
কিন্তু এখন তো পীর-মুরিদীকে এক ধাঁধাঁর বিষয় বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এ বিষয়ে আসল কথা এই যে, মানুষ তার নিজের রোগ নিজে চিহ্নিত করতে পারে না। তাকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। যেমন অহংকার একটি রোগ। শরীয়তে তা হারাম। এতে কারো দ্বিমত নেই। কিন্তু কোনো অহংকারী ব্যক্তি কখনোই স্বীকার করে না যে, আমি অহংকারী। আরবী সাহিত্যে এর চমৎকার একটি উদাহরণ রয়েছে। উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় কেউ দাঁড়ালে তার কাছে নিচের সবকিছুই ছোট ছোট মনে হবে। মানুষ, ঘরবাড়ি, গাছপালা সবকিছুই দেখা যাবে অনেক ছোট। এখন তার কাছে মনে হবে দুনিয়ার সবকিছুই ছোট, শুধু আমি অনেক বড়। পক্ষান্তরে নিচের লোকজনও পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ানো লোকটিকে আকারে ছোট দেখতে পাবে।
তেমনিভাবে অহংকারী ব্যক্তি মনে করে, দুনিয়ার সবাই ছোট, শুধু আমি বড়। অথচ অন্যদের দৃষ্টিতে সে তুচ্ছ হয়ে ধরা পড়ে। যদিও মানুষ তার প্রভাব-প্রতিপত্তির ভয়ে তার সামনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে, মুখে কিছুই বলে না। কিন্তু মনে মনে তার প্রতি বিরক্ত থাকে। অহংকারী নিজে বুঝতেই পারে না যে, আমি ভয়ানক এক রোগে আক্রান্ত।
অহংকার এক ভয়াবহ রোগ
অহংকার বড় ভয়ানক ব্যাধি। এই ব্যাধি থেকে আরো অনেক রোগ সৃষ্টি হয়। ক্রোধ, হিংসা-বিদ্বেষ, অত্যাচার ইত্যাদি সবকিছুর মূলে অহংকার। অথচ অহংকারী নিজে তা অনুভব করে না।
এখন এই রোগ চিহ্নিত করে এর চিকিৎসা কে করবে? এজন্যই শায়খের দরকার। এটাই পীর-মুরিদির আসল প্রয়োজন এজন্যই।
টাখনুর নিচে পোশাক পরা
হাদীস শরীফে এসেছে, টাখনুর নিচে পোশাক পরিধানকারী জাহান্নামী হবে। অনেকেই বলে থাকেন যে, অন্য হাদীসে এর কারণ হিসেবে অহংকারের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ অহংকারবশত টাখনুর নিচে পোশাক পরলে জাহান্নামে যেতে হবে, কিন্তু আমরা তো অহংকার করে পরি না। ফ্যাশন হিসেবে পরি। এতে তো কোনো দোষ নেই!
আমি তাদেরকে প্রশ্ন করি, ভাই! বলুন তো পৃথিবীতে এমন কে আছে, যে দৃঢ়তার সাথে বলতে পারে যে, আমার অন্তরে সামান্য অহংকারও নেই? নিশ্চয়ই নেই। তেমনিভাবে অন্যের ব্যাপারেও নিশ্চিতভাবে কেউ এ দাবি করতে পারে না যে, তার মনে বিন্দুমাত্র অহংকার নেই। শুধু দোজাহানের সর্দার প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলা যাবে যে, তিনি সম্পূর্ণ অহংকারমুক্ত ছিলেন। অন্য কারো সম্পর্কেই একথা বলা যায় না। অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো কখনো টাখনুর নিচে কাপড় পরেননি। তো আমাদের উচিত তাঁর অনুসরণ ও অনুকরণ করা।
দ্বিতীয় কথা হল, এমন একজন অহংকারী খুঁজে বের করুন, যে তার অহংকারের কথা স্বীকার করে! তাহলে এ দাবি কীভাবে করা যায় যে, আমার মাঝে অহংকার নেই, তাই আমি টাখনুর নিচে পোশাক পরতে পারি?
অবশ্য কারো যদি ওযর বা অপারগতা থাকে তাহলে ভিন্ন কথা। যেমন আবু বকর রা. সম্পর্কে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর কাপড় আপনা আপনি নিচে ঝুলে পড়ত। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আরজ করলে তিনি তাঁর অপারগতা দেখে বললেন, অসুবিধা নেই, তুমি তো আর স্বেচ্ছায় অহংকারবশত করছ না।
যাহোক, যেভাবে রোগী নিজে তার দৈহিক রোগ-ব্যাধি নির্ণয় করতে পারে না, তাকে অভিজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয় তেমনিভাবে অন্তরেরও অনেক রোগ-ব্যাধি আছে, যা রোগী নিজে নির্ণয় করতে পারে না। যেমন হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, রিয়া, যশ-খ্যাতির লোভ, সম্পদের মোহ ইত্যাদি।
এই রোগ-ব্যাধি নির্ণয় ও নিরাময়ের জন্য বুযুর্গানে দ্বীনের শরণাপন্ন হতে হয়। তিনি এর চিকিৎসা করেন। কুরআন মজীদের ভাষায় একেই বলে তাযকিয়া। আর এটিই তাসাওউফের মূল কথা।
(মুফতী তকী উসমানী)
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই এপ্রিল, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


