
ইতালীর রাজধানী রোমে গিয়েছিলাম গত মাসের ১৯ তারিখ। তবে এটা খুব বড় একটি সত্য কথা যে, আমি রোমের থাকার প্রায় ৩ দিনের মধ্যে প্রথম দিন সন্ধা ব্যতীত আর বাহিরে বের হওয়া হয় নাই।
কারন টা খুব সহজ। গত ১৯ তারিখ তার্কিশ প্রধানমন্ত্রী সফর করেছিলেন বাংলাদেশে। ১৩ তারিখ সকালে ইস্তানবুল থেকে ফোন আসে, "তুমি কি আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে ওয়ারশাও থেকে ইস্তানবুল আসতে পারবা?" "কিন্তু কেন?" আমি প্রশ্ন করলাম। "প্রধানমন্ত্রী যাবেন বাংলাদেশে। তোমাকে কভারেজে সেখানে পাঠাতে চাই"
"আচ্ছা আমি একটু ভেবে জানাচ্ছি"।
ট্রিপের টিকেট আমার কেনা ছিল আরো অনেকদিন আগে। ঠিক প্রধানমন্ত্রী যেদিন যাবেন তখনই আমার আমার ট্রিপ। সব প্লান ভেস্তে যাবে আমার। যদি আমি এখন বাংলাদেশে যাই। অনেক ভেবে তাদেরকে জানালাম, "আচ্ছা আমি যদি ১/২ জন লোক দিয়ে সেখানের কাজ তুলে আনি কেমন হবে এটা। যেমন তারা আমাকে তথ্য দিলে আমি সেটা তার্কিশ করে নিউজ পাঠিয়ে দেব। সাথে ফুটেজ আর ছবি"। উনারা রাজী হলেন। আমিও বাংলাদেশে ১ জনকে কাজের দায়িত্ব দিলাম। আর এটাই ছিল আমার ইতালীতে না ঘুরতে পারার কারন।
কারন, ২ দেশের সময়ের তফাত ৫ ঘন্টা। এখানের রাত তো সেখানে দিন। সব মিলে কাজের প্রেশারে আর ২ দিনে কম্পিউটার এর সামনে থেকেই উঠা হল না।
প্রথম রাতে বের হয়েছিলাম। দুই একটা ছবি তোলা আর কি। নইলে এই মাটিতে যে আমার চরন পরিয়াছে তাহার প্রমান কি!
বিখ্যাত Colosseum এলাকায় ঘুরছিলাম। রাত তখন প্রায় ৮ টা। ৮ টা দেখে অনেকে বলবেন ভাই এটা তো সন্ধা। আসলে তা নয়। কারন সেখানে সন্ধা হয় ৩ টায়। আশে পাশে আমার চামড়ার অনেক মানুষ দেখতে পেলাম। কেউ ইন্ডিয়ান কেউ আবার বাংলাদেশী। তারা লেজার লাইট, কিংবা Colosseum এর আলোকচিত্র বিক্রি করছিল।
Colosseum মেট্রো ষ্টেশনের সামনে ৩ জন বাংলাভাষী মানুষ এর একটা জটলা দেখতে পেলাম। কাছে না যাওয়ার আগে বুঝতে পারছিলাম না তারা কি বাংলাদেশী। কারন কলকাতার অনেক মানুষও এখানে আছে।
"কিরে তোর কী একটাও গেল" তারা আঞ্চলিক ভাষায় বলছিল। আমি সেতা এভাবে বুঝলাম।
"১ টা গেছে" একজন বলল।
"আমার একটাও যায় নাই" ৩য় জন বলল।
আমি কাছে এগিয়ে গেলাম। সালাম দিলাম। কুশলাদী বিনিময় করলাম।
আপনারা বাংলাদেশের কোন এলাকার মানুষ?
আমি চাঁদপুরের। আমি বিক্রমপুর। আমি লক্ষ্মিপুর। তারা তিনজন জবাব দিল।
তাদের কাস্টমার এসেছে। ২ জন চলে গেলেন। থেকে গেলেন চাঁদপুরের ভাই। বয়স ৬৫ ছুঁই ছুঁই।
কবে এসেছেন এখানে?
আমার বাজান অনেক দিন। সেই ৯০ এর দশকে এসেছি।
বাড়ি যান কত দিন পর?
শেষ বছর পাঁচেক আগে গিয়েছিলাম।
দেশে কে আছে?
সবাই আছে। বড় ছেলেটা তোমার মত। পড়ে। আর মেয়ে আছে ৩ জন। তোমার ভাবী আছে।
সন্তানরা কি লেখা পড়া করে না?
হাঁ। সবাই পড়ে বড় ছেলে ভার্সিটিতে যায়। আর মেয়ে একটা এই বছর আই এপাশ করছে। একটা মেট্রিকে আর একটা ছোট।
আপনি এত বছর বিদেশে আছেন পরিবার ছেড়ে। এত কষ্ট করতেছেন !
কি করার বল। ছেলে গুলারে মানুষ বানাইতে হবে তো।
আবার দেশে কবে যাবেন। ঠিক নাই। দেখি কিছু টাকা জমানো যায় কিনা। এরপর যাব।
আপনার বোধায় কাস্টমার এসেছে। আমি ডিস্টার্ব না দেই।
আরে না। কিসের ডিস্টার্ব। তোমার শীত লাগবে তো মাফলার পর নাই। আমাকে বলল।
আমার ভাই অভ্যাস আছে। আমি বললাম। আমি তবে এবার যাই। দোয়া করবেন। আচ্ছা বাবা। ভাল থাক। বড় হও।
উনার সাথে আমার কথা ছিল আঞ্চলিক ভাষায়। সবার বোঝার সুবিধার জন্য আমি সেটা প্রচলিত বাংলায় লিখেছি।
আমি চলে এলাম। আর চিন্তা করছিলাম এই লাইটওয়ালা কথা। যার লাইটের আলো এত তেজস্বী যে, সেটা সেই সূদূর রোম থেকে বাংলাদেশের চাঁদপুরে ছেলেদের মানুষ করতে আলো দেয়।।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



