somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রথম শহীদ মিনার গড়ার দাবি

০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ১১:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাজশাহী—জেলা সদর, বিভাগীয় সদর হিসেবে পরিচিত শহর, নানা অভিধায় খ্যাত। ভাষা আন্দোলন-সংক্রান্ত রাজশাহীর ঐতিহাসিক খ্যাতি প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে—তা যত ছোটই হোক বা অস্থায়ী চরিত্রের কাদা মাটিতে তৈরিই হোক, হোক না কয়েক ঘণ্টা এর স্থায়িত্ব। নাই-বা হলো পূর্ণাঙ্গ, তবু শহীদ মিনার তো বটে। কিন্তু নড়াইলে শহীদ মিনার তো একই দিনে গড়া। সে ক্ষেত্রে কোনটা প্রথম শহীদ মিনার—সেটা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।
রাজশাহীর ভাষা আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন তসিকুল ইসলাম রাজা। তাঁর লিখিত ভাষ্যে দেখা যায়, ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্থাপিত পরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি নাকচ হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় রাজশাহীতে প্রতিবাদ সংঘটিত করে সেখানকার ছাত্রসমাজ।
এই আন্দোলন উপলক্ষে ১১ মার্চ পালিত হয় হরতাল। ভুবনমোহন পার্কে প্রতিবাদ সভা। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে চারদিক মুখরিত, পরিবেশ উত্তপ্ত। ঢাকার মতো এখানে হরতাল সফল করতে চলে পিকেটিং। এখানে যথারীতি মুসলিম লীগ-দলীয় গুন্ডাদের হামলা চলে মিছিলে, পুলিশি হামলা তো আছেই। প্রসঙ্গত, একটি তথ্য—সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এবং বিহারি-অধ্যুষিত শহরগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াশীলতার টান ছিল যথেষ্ট। যেমন খুলনা, রাজশাহী, যশোর বা সৈয়দপুর।
তা সত্ত্বেও আটচল্লিশের মার্চের আন্দোলন সুসংহত ছাত্রনেতৃত্বের দৃঢ়তায় যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাজশাহী কলেজের রাজনীতিমনস্ক ছাত্ররা আন্দোলনের মূল কারিগর, সঙ্গে অন্যান্য শিক্ষায়তন। পূর্বোক্ত ছাত্রকর্মীদের নেতৃত্বে ছিলেন মোহাম্মদ সুলতান, একরামুল হক, গোলাম রহমান, গোলাম তাওয়াব, তোফাজ্জল হোসেন প্রধানসহ কয়েকজন। আর স্থানীয় ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন তসিকুল ইসলাম, আবুল কাশেম চৌধুরী, কসিমুদ্দিন আহমদ, নুরুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান শেলী প্রমুখ।
ভাষা আন্দোলন বলেই বোধ হয় এতে সমর্থন জানান রাজশাহী কলেজের কয়েকজন অধ্যাপক, যেমন মুহাম্মদ আবদুল হাই, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ড. গোলাম মকসুদ হিলালী প্রমুখ। এমনই জানিয়েছেন তসিকুল ইসলাম। তাঁর মতে, রাজশাহীর আন্দোলনে প্রথম পর্যায়ে অন্যতম প্রাণপুরুষ আতাউর রহমানের পর ১৯৪৮-এর শেষ দিকে একরামুল হকও গ্রেপ্তারের পর কাশেম চৌধুরীও আটক। এভাবে মার্চের আন্দোলন শেষ। এরপর ১৯৪৯-এর হাবিবুর রহমান ও সুলতানের ঢাকার উদ্দেশে রাজশাহী ত্যাগ।
এরপর নতুন ছাত্রনেতৃত্বে এস এ বারী, এ টি গোলাম আরিফ টিপু, মহসিন প্রামাণিক, আনসার আলী, আবুল কালাম চৌধুরী, এস এম এ গাফফার (মেডিকেল স্কুলছাত্র) প্রমুখ। ১৯৫০ থেকে ১৯৫২-এর মধ্যে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আটচল্লিশের তুলনায় বিরুদ্ধবাদীদের সংখ্যা কমে আসে। তাঁদের কেউ বাংলার সমর্থক হয়ে ওঠেন।
১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালিত হয়। ওই দিন শিক্ষায়তনগুলোতে ধর্মঘট পালিত হয়। মিছিল শহর পরিক্রমা শেষ করে ভুবনমোহন পার্কে এসে। এখানে বক্তব্য দেন আনোয়ারুল আজিম, মোহসেনা বেগম, মমতাজউদ্দিন আহমদ, মেডিকেল ছাত্র মেসবাহুল হক, ইয়াসিন আলী প্রমুখ।
এর মধ্যে গঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির সভাপতি হন এস এম এ গাফফার এবং সম্পাদক গোলাম আরিফ টিপু। উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন ব্যবস্থাপক সভার সদস্য অ্যাডভোকেট মাদার বক্স। পূর্বোক্ত একাধিক ছাত্র এ কমিটির সদস্য। আরও ছিলেন সাঈদউদ্দিন আহমদ ও প্রভাস লাহিড়ী। আজাদ পত্রিকার প্রতিবেদন মতে হাজারেরও অধিক ছাত্র-জনতা একুশের মিছিলে অংশ নেয়।
আজাদ-এর প্রতিবেদনে লেখা হয়, বিকেল চারটায় ভুবনমোহন পার্কে জনসভা। সভাপতি রাজশাহী কলেজের ছাত্র হাবিবুর রহমান। বক্তা শামসুল হক, আবদুস সাত্তার, বেগম জাহানারা প্রমুখ। ভাষাসংগ্রামী তসিকুল ইসলামের ভাষ্যমতে, সেদিনই ঢাকায় পুলিশের গুলিবর্ষণে হতাহতের খবর আসে এবং জনপ্রতিক্রিয়া ও আন্দোলনের চরিত্র বিচারে পটপরিবর্তন ঘটে।
২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জনসভা ও মিছিলে প্রবল সরকারবিরোধী প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটে। সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, ক্রোধ, ঘৃণা উপচে পড়ে। জনসমর্থন আরও ব্যাপক হয়। হরতালের আহ্বানে ব্যাপক সাড়া মেলে। কারও কারও মতে ২২ ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) রাজশাহীর ভাষা আন্দোলনে একটি বিশেষ দিন।
রাজশাহী সেদিন ছিল মিছিলের শহর। সেই বিশাল মিছিলে হামলা এবং পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড়ের কোনো বিরাম ছিল না। সরকারপক্ষের দৈনিক পত্রিকাও লিখতে ইতস্তত করেনি অনাচারী গ্রেপ্তারের বিবরণ। তাতে দেখা যায়, রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান মাদার বক্স এমএলএসহ ক্যাপ্টেন শামসুল হক, মজিবর রহমান প্রমুখ বিশিষ্টজন এবং ১১ জন ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্বভাবতই আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে রাজশাহী শহর পেরিয়ে আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে প্রধানত শিক্ষায়তনগুলোকে কেন্দ্র করে। রাজশাহী শহরে আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য দিক এতে মেয়েদের অংশগ্রহণ, যা মফস্বল শহরের জন্য কিছুটা হলেও ব্যতিক্রমী ঘটনা। অবশ্য উত্তরবঙ্গের একাধিক শহরে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। রাজশাহী শহরে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রীদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য জাহানারা বেগম, মনোয়ারা রহমান, মোহসেনা বেগম, হাফিজা বেগম, হাসিনা বেগম প্রমুখ। একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনার তৈরির কথা এর আগে বলা হয়েছে।
বায়ান্নর ধারাবাহিকতায় ১৯৫৩ থেকে প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ দিবস পালনও রাজশাহীতে একই রকম উদ্দীপনার। মিছিলের দৃপ্ত পদচারণে স্পন্দিত ও স্লোগানে মুখরিত শহর প্রশাসন ও সরকারি দলকে ভীত করে তোলে। এর পরিণাম দেখা যায় ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে সরকারবিরোধী যুক্তফ্রন্টের একচেটিয়া জয়।

সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ১১:১০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যাটারিচালিত রিকশা , তিন-চাকার যানবাহন ব্যবস্থাপনা, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ, সড়ক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জীবিকা সুরক্ষা এবং সিসা-দূষণরোধ বিষয়ে একটি সমন্বিত নীতিগত প্রস্তাব।

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮


বাংলাদেশের নগর ও শহরতলির পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজি-বাইক ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক তিন-চাকার যান ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের যাত্রীদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম খরচের পরিবহন, বিপুলসংখ্যক চালক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭



ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি কেনা ও নির্মাণের টাকা কোথা থেকে এসেছিল-এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ঘুরেফিরে আসে। উত্তরটা আসলে লুকিয়ে নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয় - দরকার বিকল্প সরকার

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪



জামাতকে সংগঠন হিসেবে নিখুঁত বলা যায়, আলেম হতে হলে দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় - মানে নেতা হবার আগে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে, বিএনপি-লীগের এমন কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলাশেষে

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৪

বাসায় আত্নীয় আসলে চলে যাবার সময় কিংবা তাদের বাড়ী থেকে ফেরার সময় ঘরের ছোট সদস্যের হাতে টাকা গুঁজে দেবার যে চল ছিল নিশ্চই আমরা কম বেশি সবাই সেটা সাথে পরিচিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অসংখ্য মানুষের স্বপ্নের নায়িকা যিনি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:১২



একদিন যে বিয়েকে ঘিরে ছিল পাঁচতারকা হোটেলের ঝলমলে আলো, ক্যামেরার অসংখ্য ফ্ল্যাশ আর শত মানুষের করতালি, সেই সংসারের আকাশেই কয়েক বছরের মধ্যে জমেছিল বিচ্ছেদের মেঘ। ১৯৮৭ সালের মে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×