
ছবিতে যাকে দেখছেন উনার নাম প্রফেসর ইমানাকা। উনাকে সারা বিশ্ব মনে রাখবে উনার যুগান্তরী আবিস্কার এর জন্য। তার আবিস্কার যেভাবে সবার জীবনকে বদলে দিবে এবং দিচ্ছে সেটা জানানোর জন্যই এই পোস্ট....
এ সপ্তাহের টাইম ম্যাগাজিনের Longevity Leaders সংখ্যায় উনার ছবি প্রচ্ছদে ছাপা হয়েছে। উনি একজন স্টেম সেল গবেষক ..সোজা কথায় বয়স্ক কোষকে 'রিপ্রোগ্রাম' করে ভ্রণ কোষে রূপান্তর করে, সেই ভ্রণ কোষকে শরীর এর অন্য যে কোন কোষে যেমন হার্টের কোষ, লিভার কোষ, চোখের কোষে রূপান্তরিত করার উপায়। এক কথায় পুরানো বয়স্ক কোষ এর আইডেন্টিকে মুছে ফেলে আদি ভ্রণ কোষে রূপান্তর এবং সেই রূপান্তরিত ভ্রণ কোষ কে শরীর এর যে কোন কোষে রূপান্তরিত করার মেথড। উনি ৪টি জিনকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন যেটা দ্বারা এই রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে। এই চার জিনই ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস নামে পরিচিত। কোন অর্গান ফেইল/নস্ট হয়ে গেলে সেখানে এই ভ্রণ কোষকে ইন্জেক্ট করে নতুন অংগ ডেভেলপ/মেরামত করার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। চায়নাতে গত সপ্তাহেই ডায়াবেটিস ১ এবং ২ ভাল করার ঘোষনা দিয়েছে যেখানে এই ভ্রণ কোষ ব্যবহার করে 'শরীর বন্ধ হয়ে যাওয়া ইনসুলিন কে নতুন করে তৈরী করার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
তাহলে ইনসুলিনের দিন কি শেষ? এখানে সাধারণ শরীরী কোষকে ল্যাবরেটরিতে ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরসকে ব্যবহার করে ইনসুলিন তৈরি করতে সক্ষম কোষে রূপান্তরিত করে তা পুনরায় রোগীর শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। পুরা প্রসেস টা হল: কোষ সংগ্রহ (Cell Harvesting): বেইজিংয়ের পিকিং ইউনিভার্সিটির গবেষক দল রোগীদের শরীর থেকে সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক কোষ—যেমন চর্বি বা রক্তের কোষ সংগ্রহ করেন। তারপর ইমানাকার আবিস্কৃত জিন দ্বারা কোষের রিপ্রোগ্রামিং করে অগ্ন্যাশয়ের কোষে রূপান্তর করা হয়। এই কোষগুলো একদম স্বাভাবিক অগ্ন্যাশয়ের মতোই রক্তে শর্করার মাত্রা বুঝতে পারে এবং নিজে থেকেই ইনসুলিন তৈরি করতে পারে। ল্যাবে তৈরি এই লক্ষ লক্ষ নতুন কার্যকর কোষ রোগীর পেটের পেশিতে ইনসুলিন তৈরির জন্য স্থাপন করা হয়। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'সেল'-এ (Cell) প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী (যিনি ১১ বছর ধরে টাইপ ১ ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন) এই চিকিৎসার মাত্র ৭৫ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই ইনসুলিন উৎপাদন শুরু করেন। তিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ ইনসুলিন-মুক্ত জীবনযাপন করছেন।টাইপ ২ ডায়াবেটিস (Type 2 Diabetes): সাংহাইয়ের আরেকটি ঘটনায়, ২৫ বছর ধরে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত একজন ৫৯ বছর বয়সী প্রবীণ ব্যক্তির ওপর এই চিকিৎসা সফল হয়। তার অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন তৈরির ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল। এই স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের পর তার রক্তে শর্করার মাত্রা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং তিনি ইনসুলিনসহ ডায়াবেটিসের অন্য সব ওষুধ খাওয়া বন্ধ করতে সক্ষম হন। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ২০২৯ বা তার পরবর্তী সময়ের মধ্যে এই প্রযুক্তিটি আরও সহজলভ্য ও উন্নত হবে। যদি এই ট্রায়ালগুলো পুরোপুরি সফল হয়, তবে মানবজাতি হয়তো চিরতরে ইনসুলিন ইনজেকশন এবং ডায়াবেটিসের ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পেতে চলেছে।
তবে আমার মতে, ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস এর সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিক হচ্ছে পুরো শরীরের বয়স রিভিয়ার্স বা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার পটেনশিয়াল। কেননা ইয়ামনাকা ফ্যাক্টরের সবচেয়ে জাদুকরী দিক হলো এটি কেবল কোষের রূপ পরিবর্তন করে না, বরং কোষের বয়সও কমিয়ে দেয়। এটার উদ্দেশ্য অমরত্ব লাভ নয়, বরং বার্ধক্যজনিত রোগ যেমন—আলঝেইমার্স, হার্টের সমস্যা বা পেশির ক্ষয় রোধ করা। কোষের জেনেটিক কোডকে রিপ্রোগ্রাম করে বৃদ্ধ কোষকে আবার তরুণ কোষে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে, যার ফলে মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে রোগমুক্ত এবং যুবসুলভ জীবনীশক্তি নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে। তবে হায়াত-মউত নিয়ে আমি কোন কমেন্ট করব না।
সম্প্রতি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের বিজ্ঞানীরা ইয়ামনাকা ফ্যাক্টর ব্যবহার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তারা বার্ধক্য এবং গ্লুকোমা রোগে আক্রান্ত অন্ধ ইঁদুরের চোখে বিশেষ তিনটি ইয়ামনাকা ফ্যাক্টর প্রবেশ করান। ফলাফল ছিল চমকপ্রদ—ইনজেক্ট করা কোষের প্রভাবে ইঁদুরের চোখের ক্ষতিগ্রস্ত এবং বুড়িয়ে যাওয়া অপটিক নার্ভগুলো আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় এবং ইঁদুরগুলো তাদের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। এই সফল পরীক্ষাটি প্রমাণ করে যে, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের বয়স কমিয়ে অন্ধত্ব দূর করা এখন আর কেবল কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং বাস্তবের খুব কাছাকাছি।
বিশ্বজুড়ে অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য লাখ লাখ মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা আর সংকটের দিন হয়তো শেষ হতে চলেছে। ইয়ামনাকা ফ্যাক্টরের সাহায্যে রোগীর নিজস্ব কোষ থেকে ল্যাবে কৃত্রিমভাবে লিভার, কিডনি বা হার্টের মতো জটিল অঙ্গ তৈরি করার গবেষণাও দ্রুত এগিয়ে চলছে। যেহেতু এই অঙ্গগুলো রোগীর নিজের শরীরের কোষ থেকেই রিপ্রোগ্রাম করে তৈরি করা হবে, তাই প্রতিস্থাপনের পর রোগীর শরীর এগুলোকে 'বিদেশি বা ক্ষতিকর অঙ্গ' ভেবে প্রত্যাখ্যান করবে না। এর ফলে রোগীকে সারাজীবন ইমিউনোসপ্রেসেন্ট ওষুধ খেতে হবে না এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপন হবে শতভাগ নিরাপদ।
উনার বিজ্ঞানে এই অবদান এর জন্য ২০১২ সনে উনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
আমার এই লিখা জামাতী ব্লগার দের জন্য নয়...উনারা ডালিমের মধ্যে থরে থরে সাজানো ডালিম দেখে সুবানাল্লাহ/আলহামদুল্লাহ বলেই বিজ্ঞান বুঝার জ্ঞান নিয়েই থাকুক
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




