জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যার মামলায় সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকসহ আট জঙ্গির ফাঁসির রায়ের এক সপ্তাহের মাথায় অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার রায়ে পাঁচ জঙ্গির ফাঁসির রায় জঙ্গি দমনে ভূমিকা রাখবে। ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষ হত্যা যে জঘণ্য অপরাধ তা এই রায়ে স্পষ্ট হয়েছে। যদিও এই মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ জনের চার জনই দীপন হত্যা মামলার রায়ে ফাঁসির রায় পেয়েছে। এই রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শফিউর রহমান ফারাবীকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান। ফারাবী হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত না থাকলেও ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে অভিজিৎ রায়কে ‘হত্যার প্ররোচনা দিয়েছিলেন’ বলে তাকে এ মামলায় আসামি করা হয়। সেই অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। ফারাবী নিজে একজন ব্লগার হলেও তার কাজ ছিল উগ্রপন্থা ছড়ানো ও প্রগতিশীল ও অগ্রসর চিন্তার মানুষকে হত্যার উস্কানি দেয়া। এর আগে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী হুমায়ুন আজাদকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। সেটারই বাস্তবায়ন করেছে জঙ্গিরা। ফারাবী ও সাঈদীর মতো আরো অনেক জঙ্গি মতাদর্শের লোক রয়েছে যারা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ না নিলেও হত্যা করতে জঙ্গিদের উদ্বুদ্ধ করে আসছেন।
আমরা ওয়াজে বিভিন্ন বক্তাকে প্রায়ই কতল করার হুমকি দিতে দেখি। তারা রাষ্ট্রীয় আইন বিরোধী বক্তব্য অহরহই দিয়ে থাকেন এবং তা ইউটিউবে প্রচার করেন। প্রগতিশীল মানুষেরা তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে যায় না কারণ তারা ঐ আইনটির বিরুদ্ধে যেখানে মতপ্রকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। তবে মত প্রকাশের নামে যখন কেউ হত্যার হুমকি দিবে এবং তা কার্যকর হবে বা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে তখনতো সে খুনের হুকুমদাতাই হয়ে উঠে।
২০০৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক হুমায়ূন আজাদকে কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে ১২ অগাস্ট তিনি জার্মানিতে মারা যান। একই বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউনুসকে বিনোদপুরের কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ছিল বাংলাদেশে জঙ্গিদের হত্যার সূচনা। হুমায়ুন আজাদ হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলন হয়েছে। উস্কানিদাতাদের আইনের আওতায় আনা গেলে হয়তো পরিস্থিতি বদলাতো। সরাসরি খুনে অংশ নেয়ার চেয়ে উস্কানি দাতাদের ভূমিকাটাই প্রধান হয়ে থাকে এসব ক্ষেত্রে। সমাজে মূর্খজঙ্গিদের মধ্যে এরাই খুন করার ভাবাদর্শ গড়ে দেয়।
২০১৩ সালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর পর সেই রাতে রাজধানীর পল্লবীর বাসার কাছে রাস্তায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার থাবাবাবা অর্থাৎ আহমেদ রাজীব হায়দারকে। রাজীব গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ছিলেন। এরপরই জঙ্গিরা চারটি বছর খুনের উৎসবে মেতে উঠে। ২০১৩ সালে বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান দ্বীপকে কুপিয়ে জখম করা হয়। ৮৩ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। গোপীবাগে গলা কেটে হত্যা করা হয় কথিত পীর লুৎফর রহমানসহ ছয়জনকে। ভিন্নমতের উপর এক অশনিসংকেত নেমে আসে। একের পর এক খুন হতে থাকেন ব্লগার ও ভিন্নমতের মানুষেরা। ২০১৪ সালে সাভারে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার আশরাফুল আলমকে। রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় গলা কেটে হত্যা করা হয় টেলিভিশনে ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নুরুল ইসলাম ফারুকীকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শফিউল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
২০১৫ সালটি ছিল মুক্তমনা মানুষের জন্য বিভীষিকাময়। সূচনা হয় অভিজিৎ রায়কে দিয়েই। একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চাপাতির কোপে মারা যান তিনি। হামলায় গুরুতর আহত হন তার স্ত্রী। এরপরই ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় নিজের বাসা থেকে বের হওয়ার পর রাস্তায় খুন হন অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবু। সিলেটে বাসা থেকে বেরিয়ে অফিসে যাওয়ার পথে একই ধরনের হামলায় খুন হন আরেক মুক্তমনা ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ। তিনিও গণজাগরণ মঞ্চে যুক্ত ছিলেন। দিন-দুপুরে ঢাকার পূর্ব গোড়ানের এক বাসার পঞ্চম তলার বাসায় ঢুকে হত্যা করা হয় গণজাগরণ মঞ্চের আরেক কর্মী নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়কে। অভিজিৎ রায়ের বইয়ের দুই প্রকাশনা সংস্থার কার্যালয়ে। লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় ফয়সল আরেফিন দীপনকে।
ব্লগার ছাড়াও ভিন্নমতের কারণে সালাফিপন্থীরা সুফিবাদী দর্শনের মানুষকে খুন করে। একাধিক মাঝারে হামলা চালিয়ে ফকির/দরবেশ/খাদেমদের হত্যা করা হয়। গুলশানে ঢুকে ইতালীয় নাগরিককে হত্যা করে। রংপুরে খুন হন একজন জাপানি নাগরিক। ঈশ্বরদীতে খুন হন একজন চার্চের ফাদার। রাজধানীর বাড্ডায় নিজের বাড়ির খানকা শরিফে খুন হন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খিজির খান। ঢাকায় গাবতলীতে একটি তল্লশি চৌকিতে পুলিশের এক এএসআইকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। রাজধানীর হোসাইনী দালানে শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির মধ্যে ফাটানো হয় গ্রেনেড। এতে দুজন নিহত হন, আহত হন শতাধিক। সাভারের আশুলিয়ায় তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় শিল্প পুলিশের এক কনস্টেবলকে। রংপুর শহরে বাহাই সম্প্রদায়ের এক নেতাকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায় মোটরসাইকেলে আসা তিন হামলাকারী। ঢাকা সেনানিবাসের প্রবেশমুখে তল্লাশি চৌকিতে দায়িত্বপালনকালে মিলিটারি পুলিশের সদস্য ল্যান্স কর্পোরাল সামিদুল ইসলামকে হত্যার চেষ্টা হয়। দিনাজপুরে পিয়েরো পারোলারি নামে এক ইতালীয় পাদ্রীকে হত্যার চেষ্টা হয় গুলি করে। মাগরিবের নামাজের সময় বগুড়ার শিবগঞ্জের হরিপুরে শিয়া মসজিদে ঢুকে গুলি চালানো হলে মুয়াজ্জিন নিহত হন, আহত হন আরও চারজন। দিনাজপুরের কাহারোলে ঐতিহ্যবাহী কান্তজিউ মন্দির প্রাঙ্গণে এক মেলায় বোমা হামলা হয়। বগুড়ায় ইসকনের এক মন্দিরে ঢুকে গুলি ও বোমা হামলা চালানো হয়। চুয়াডাঙ্গায় খুন হন স্থানীয় বাউল উৎসবের এক আয়োজক। চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর ঘাঁটি ঈসা খাঁ মসজিদে জুমার নামাজের সময় আত্মঘাতী হামলা হয়। এ ঘটনায় ছয়জন আহত হন। রাজশাহীর বাগমারায় আহমদিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় একজন নিহত হন, আহত হন বেশ কয়েকজন। দেশ যেন এক ভয়ঙ্কর নরকে পরিণত হয়। দেশ ছাড়তে থাকে প্রগতিশীল মুক্তচিন্তার মানুষেরা। একই সাথে বহু মেধাবী মানুষও দেশ ছাড়ে।
২০১৬ সালেও চলতে থাকে উগ্রপন্থীদের খুনের উৎসব। রাজধানীর সূত্রাপুরের একরামপুর মোড়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজিমুদ্দিন সামাদকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করীম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। কুষ্টিয়ায় হামলার শিকার হন হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক মীর সানোয়ার রহমান ও তার বন্ধু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুজ্জামান। একটি মটরসাইকেলে করে আসা তিন হামলাকারী ধারালো অস্ত্র দিয়ে সানোয়ারকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ বছরই সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে।চারজন পুলিশ কর্মকর্তা, ১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ ২৮ জন মানুষ খুন হন। এরপরই সরকার কঠোর হতে বাধ্য হয়। জঙ্গিদের দমাতে একেরপর এক কঠোর কর্মসূচি তাদের চাপের মুখে ফেলে দেয়। জঙ্গিরা স্থিমিত হয়ে এলেও তাদের খুনখারাবি একেবারেই বন্ধ হয়নি। ২০১৮ সালের ১১ জুন মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার কাকালদি গ্রামের একটি ওষুধের দোকানের সামনে চারজন অস্ত্রধারী মটর সাইকেলে করে এসে গুলি করে হত্যা করে প্রকাশক ও লেখক শাহজাহান বাচ্চুকে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
২০১৩ থেকে দীর্ঘ সময় আমাদের বেশ কয়েকজন পীর ও ওয়াজের বক্তা জিহাদী বক্তব্য দিয়েই খুনিদের সৃষ্টি করেছেন। সমাজে এমন একটা ভাবাদর্শ তৈরি করেছেন যে- ব্লগার/মুক্তচিন্তার মানুষকে হত্যা করতে পারলেই বুঝি বেহেস্তে যাওয়া যাবে। হলি আর্টিজানের খুনিরা বলেছে, ‘আর মাত্র কিছুক্ষণ পরেই আমরা সরাসরি বেহেস্তে চলে যাবো। সেখানে হুরপরীরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে’। বাচ্চু ভাইর খুনিদের মধ্যে ৫জন ক্রস ফায়ারে মরেছে। দুজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে শুনেছি- খুনিরা বন্দুকের মুখেও হাসতে হাসতে বলতো, গুলি করেন। মরলেইতো বেহেস্তে চলে যাবো। হুরপরীরা অপেক্ষা করছে। এই মতাদর্শ কারা প্রচার করছে তা আমরা জানি। ইউটিউবে এমন বক্তব্য অহরহই শোনা যেতো। তারা লাফাইয়া, চিল্লাইয়া কল্লা ফালাইয়া দেয়ার ঘোষণা দিতো। যাদের ঘোষণায় দেশে এমন বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সেই বক্তাদের কাউকেই বিচারের আওতায় আনা যায়নি। হয়তো তারা মাওলানা, মুফতি, হুজুর বলেই এসব হত্যার হুমকির ঘোষণা দেয়ার পরেও আইনের আওতায় আনা হয়নি। হুজুর নয় বলেই হয়তো ফারাবীকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। তবুও ভাল যে, খুনের জন্য উস্কানি দেয়ার জন্য অন্তত একজনকে বিচার করার মুখে পড়তে হল। এতে দেশে শতশত উস্কানিদাতা গণ্ডমূর্খ মৌলবাদীরা উস্কানি দেয়া বন্ধ করবে। যারাই উস্কানি দিবে তাদেরই আইনের আওতায় আনা দরকার। খুনের হুমকি দেয়া কখনোই মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১ রাত ৯:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


