
আমাদের আন্দোলনগুলো গণতন্ত্রের জন্য ছিল না বলেই আমাদের অধিকারগুলো সুসংহত হয়নি। সুষ্ঠুধারার গণতন্ত্র ও অধিকার আমরা কি করে দাবি করতে পারি? সম্ভবত আমরা সেটা জোরালোভাবে চাইনি, তাই পাইনি। আমরা বড়জোর ব্যাক্তির বিরুদ্ধে, রা্ষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। বৃটিশ হটাও, পাকিস্তান হটাও, আইয়ুব খান হটাও, এরশাদ হটাও, খালেদা হটাও আন্দোলন করেছি। এসব আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য গণতন্ত্র ছিল না। ফলে এক জনের পরিবর্তে আরেকজন ক্ষমতায় এসেছে কিন্তু গণতান্ত্রিক আচরণ আর আসেনি।
১৭৭০ এর দশকে ফকির ও সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে পরিচালিত ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন ছিল তাদের জীবন বাঁচানোর আন্দোলন। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের বিভিন্ন কারণ ছিল কিন্তু সেখানে গণতন্ত্রের কোন বিষয় ছিল না। সর্বোচ্চ বলতে পারি এগুলো ছিল বৃটিশবিরোধী আন্দোলন। স্বদেশী আন্দোলন এর (১৯০৫-১৯১১) ক্ষেত্রে মুসলমান কৃষকদের সম্পৃক্ততা ছিল নেতিবাচক। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে কলকাতার এলিট শ্রেণির আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। এরপর বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা হতে থাকে।দেশ জুড়ে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আইন অমান্য আন্দোলন চলে।হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হয়। দুটি দলের হাতেই ভারত পাকিস্তানকে দেয়া হয়। ভারত ভাগের সময়ে অনেকগুলো ঐতিহাসিক কিন্তু আঞ্চলিক আন্দোলন দেখি। তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬-১৯৪৭) মুখ্যত সীমাবদ্ধ ছিল উত্তরাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর, দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়ি জেলার উপজাতি, রাজবংশী, সাঁওতাল এবং গারোদের মধ্যে। নানকার বিদ্রোহ সিলেট অঞ্চলের একটি কৃষক-আন্দোলন, যা ১৯৪৯ সালে সংগঠিত হয়। ভূমিদাসদের নানকার বলা হতো। ১৯৪৯ সালে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে সমগ্র নাচোলে তেভাগা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। নাচোলের কৃষকরা বিশেষ করে সাঁওতালরা ছিল এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। টঙ্ক আন্দোলন ১৯৫০ সালে ময়মনসিংহ অঞ্চলের এক ধরনের খাজনা বাতিলের আন্দোলন ছিল। এরপর বাংলার গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন যা মূলত বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা না দেয়ার প্রেক্ষিতে আন্দোলন রূপ নেয় স্বাধীনতা আন্দোলনে এবং বাংলাদেশের জন্ম হয়।
এরপরে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন হয় এরশাদকে সরানোর জন্য। এরশাদের কাছে সুষ্ঠু ভোটের চেয়ে তাকে হঠানোই ছিল মূল লক্ষ্য। এরশাদকে হঠানো গেলেও ১৯৯৬ সালেই গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে দুর্বল করা হয়েছে। আমরা মিথ্যার ফুলঝুড়িই শুনেছি, যা দেখেছি তা বলতে পারিনি, যা হচ্ছে তা স্বীকার করতে পারিনি। মিথ্যার পক্ষেই রয়েছে সিংহভাগ মানুষ। কখনো এ দলে কখনো ওই দলে। বাকিরাও একই রকম। তারা কেউই প্রকৃত পক্ষে গণতন্ত্র চায়নি, ক্ষমতা চেয়েছে। শুধু জনগণই নয়- আমাদের মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, কবি-সাহিত্যিক, পেশাজীবী কেউই দলাদলি ও দালালির বাইরে যেতে পারেনি। তারাও গণতন্ত্র নয়, চায় তাদের সমর্থিত দল ক্ষমতায় আসুক যাতে লুটেপুটে খেতে পারে।
জনগণ সক্রিয় ও সম্পৃক্ত না থাকলে গণতন্ত্র সুসংহত হতে পারে না। আবার জনগণকে সম্পৃক্ত রাখতে না পারলে রাষ্ট্রের অগ্রগতিও জনমুখি হতে পারে না। গণতন্ত্রের যোগ্য হয়ে উঠা সহজ নয়। ব্যাক্তি বদল কোন লাভই নিয়ে আসবে না যদি না জনসম্পৃক্ততার জন্য সুষ্ঠু গণতন্ত্র না আসে, সুষ্ঠু ভোট না আসে।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০২০ রাত ৯:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




