। আসুন জানি- কি ঘটেছিল সেদিন

১৯৮২ সালের ২৪ শে মার্চ লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করে। সবাই এ ব্যাপারে নীরব থাকলেও নীরব থাকেনি ছাত্রসমাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম শুরু হয়েছিল স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। ২৪ শে মার্চেই কলাভবনে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পোস্টার লাগাতে গিয়ে গ্রেফতার ও সাত বছরের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হন ছাত্রনেতা শীবলি কাইয়ুম, হাবিবুর রহমান ও আব্দুল আলী। এরপর ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সাভার স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে গিয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতারা স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে স্লোগান দেয়। সেনাবাহিনী স্মৃতিসৌধেই ছাত্রদের ওপর চালায় নির্মম নির্যাতন। সরকারি ফরমান জারি করে ছাত্রদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড অসম্ভব করে তোলা হয়। ছাত্ররা দেয়াল লিখে ও সামরিক সরকার তা মুছে দিতে থাকে। সেপ্টেম্বরে প্রথম ছাত্রনেতারা লিখিত প্রতিবাদ হিসেবে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃতি প্রদান করে।
সামরিক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান ক্ষমতায় এসেই নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই বাংলার সাথে ইংরেজী ও আরবি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। ধর্মকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করাই ছিল উদ্দেশ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও রেসাল্ট খারাপ হলেও যারা ৫০% শিক্ষার ব্যয়ভার দিতে সমর্থ তাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয় এতে। এই নীতিতে দরিদ্ররা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতো বলে ছাত্ররা এর প্রবল বিরোধীতা করে।১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে এই শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলো ঐক্যমত্যে পৌঁছে। ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং তারা শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও সারাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনমত তৈরির কাজ চালায়। এই আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার মোহাম্মদ ফারুককে গ্রেফতার করলে প্রতিবাদে ছাত্ররা ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। এরপর ১৪ ফেব্রুয়ারিছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচী হাতে নেয়। সেদিনই জন্ম নেয় এদেশের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের।
১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, এদেশের ইতিহাসে একটি নিকষ কালো দিন। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দি মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকারে দাবি ও গণমুখী, বৈজ্ঞানিক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির দাবিতে ছাত্র জমায়েত ডাকে। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচীতে হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ ও সুশৃংখল মিছিল যায় হাইকোর্টের গেট ও কার্জন হল সংলগ্ন এলাকায়। মিছিলটি হাইকোর্টের গেট থেকে বাংলা একাডেমী পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছিল। মেয়েরা ব্যারিকেডের সামনে বসে ও নেতারা তারের ওপর উঠে বক্তৃতা শুরু করলে পুলিশ বিনা উস্কানীতে তারের একপাশ সরিয়ে রায়ট কার ঢুকিয়ে রঙ্গিন গরম পানি ছিটাতে থাকে, বেধড়ক লাঠিচার্জ, ইট-পাটকেল ও বেপরোয়া গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলিবিদ্ধ হয় জয়নাল। এরপর গুলিবিদ্ধ জয়নালকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়। ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে জয়নালকে মৃত ঘোষণা করার পর আরো ফুসে উঠে ছাত্ররা। শিশু একাডেমীর এক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা শিশু দিপালীও গুলিবিদ্ধ হয় এবং পুলিশ তার লাশ গুম করে ফেলে। সেখানে ছাত্র, শিশু ও অভিভাবকদের ওপর চলে নির্মম নির্যাতন, লাশের স্তূপ গড়ে ওঠে শিশু একাডেমীতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ নিহত ও আহত মানুষদের এম্বুলেন্স পাঠিয়ে নিয়ে আসতে চাইলে ঢুকতে দেয়নি খুনী বাহিনী। সব লাশ গুম করে ফেলে তারা। কিছু না ঘটা সত্ত্বেও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে এমন অপপ্রচার চালিয়ে সামরিক সরকার উস্কে দেয় পুলিশকে। ঐদিন নিহত হয়েছিল জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালীসহ আরো অনেকে।
বিকেল তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় নোয়াখালীর চাটখিল থানার দোলাইপাড় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সপ্নে বিভোর সংগ্রামী জয়নালকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছাত্র-শিক্ষক ওক্ষুব্ধ জনতার ঢল নামে। তার জানাজায় অংশ নিতে আসা হাজার হাজার মানুষের ওপর আর্মড পুলিশ, বি.ডি.আর ও মিলিটারি, রায়টকার ও শত শত সাজোয়া গাড়ি নিয়ে এসে হিংস্রভাবে ঝাপিয়ে পড়ে। অপরাজেয় বাংলার সমাবেশে নির্বিচারে চলে গ্রেফতার, বুটের আঘাত ও লাঠি চার্জ। শিক্ষক ওঅভিভাবকরাও আক্রমন থেকে রেহাই পায়নি। ছাত্র-ছাত্রীদের কলাভবন ও উপাচার্যের কার্যালয়ে ঢুকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে হাত-পা ভেঙ্গে গ্রেফতার করে ট্রাকভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে উপাচার্য পদত্যাগ করেন। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা খ ম জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করা হয়।

বটতলায় আক্রমণের পর জয়নালের লাশ মুহসীন হলের ডাইনিংয়ে রাখা হয়, পরদিন ভোরবেলা সংগ্রামে নিয়ে যাবার জন্য। লাশের সন্ধানে পুলিশ নির্যাতন চালায় চারুকলার শিক্ষার্থীদের ওপর। পোশাকে রঙ্গীন পানির দাগ দেখে ধরে নিয়ে যায় অনেককে। সরকারীমতেই গ্রেফতার করা হয় ১,৩৩১ জন ছাত্র-জনতাকে, বাস্তবে এই সংখ্যা আরো অধিক ছিল। তাদের শাহবাগের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ও ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গিয়ে চালায় অকথ্য নির্যাতন। এখানেই মেরে ফেলা হয় অনেককে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাশনের প্রবল চাপে পড়ে ১৫-১৬ তারিখের মধ্যেই তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সামরিক সরকার। অনেকে থাকে নিখোঁজ, যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি আজো।
১৫ ফেব্রুয়ারি জগন্নাথ কলেজের মোড়ে গুলি চালিয়ে দুই তরুণকে হত্যা করা হয়। সদরঘাটে এ শিশুকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলা হয়।পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের দুই ছাত্রকে ছাদ থেকে ফেলে মারা হয়। বুয়েট, ঢাকা মেডিকেলসহ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাস থেকে গ্রেফতার করা হয় ছাত্রদের।
এই ঘটনার জোয়ার লাগে চট্টগ্রাম শহরেও। মেডিকেল ও অন্যান্য কলেজের শিক্ষার্থীদের মিছিলে পুলিশ লাঠি চার্জ ও গুলি চালালে নিহত হয় কাঞ্চন।

ছাত্রদের তিনটি মৌলিক দাবিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষানীতি স্থগিত হয়ে যায় ও ছাত্র বন্দিদের মুক্তির দাবির প্রেক্ষিতে পূর্বে আটক তিন ছাত্রনেতা মুক্তি পায়। ঘরোয়া রাজনীতির অধিকার দিতে বাধ্য হয় সামরিক সরকার। ১,০২১ জনকে ছেড়ে দেয় ১৭ ফেব্রুয়ারি ও আটক রাখে ৩১০ জনকে।
সেই থেকে জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালীসহ আরো অনেকের রক্তস্নাত এই দিনটিকে ‘স্বৈরাচার বিরোধী দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। কিন্তু আজ আমরা দেখতে পাই, এদেশের এমন একটি গৌরবজ্জ্বল দিনে ‘স্বৈরাচার বিরোধী দিবস’ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন না করে 'ভালবাসা দিবস' নামক অপসংস্কৃতিতে যুবসমাজ নির্লজ্জভাবে মেতে উঠেছে। ১৯৯২ সালে বুদ্ধিবেশ্যা শফিক রেহমান এদেশে ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র প্রচলল করে একটি স্বার্থান্বেষী মহলকে সুবিধা দেবার জন্য। ভালবাসা দিবসকে সামনে রেখে চলে নোংরা ব্যবসা আর লাভবান হয় শোষক শ্রেণী। এই দিবসের নোংরা স্রোতে ভেসে যায় ঐতিহাসিক 'স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস'
এই গৌরবগাঁথা ইতিহাসকে ভুলে অপসংস্কৃতিত জোয়ারে গা না ভাসিয়ে, আসুন আমরা প্রকৃত ইতিহাস জানি। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি ইতিহাসের এই বীর আত্মত্যাগীদের।
(সংগৃহীত)
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যাদের স্বপ্নের দেশ আমেরিকা: তাদের জন্যে আজকের পোস্ট

লিখেছেন অপলক , ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৮



এমন এক সময় ছিল, ছেলে বা মেয়ে ডিভি লটারীতে স্বপ্নের দেশে গেছে, বাপ মায়ের পাড়া প্রতিবেশী গর্বে কথা বলাই মুশকিল। সেখানে গিয়ে OC(Office Cleaner) নাকি DC(Dish Cleaner) হবে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেধা নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ই কি আমাদের রাষ্ট্রে যোগ্যতার মাপকাঠি?

লিখেছেন raselabe, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:২৯

বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয় বা ভেরিফিকেশনের কারণে প্রার্থীদের বাদ পড়ার অভিযোগ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। রাজনৈতিক দলগুলো ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নিজেদের ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম চালু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×