somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রহস্যময় যাত্রী

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১৪ সকাল ৮:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রহস্যময় যাত্রী
-জামাল সৈয়দ

ড়ালেখা করে যে গাড়ী-ঘোড়া চড়ে সে। ঘোড়াতে চড়ার দিন প্রায় শেষ। আর গাড়ীতে চড়া ছাড়া মানুষের যাতায়াতের খুব বেশী একটা বিকল্প নেই। ছোট বেলায় বাবার একমাত্র হুমকি ছিল পড়ালেখা কর। পড়ালেখা না করলে সারাজীবন রিকশা চালাতে হবে। এই হুমকি বা ভয় এতবার শুনতে হয়েছে যে কল্পনা জগতে এক সময় নিজেকে রিকশা চালকের আসনে দেখতে শুরু করি। নানান রঙ দিয়ে সাজানো আমার রিকশা। রিকশার দুই পাশে সাদা অক্ষরে লিখা ‘মায়ের আশীর্বাদ’। বাবার কথামতো পড়ালেখা না করে আমি হই রিকশাচালক। আর মায়ের আশীর্বাদে রিকশার মালিক। বড়ই অদ্ভুত এই দুনিয়ার কেরামতি। আমার রিকশার উল্টো দিকের নিচে বাংলা সিনেমার একটা রঙ্গিন পোস্টার আঁকা। শুক্কুর মিস্ত্রীর নিজের হাতে আর্ট করা। নায়িকা ববিতা পানি ভর্তি একটা কলসী কাঁধে নদী থেকে মেঠো পথে বাড়ী ফিরছে। অদূরেই একটা বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে নায়ক রাজ্জাক দাঁড়িয়ে। বাঁশি বাজাচ্ছে। ববিতার মুখে শাড়ীর আঁচল। লাজুক লাজুক চেহারা। তবে ববিতার গাল আর চোখ দুটো একটু বেশী ফোলা ফোলা।
রিকশা নিয়ে আমি ঢাকা শহরের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় ঘুরে বেড়াই। আমার যাত্রী হয় এক রূপবতী বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নারী। রিকশার হুড খোলা থাকায় পাগলা হাওয়ায় তার মাথার চুল আকাশে উড়ে বেড়ায়। সেই চুলের মিষ্টি গন্ধে চারিদিকে একটা মাতাল মাতাল ভাব সৃষ্টি হয়। রাস্তার মানুষ জনের দৃষ্টি থাকে আমার রিকশার দিকে। আমি বীরদর্পে রিকশা চালাতে থাকি। তারপর হঠাৎ শুরু হয় বৃষ্টি। আমি তড়িঘড়ি করে রিকশা থামিয়ে রিকশার হুড উঠিয়ে দিতে যাই। কিন্তু রূপবতী যাত্রী আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে হুড উঠাবার প্রয়োজন নেই। সে আজ বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাসায় যাবে। আমি নতুন উদ্যোমে রিকশায় পা চালাই। ঝড়ো হাওয়ায় এদিক ওদিক গাছ গাছালির ডাল-পালা রাস্তার পাশে পড়ে থাকে। বৃষ্টির পানিতে ঢাকা শহরের রাস্তা-ঘাট ঢাকা পড়ে। চারিদিকে নেমে আসে আঁধার। আমি তার মধ্যেও রিকশা চালিয়ে যাই। বৈরী আবহাওয়ার প্রতি আমার যাত্রীর লেশ মাত্র ভয় নেই। মনে হয় সে ভয়কে জয় করতে শিখেছে। যাত্রীর সাহস দেখে আমি মনে মনে খুশি হই। তাকে উৎসর্গ করে একটা কবিতার দুটি লাইন মনে মনে স্বরণ করিঃ

“চারিদিকে বইছে যখন বৈরী হাওয়া
ঠিক তখুনি তোমার কাছে আমার চাওয়া”।

এই কবিতার কবি কে আমি তা জানি না। তাতে কি আসে যায়। রিকশাওয়ালারা অনেক কিছুই যানে না। জানবার প্রয়োজনও নেই।
হঠাৎ করে খুব জানতে ইচ্ছে করো যাত্রীর পরিচয়। কিন্তু রিকশাওয়ালা বলে অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারি না। তার নামটাও জিজ্ঞেস করবার দুঃসাহস নেই। আমি হলাম রাস্তার রাজা। বৃষ্টিবাদল, ঠাণ্ডা গরম বাইরে যাই থাকুক না কেন আমার কাজ মানুষকে নিয়ে ছুটে চলা। বিধাতা আমাকে সেই শক্তি ও সাহস দিয়াছেন বটে। যখন পা চালাই তখন আমার পেশীগুলো বাইরে থেকে বেশ দৃশ্যমান হয়। অনেকটা আঁকা-বাঁকা নদীর মতো। যখন ঘর্মাক্ত হই তখন আমার দু’পায়ের পেশীতে ভেসে উঠে বাংলাদেশের নদি-নালার প্রতিচ্ছবি।

মনে মনে আমি যাত্রীর একটা নাম খুঁজে বেড়াই। কি নাম দেয়া যায় এই রহস্যময় নারীর। আচ্ছা, আগুণী নামটা কেমন? আগুনের মতো সুন্দর দেখতে সে। কিন্তু এখন তো ঝড় হচ্ছে। তার নাম দেয়া যায় তুফানী। তুফানের মতো গতিশীল সে।
মালিবাগের একটা দেয়াল ঘেরা সাদা বাড়ীর সামনে এসে আমার রিকশা থামে। যাত্রী আমাকে একটা পাঁচশত টাকার নোট দিয়ে বলে এখান থেকে তোমার ভাড়া রাখ। আমি বলি এত বড় নোটের ভাংতি নাই। যাত্রী বলে, দুশো টাকা ফেরৎ দিলেও হবে। আমি বলি, ‘আপনিই আমার প্রথম। আমার কাছে কোন ফেরৎ টাকা নাই’। বেশ, ‘তুমি কি আমাকে আবার আজিমপুর নিয়ে যেতে পারবে’। আমি খুশি হয়ে বলি, জ্বি। তাহলে তুমি এই নোটটা রাখ। আর কিছুক্ষন অপেক্ষা কর। আমি একজনের সাথে দেখা করে শীঘ্রই ফিরে আসব।

ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করে আমিও কিছুটা ক্লান্ত। গামছা দিয়ে মাথা ও শরীর মুছে একটু বিশ্রাম নেবার জন্য রিকশার সিটে গিয়ে বসি। অপেক্ষা করি আমার যাত্রীর জন্য। যাত্রীর দেয়া পাঁচশত টাকার বড় নোটটা সযত্নে সিটের নিচে লুকিয়ে রাখি। তারপর রিকশার হুড তুলে একটু মাথা এলিয়ে দিই।
কতক্ষন ঘুমিয়ে ছিলাম মনে নেই। যখন ঘুম ভাঙলো তখন দেখি চারিদিকে অন্ধকারে ঢেকে গেছে। বাতাসে তখনও শুনশান শব্দ। ঝড়ের কারনে শহরের রাস্তাঘাট ও বাড়ী ঘরে কারেন্ট নেই। একটা মা কুকুর এসে আমার রিকশার সামনের চাকার দিকে শুয়ে আছে। মা কুকুরটি বৃষ্টিতে ভিজে জবজবে। তার কোলের উপর একটা বাচ্চা কুকুর মাথা গুঁজে আছে। কিছুটা উষ্ণতা খুঁজছে। আমি ইতস্তত করে সাদা বাড়ীর সামনের গেটে কিছক্ষন পায়চারি করি। কিছুটা ভয় হয়। কেউ যদি আবার চোর ভেবে পুলিশে দেয়। যাত্রী আমাকে ঘুমন্ত দেখে কি চলে গেছে নাকি এখনও বেড় হননি। কতক্ষন পার হয়েছে তাও বুঝতে পারি না। বড় বাড়ীর দোতলার একটা কক্ষ থেকে মোমবাতির টিপ টিপ আলো কিছুক্ষন পর পর ঝিলিক মারে। ওখানেই কি যাত্রী আছে না কি সে অন্য কোথাও চলে গেছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। আমার কাছে তার বড় টাকার নোটটা এখনও আছে। সে তো আমার সাথেই ফিরে যেতে ছেয়েছিল। চারিদিকে নিস্তব্দতা আমাকে বিচলিত করে তলে। আমি উপায়ন্তর না দেখে রিকশায় সিটে গিয়ে বসি। মা কুকুরটি তখনও পরম স্নেহে তার বাচ্চা’কে উষ্ণতার দেয়ালে ঢেকে রেখেছে। রহস্যময়ী নারী ও সাদা বাড়িটিকে পেছনে ফেলে আমি রিকশায় পা চালাই। একসময় অন্ধকারে হারিয়ে যায় সেই বাড়িটি। আমি মলিন মুখে রিকশা নিয়ে বড় রাস্তায় উঠি। আমার মস্তিস্ক জুড়ে খেলা করে রহস্যময় যাত্রী। - (চলবে)

-জামাল সৈয়দ
মিনেসোটা, যুক্তরাষ্ট্র
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১৪ সকাল ৮:৪৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড় কাউকে জয়ী হতে দেয় না

লিখেছেন মুনতাসির, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১১




আমরা প্রায়ই বলি, অমুক এভারেস্ট জয় করেছেন, তমুক কে-টু জয় করেছেন, অমুক অন্নপূর্ণা জয় করেছেন। শব্দটি এতটাই প্রচলিত যে আমরা আর ভাবিই না—আসলে কি পাহাড়কে জয় করা যায়?

আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

৩৫ হাজার টাকা বিনিয়োগে ৩ লাখ ২৭ হাজার টাকা ফেরতের প্রলোভন!

লিখেছেন শাহাবুিদ্দন শুভ, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৩৯

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ওয়েবসাইটের প্রচার দেখা যাচ্ছে, যেখানে প্রথম আলোর আদলে তৈরি একটি ডিজাইন ব্যবহার করে উচ্চ মুনাফার বিনিয়োগের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। এমনকি তৃতীয় মাত্রা অনুষ্ঠানের ফটোকার্ড... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাইক্রোপ্লাস্টিক: অদৃশ্য প্লাস্টিক কীভাবে আমাদের খাবার ও শরীরে ঢুকছে?

লিখেছেন কাবিল, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০৪


মাইক্রোপ্লাস্টিক (Microplastic) হলো খুব ছোট প্লাস্টিকের কণা। সাধারণভাবে ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এর থেকেও অনেক ক্ষুদ্র কণা আছে—সেগুলোকে ন্যানোপ্লাস্টিক বলা হয়। এগুলো এত ছোট হতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এনসিপিকে মারছে কেন? (অথবা) এনসিপি মার খাচ্ছে কেন?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৪০


(ইহা নাকি এনসিপিকে পিষিয়ে মারবে!)

এনসিপিকে মারছে কেন (?) অথবা এনসিপি মার খাচ্ছে কেন? প্রশ্ন দুটো হলেও আদতে প্রশ্ন একটাই উত্তরও একটাই। বিগত ১৫/১৬ বছর অর্থাৎ খুনি হাসিনার আমলে যাহারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই আন্দোলনের সম্ভাবনাময়, রৌদ্রোজ্জ্বল মুখগুলো ডানপন্থার অনুরাগী হচ্ছে! দায় কার?

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৩



জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সেই আইকনিক ফটো--যেখানে দেখা যাচ্ছিল একটা ভার্সিটির ফাস্ট কি সেকেন্ড ইয়ারের মেয়ে পুলিশের গাড়ি আটকাচ্ছে, ওর ভার্সিটির এক বড় ভাইকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×