




অনেকদিন পর চাপা কষ্ট আজ বলছি...
আমার ১০ মাস বয়সের মেয়ের গালে একটি দাত উঠেছিলো। তাই সে হাতের মাথায় যা পেতো সেইটা ধরে গালে দিয়ে কামড়ানোর চেষ্টাকরতো। গতবছর (2013) ২৪ শে সেপ্টেম্বর তারিখে সকাল নয়টার সময় আমার বড়মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাবো বলে ১০ মাস বয়সের ছোট মেয়েকে কোল থেকে নামিয়ে বাথরুমে গিয়েছিলাম। সে সময় ও ক্যালকুলেটরের ৫০ পয়সার সমান একটি ব্যাটারি পেয়ে খেয়ে পেলে। আমি বড় মেয়েকে নিয়ে বাইরে চলে যাই। ওর মা ওকে খেচুড়ি খাওয়াতে গেলে ও খাবার খেতে চায়না। বমি করে। তখন ওর সন্দেহ হলো কিছু একটা খেয়েছে। গালের ভিতর আঙ্গুল দিয়ে পরীক্ষা করলো। কিছু না পেয়ে আবার খাওয়াতে গেল তখনো খেতে পারলোনা। পরে পানি আর দুধ দিতে লাগলো খেতে। আমি ১১টার পরে বাসায় এসে জানতে পারি। কিন্তু কি খেয়েছে সেটা জানতে পারিনি। আমরা ধারনা করেছিলাম চুল, কিংবা মোমরং খেতে পারে। একজন ডাক্তারের সাথে ফোনে কথা বললাম ডাক্তার বললেন। দুশ্চীন্তার কিছু নেই যদি কিছু খেয়ে থাকে তাহলে পায়খারার সাথে বেরিয়ে যাবে। আমরা অপেক্ষা করতে ছিলাম। বিকালে মেয়ের গলার ভয়েস ভেঙ্গে গেলো। তখন হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের নাক কান গলা বিভাগের ডাক্তার প্রফেসর দৌলতুজ্জামান সাহেবের সাথে ফোনে কথা বলি তিনি আমাকে সন্ধ্যায় মালিবাগের মেডিনোভায় নিয়ে যেতে বলেন। আমরা সন্ধ্যায় মেডিনোভায় গিয়ে এক্সরে করে জানতে পারি সে ব্যাটারি খেয়েছে। ডাক্তার পরেরদিন সকালে হলিফ্যামিলিতে যেতে বলল এবং সকাল ৮টার সময় অজ্ঞান করে গালের ভিতর দিয়ে ব্যাটারিটি বের করে আনেন। ১ ঘন্টা পর আমাদের ছেড়ে দিলেন আমি মেয়েকে নিয়ে বাসায় চলে যাই। সারাদিন মেয়ে ঘুমায়চ্ছিল তখন ওর বুকের ভিতর গরগর শব্দ করতেছিলো। রাতে ফোনে ডাক্তারের সাথে কথা বলি। ডাক্তার আবার পরেরদিন সকালে নিয়ে যেতে বললেন। পুনরায় পরেরদিন সকালে মেয়েকে নিয়ে গিয়ে এক্সরে করি কোন প্রকার সমস্যা পেলেন না। আবার বাসায় চলে যেতে বললেন। বাসায় চলে গেলাম কিন্তু বুকের ভিতর গরগর শব্দ কমে না। পরে ডাক্তার আমাকে সেগুন বাগিচার বারডেম হাসপাতাল-২ গাইনি ও শিশু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর তাহমিনা বেগমের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। ঠিক সেই সময়ে ডা: তাহমিনা জিটিভিতে আমার প্রযোজিত হ্যালো ডাক্তার অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে আসলেন। অনুষ্ঠানের ভিতরও আমার মেয়েকে নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো। পরে উনি বারডেমে নিয়ে যেতে বললে আামি পরে উনার কাছে নিয়ে গেলাম মেয়েকে। উনি প্রথমে আমার মেয়েকে দেখে বাসায় চলে যেতে বলেছিলেন পরে বললেন বারডেমে ভর্তি করতে। এরপর আমার মেয়ে ভর্তি হয়েছে সকাল ১০টায়, ১১টার সময় স্যালাইনসহ সমস্থ ওষুধ কেনা হলো। সেই স্যালাইন পুষ করা হয়েছে বিকাল ৪টায়। এই দীর্ঘ সময় শুধু ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ক্লাস করতে দেখেছি বিখ্যাত এই প্রফেসরদের । এভাবে ২দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমার মেয়ের শারীরিক কোন উন্নতি না হওয়ায় আমি নিজে থেকে ডাক্তার দৌলতের সাথে ডাক্তার তাহমিনার মোবাইলে কথা বলিয়ে দিই। এরপর উনি শাহবাগের বারডেমের নাক কান গলার প্রধান ডা. জহিরের কাছে পাঠালেন। তিনি এফওএল পরীক্ষা করে বললের যেখানে ব্যাটারিটা ছিলো সেখানে লাল দেখাচ্ছে। তিনি চিকিৎসা দিলেন। এর ২দিন পর অক্টোবর ০২, ২০১৩ তারিখ সকালে আমার চোখের সামনে বুকে কফ আটকে ছটপঠ করতে করতে মারা গেলো।
একটা ইনজেকশন পুষ করবার মতো কোন লোক পাওয়া যায়না। অথচ সারাক্ষন ওয়ার্ডে ২০ জনের অধিক ছাত্রছাত্রী একসাথে একটি জরুরী রোগীকে ঘিরে পড়াশুনা করতে থাকে। রোগী ও রোগীদের পরিবার পরিজনের কোন আবেগ তাদের কাছে প্রাধান্য পায় না। এই পড়াশুনায় মনোযোগি থাকে হয়তো ৪-৫জন বাকিরা থাকে তাদের ব্যাক্তিগত আলাপ আলোচনায়রত। তাদের মুখে রোগীর জন্য সমবেদনা থাকেনা। থাকে অন্যরকম রোমান্টিকতা। যা তারা আলোচনা করে সেটা কেবল কানে শোনা যায় কিন্তু মুখে বলা যায় না। আসলে সেটা তাদের বয়সের তাড়না।
ঐ সময়ে ১৭জন রোগীর জন্য একজন নার্স ছিলো । নার্সদের সাথে কথা বলতে গেলে ধমকানি। ইন্টারনি ডাক্তারদের সাথে কথা বলতে গেলে ধমকানি। আবার বারডেম-২ এ মহিলা ও শিশুদের জন্য সংরক্ষিত বলে পুরুষ মানুষ প্রবেশ করা যায় না। আমার স্ত্রী ডেকে ডেকে একজন নার্স পাযনা একজন ডাক্তার পায়না। আমাকে এই সমস্যাগুলো বলতেছিলো এমন সময় সাড়ে পাঁচফিট লম্বা হাতির মতো দেখতে মহিলা সিকিউরিটি এসে আমাকে বের করে দিলো। আমি চোখের সামনে বারডেমের ডাক্তারদের অবহেলা ও আমার মেয়েকে মরে যেতে দেখেছি। আমার মেয়ে মারা গেছে তাকে আইসিইউতে নিয়ে গেলো। আমি হার্টে রিং পরা মানুষ, আমার মা অসুস্থ্যবৃদ্ধা হতবিহব্বল ২টি প্রাণি। খালি বেডের উপর মা আর চেয়ারে আমি বসা সেখান থেকেও আমাদের বের করে দিয়া হলো। আর নানা ভাবে আমাদেরকেই দায়ী করা হচ্ছিল। কিভাবে ব্যাটারিটা খেলো। ঘা এর উপর নুনের ছিটা। আমার মেয়ে মারা যাবার পর আমাকে জানানো হয় এখানে বারডেমে আইসিইউ ব্যবস্থা ভালো না। স্কয়ার বা শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান। আমি তখন চিৎকার করে বললাম আপনাদের যা ক্ষমতা আছে তাই দিয়ে আমার মেয়েকে বাচান প্রয়োজনে যেখানে খুশি সেখানে নিয়ে যান আমার কাছে নগদ পাঁচলাখ টাকা আছে আরো প্রয়োজন হলে জিটিভি থেকে লোন নিবো।আমার বাড়ী জমিজমা অনেক কিছু আছে। যেকোন কিছুর বিনিময়ে আমার মেয়েকে বাচান। এর মধ্যে আমার কিছু বন্ধুজন ও জিটিভির কলিগ গিয়ে বারডেমে হাজির হয়। তখন তারা আমার মেয়েকে মৃত ঘোষনা করে। আমার জিটিভির উচ্চপদস্থ সকল কর্মকর্তাসহ শতাধিক কর্মী বারডেমে চলে আসে।তখন তাদের সামনে শুধু দুঃখপ্রকাশ করেন প্রফেসর ডা. তাহমিনা বেগম। আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়ে গেছে এমন। তখন আমার স্ত্রী একবার বলতে গিয়েছিলো ডাক্তার আর নার্সদের অবহেলার কারনে আমার মেয়ে মারা গেছে। তখন আমি তাকে অনেক কষ্টে সামলাই। কারণ ঐ সময় এই ধরনের কথা্ আমার স্ত্রী বললে পুরো হাসপাতাল ভাংচুর হয়ে যেতো আমার শতাধিক সহকর্মী উপস্থিত ছিলো হাসপাতালে। আমার সকল সহকর্মীরা আজও বলে ডাক্তারদের অবহেলার কারনেই আমার মেয়ে মারা গেছে। আসলে আপনি যদি ডাক্তারও হোন তাহলে আপনিও ডাক্তারকেই দায়ী করবেন।
৯দিন অসুস্থ্য থাকার পরও আমার মেয়ের গায়ের ওজন কমেনি। মারা যাবার ১০ মিনিট আগেও আমার মেয়ে খা্টের উপর বসে হেসেছে আমার সাথে কথা কলেছে। আমার কোলে উঠে সে ছাদে যেতে চেয়েছে। সে হাসপাতারের বাইরে যেতে চেয়েছে। তার হাতের ক্যানোলা দেখিয়েছে। সেখানে সে অস্বস্থি বোধ করছে। আমার তখন মনে হচ্ছিল যাই ওকে নিয়ে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। নার্স এসে ওকে শুইয়ে দিতে বলল। আমি বেডে শুয়ে দিলাম স্যালাইনটা চালু করে দিলো। একটা কাশি উঠলো। কফ বুকে আটকে গেলো মেয়ে কাঁশতে কাঁশতে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো। পরে চেপেচুপে শ্বাস পেলেও আইসিইউতে গিয়ে দক্ষ লোকবলের অভাবে আর ফিরে এলো না।
আমার মেয়েকে যারা চিকিৎসা করেছে....
প্রফেসর ডা. দৌলতুজ্জামান, নাক কান গলা, হলি ফ্যামিলি।
প্রফেসর ডা. তাহমিনা বেগম, গাইনি অবস ও শিশু বিশেষজ্ঞ, বারডেম-২
প্রফেসর ডা. জহির নাক কান গলা, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল
এছাড়া বারডেম-২ এর সংশ্লিষ্ঠ সকল ডাক্তার আমার মেয়েকে চিকিৎসা করেছে।
কিন্তু সেই ডাক্তারদের কাছে আমার প্রশ্ন যখনি আপনারা আমার মেয়েকে দেখেছেন সবাই বলেছেন না তেমন কিছু হয়নি। এ সামান্য বাপার। এক দু দিনের মধ্যে সুস্থ্য হয়ে যাবে। তাহলে সে কেনো মারা গেলো? সে কেনো এভাবে মারা গেলো? সে কেনো সু চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেলো? আমারতো অর্থভাব ছিলো না তারপরও কেনো ওকে এভাবে মরতে হলো্? বড়ো বড়ো ডিগ্রিধারী ডাক্তার আপনারা, বারডেম এতো বড় হাসপাতাল, অত্যাধুনিক সকল ফ্যাসিলিটি থাকা সত্বেও কেনো এমন হলো। মানুষ মরণশীল। জন্মনিলে মরতে হবে। তাই বলে আমার মেয়ের সু চিকিৎসা দিতে পারবো না। আমার মোবাইলে ১০০ জনের উপরে প্রফেসর লেবেলের ডাক্তারদের নাম ও মোবাইল নাম্বার সেভ করা। প্রতিদিন আমার হ্যালো ডাক্তার অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে টিভি পর্দায় আসার জন্য ফোন করতে থাকে ডাক্তার ও সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান থেকে। ডাক্তাররা কবে রোগীদের বন্ধু হবে!
সবার জন্য আমার একটা অনুরোধ: ডাক্তাররা দয়ামায়হীন হয়, কোন জরুরী রোগীকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিবেননা। ওরা রোগীকে নিয়ে ছাত্র পড়াবে। রোগী ও রোগীর পরিবার পরিজনের আবেগ অনুভুতিকে ওরা মূল্যায়ন করবেনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

