somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মুজিব রহমান
সমাজ বদলাতে হবে। অনবরত কথা বলা ছাড়া এ বদ্ধ সমাজ বদলাবে না। প্রগতিশীল সকল মানুষ যদি একসাথ কথা বলতো তবে দ্রুতই সমাজ বদলে যেতো। আমি ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে অনবরত বলতে চ

শ্রদ্ধাঞ্জলি! হুমায়ুন আজাদ: এক বাল্যবিভোর লেখক

১১ ই আগস্ট, ২০১৮ রাত ১০:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হুমায়ুন আজাদ জন্মেছিলেন কামারগাঁও গ্রামে, ২৮ এপ্রিল অর্থাৎ মধ্য বৈশাখে। তখন নানা বাড়িতে জন্ম নেয়াটাই রীতি ছিল। কামার গাঁও ছিল একটি গাঁছপালা দ্বারা আবৃত ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা সমতল গ্রাম। বাঁশবন আর ঝোপ-ঝাড়ে পূর্ণ ছিল তখন। তিনি বড় হয়েছেন তাঁর পৈত্রিক বাড়ি রাড়িখাল গ্রামে। এখানে ১৫ বছর পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে বড় হয়েছেন। ভাগ্যকুল ও রাড়িখাল ইউনিয়ন দুটি পাশাপাশি পদ্মার তীর ঘেষে অবস্থিত। তবে রাড়িখালে তাঁর পৈত্রিক বাড়িটি পদ্মা থেকে মাইল খানেক ভেতরে। বৈশাখে তাঁর জন্ম বলেই হয়তো এটা তার প্রিয় মাস। এর অগ্নি তাকে সুখ দিত। অনেক বৈশাখে তিনি সোনাগলা তীব্র রোদের ভিতর হেটেছেন। চারদিকে রোদের গলিত সোনা দেখেছেন। এই গনগনে বৈশাখের তীব্রতা হয়তো জন্মের সময় ঢুকেছিল তাঁর ভিতরে। ২৭ ফেব্রুয়ারি মৌলবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার কদিন আগে ৬ ফেব্রুয়ারী ০৪ তিনি আমার গ্রাম ভাগ্যকুলের তরুণ অনুরাগীদের মানে আমাদের বলে গিয়েছিলেন চৈত্রের তীব্র দাবদাহ দেখতে গ্রামে আসবেন। যদিও সম্ভব হয়নি আক্রান্ত হয়ে ব্যাংককের বুমরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায়।
তিনি বড় হয়েছেন রাড়িখালের প্রকৃতির মধ্যে। রাড়িখালের উত্তরে বিশাল আড়িয়াল বিল। তাঁর মধ্যে নিবিড়ভাবে জড়িয়েছিল আড়িয়াল বিলের সৌন্দর্যতা। রাড়িখাল গ্রামটি হচ্ছে পুকুরের গ্রাম। পুকুরের পর পুকুর। পুকুরের পাশে পাড়া। এই গ্রাম নিয়ে তিনি লিখেছেন- রাড়িখাল: ঘুমের ভিতর নিবিড় শ্রাবণধারা। রাড়িখাল-ভাগ্যকুলের শৈশব স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন, ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’। তাঁর ভালাবাসার গ্রামকে সাজিয়েছেন রূপের বর্ণনায়। তাঁর শৈশব নানাভাবে তাঁর লেখায় এসেছে। তাঁর লেখার প্রধান উৎস তাঁর শৈশব। তার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ পদ্মা নদীতে চলতে থাকা এই স্টীমারের শব্দ শুনেই ঘুমের ভেতর জেগে উঠতেন। নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরতেন ট্রাওজার। ‘নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু’; ‘শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্ত জবা’ এমনকি তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস ‘পাক সার জমিন সাদবাদ’ এ যে শ্যামসিদ্ধির মঠ এর কথা বলেছেন। যে মঠ ধ্বংস হলে নায়কের চোখে ভেসে উঠে তাঁর শৈশবের মঠ। ফিরে আসেন মৌলবাদীদের নরক থেকে সূর্যোদয়ের পথে। সেই মঠটিও দেখেছেন শৈশবে। ‘সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে’ উপন্যাসে মাহবুব এর ভাঙ্গন পর্ব শুরু হয়েছিল রাড়িখালেই। হুমায়ুন আজাদের সৃষ্টিশীলতা জুড়ে রয়েছে তাঁর শৈশব। ছবির মতো শৈশব ভেসে উঠতো তাঁর সাহিত্যে। তিনি চাঁদ নিয়ে লিখেছেন, রাতের চাঁদ ছিল প্রিয় সাদা বেলুনের মতো কিংবা পানু আপার ঠোঁটের হাসির মতো। মাছরাঙা নিয়ে লিখেছেন, পুকুরের আকাশে ধ্রুব তারার মতো জ্বলজ্বল করে ঝাপিয়ে পড়ে মাছরাঙা। তার লাল তরোয়ারের মতো ঠোঁট ঢুকে যায় পাবদার লাল হৃদপিন্ডে। পিঠে নিয়ে লিখেছেন, পিঠে তৈরি হচ্ছে: মায়ের আঙুলের ছোঁয়ায় কেমন রূপসী আর মিষ্টি হয়ে উঠেছে চালের আটা। সন্ধ্যের পরে মাটির চুলোয় জ্বলছে আম কাঠের লাল আগুন। যেনো লাখ লাখ গোলাপ লাল হয়ে ফুটেছে চুলোর ভিতর। কচুরিফুলকে বলেছেন, পুকুরের ঝাড়বাতি। লাউডগা নিয়ে লিখেছেন, সব গাছই তো স্বপ্ন দেখে আকাশের কিন্তু লাউডগা স্বপ্ন দেখে দিগন্তের। আজো লাউডগা তার শেকড় ছাড়িয়ে ভিটে পেরিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয় দিগন্তের দিকে- ঘাসের উপর পড়ে থাকে এক দীর্ঘ সবুজ চঞ্চল সুদূর পিয়াসী স্বপ্ন। সরপুঁটিকে বলেছেন, পানির নিচের আলো। মাংসের কবিতা হল সরপুঁটি। রাড়িখাল তাঁকে জীবনভর ডাক পেরেছে। তিনি ডাক ছেড়েছেন রাড়িখাল রাড়িখাল বলে। ১২ আগস্ট জার্মানীতে মৃত্যুবরণের পরে এখন চীর নিদ্রায় শুয়ে আছেন, মিশে আছেন রাড়িখালেই।
বাল্যকাল তাকে সবসময় স্বপ্ন দেখাতো- হয়তো তাঁর মতো বাল্যবিভোর আর কেউ ছিল না বাংলায়। বারবার তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, কেমন ছিলেন বাল্যকালে; কিন্তু দেখতে পান নি। তাঁর ছায়া দেখেছেন: একেকবার তাঁর মুখ ভেসে উঠে, সে দাঁড়ায় বাড়ির উত্তর দিক, পথ দিয়ে হেটে যায়; কিন' দেখতে পেয়েছেন গ্রাম, জল, মেঘ, শিশির, ধান, ঝড়, মাছের লাফ আর মানুষ। তিনিই ছিলেন বাল্যকালে সবচেয়ে সুখী, সবচেয়ে স্বাপ্নিক। ঘাস দেখে তিনি স্বপ্ন দেখতেন, কচুরি ফুল দেখে স্বপ্ন দেখতেন, এলিয়ে পড়া ধান দেখে স্বপ্ন দেখতেন; যদিও রাড়িখাল গ্রামে ওগুলো স্বপ্নের ব্যাপার ছিল না, ছিল বাস্তব। গ্রামে তিনি ছাড়া আর কারো চোখে কচুরিফুলকে মনে হতো না পৃথিবীর সুন্দরতম ফুল, দইকুলির দিকে আর কেউ বিভোর হয়ে তাকায়নি তাঁর মতো; জ্যৈষ্ঠের ভোরে হঠাৎ বর্ষায় তাঁর মতো কেউ পণ্ডাবিত হয় নি। বিদ্যালয়ে সব সময় শুনতের সাফল্যের কথা। বিক্রমপুর ধনীদের এলাকা। এখানে ওখানে ছড়িয়ে থাকে ধনপতিরা। তাই স্বাভাবিক ভাবেই আলোচনা হতো কে কতো বড়ো, কতো ধনী, কতো শক্তিমান হয়েছে, সেসব; কেউ কবি বা লেখক হয়েছেন তা কখনো শুনেন নি। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন কিছু হতে যা কখনো কেউ হতে চায় নি রাড়িখালে। তাঁর ইচ্ছে করতো বিদ্রাসাগর হতে, রবীন্দ্রনাথ হতে। তিনি দেখতে পেতেন বালক বিদ্যাসাগরকে। যে কলকাতার দিকে হাঁটতে হাটতে শিখে ফেলেছে ইংরেজি সংখ্যা, যার কালো রঙ ঝিলিক দিয়ে উঠতো তাঁর চোখে; দেখতে পেতেন বালক রবীন্দ্রনাথকে বন্ধ বারান্দা থেকে যে তাকিয়ে আছে অনন্তের দিকে। নবম-দশম শ্রেণী থেকেই তিনি পুরোনো বাজে কথা বাদ দিতে শুরু করেন, অতীতের দিকে তাকাতে থাকেন গভীর সন্দেহে, ধর্মে কোনো মহিমা খুঁজে পান না, প্রথা থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন নিজেকে; মনে হতে থাকে অতীতের চেয়ে ভবিষ্যৎ অনেক বেশি গুরুত্বপ-র্ণ, অতীতের সব কিছুই মহৎ নয়। তাঁর ভেতর এক মূর্তিবিনাশী জন্ম নিতে থাকে; তখন থেকেই পুরোনোকে, অতীতকে ছেড়ে দিতে থাকেন। তাঁর জীবনে মরে যেতে থাকে প্রথা, বিশ্বাস আর নিরর্থক নির্দেশগুলো। পরে তাই তাকে আকৃষ্ট করে যা অভিনব সৌন্দর্যমণ্ডিত, যাতে রয়েছে অভিনব চিন্তা, যা প্রথাবিরোধী। ২৭ ফেব্রুয়ারী আক্রান্ত হওয়ার ছয় মাস পরে ২৭ আগস্ট রাড়িখালে তাঁর নিজ বাড়িতে সমাহিত করা হয়। যে রাড়িখালকে বুকের মধ্যে ধারণ করে ছিলেন আমৃত্যু। সেই রাড়িখালের বুকেই ঠাঁই নিয়েছেন মৃত্যুর পরে। রাড়িখালের পৈত্রিক ভিটায় শুয়ে আছেন চিরনিদ্রায়। ভালবাসার গ্রামকে তিনি এবং গ্রাম তাঁকে আঁকড়ে ধরে আছে, চীরভালবাসার বন্ধনে।
#মুজিব রহমান

সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০১৮ রাত ১০:৪৬
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৩৬

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

USB Charger এর ভেতরে লুকানো ক্যামেরার ছবিটি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা

ভ্রমণ মানেই নতুন জায়গা দেখা, প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানো... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেই মানুষগুলো কোথায় গেলো

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৬



স্বাধীনতা পরবর্তী, পচাত্তর পরবর্তী সময়ের ঘটনা। পচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। ক্যু হয়েছে দেশে। সামরিক বাহিনীতে সংঘাত। বহু সদস্য হতাহত। জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাঝা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



বর্তমানে জনসংখ্যার বিচারে 'বিহার' ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য।
বিহারের রাজধানী পাটনা। বিহার মূলত দরিদ্র অঞ্চল বলা যেতে পারে। এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা ছিলো মূলত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ক্যাশলেস সোসাইটি এর জন্য কি পারফেক্ট?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



এটা বাংলা কিউ আর কোড। বাংলাদেশ ব্যাংক সকল ব্যাবসায়ীদের বাংলা কিউ আর কোড বাধ্যতামূলক করেছেনভ এটার ভালো দিক ও খারাপ দিক দুইটাই আছে। বাংলাদেশের সিস্টেম, কারিগরি দক্ষতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাহরাম নয়, এমন পুরুষকে কি একজন স্ত্রীলোক নিজের স্তনের দুধ পান করাতে পারবেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:২১

আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: সাহলা বিনতে সুহাইল নবী করীম ﷺ-এর নিকট এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট সালেমের আসাটা আবু হুযাইফা ভালো মনে করছেন না। নবী বললেন:... ...বাকিটুকু পড়ুন

×