somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি কেনা ও নির্মাণের টাকা কোথা থেকে এসেছিল-এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ঘুরেফিরে আসে। উত্তরটা আসলে লুকিয়ে নেই কোনো রহস্যে, লুকিয়ে আছে ইতিহাসের সাধারণ, যাচাইযোগ্য নথিতে।

১৯৫৫ সালে শ্রমমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে ধানমন্ডিতে প্লট বরাদ্দের আবেদন করা হয়। ১৯৫৭ সালে গণপূর্ত বিভাগ (পিডব্লিউডি) থেকে ছয় হাজার টাকায় এক বিঘা জমি বরাদ্দ পাওয়া যায়। প্রথমে সেখানে গড়ে ওঠে দুই কক্ষের একতলা একটা বাড়ি, পরে ধাপে ধাপে দোতলা করা হয়। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর নির্মাণাধীন সেই বাড়িতেই পরিবার নিয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু।

সুতরাং ৩২ নম্বরের বাড়ি কোনো রহস্যজনক অর্থে রাতারাতি তৈরি হয়নি। জমির মূল্য, কিস্তি, ঋণ আর ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ- এই সাধারণ পথেই তৈরি হয়েছিল বাড়িটি। প্রশ্ন করা যেতেই পারে, কিন্তু ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন তুললে উত্তরটাও দিতে হয় ইতিহাসের নথি ধরেই।

কিন্তু এই বাড়ির গল্প শুধু ইট- কাঠ-সিমেন্টের হিসাবেই থেমে থাকে না।

১৯৬২ সালের আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর জাতির উদ্দেশে দিকনির্দেশনা- সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই একটামাত্র ঠিকানা। এই বাড়ির উঠোনেই রচিত হয়েছিল একটা জাতির স্বপ্ন।

তারপর এলো ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট - সেই রাতেই এই বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয় ধানমন্ডি ৩২কে। এরপর ছয় মাস বাড়িটি পড়ে ছিল পরিত্যক্ত, ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়।

তারপর এলো ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাত। ভারত থেকে দেওয়া শেখ হাসিনার এক অনলাইন ভাষণের প্রতিক্রিয়া নিতে পারেনি ততকালিন ক্ষণস্থায়ী সরকার, ধানমন্ডি ৩২- এর সামনে। রাত ৮টায় গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকে একদল বাংলাদেশ বিরোধী লালবদর। লাঠি-শাবল হাতে চলে ভাঙচুর, জানালার গ্রিল-কাঠ খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ১১টায় আনা হয় ক্রেন, তাতে কাজ না হওয়ায় নামানো হয় এক্সকেভেটর। রাত পৌনে ১২টা থেকে শুরু হয় চূড়ান্ত ধ্বংসযজ্ঞ- ইতিহাসের সাক্ষী সেই বাড়িটা একটু একটু করে মিশে যেতে থাকে ধ্বংসস্তূপে। এ েযেন বাংলাদেশ নয় মনে হয় পাকিস্তান থেকে ভাড়া করে আনা হয়েছিল সেই হিংস্রদানবদের।

যে বাড়ির দেয়ালে হেলান দিয়ে একদিন একটা জাতি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই দেয়ালই ভেঙে পড়ল বুলডোজারের আঘাতে। যে ঘরে বসে লেখা হয়েছিল ছয় দফার রূপরেখা, সেই ঘরই হয়ে গেল ধ্বংসস্তূপ। ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক আর অসংখ্য সাধারণ মানুষ- যাঁরা এই বাড়িকে চিনতেন শুধু একটা ভবন হিসেবে নয়, একটা জাতির জন্মভিটা হিসেবে- তাঁরা সেই রাতে টিভি স্ক্রিনে চোখ রেখে নীরবে চোখের জল ফেলেছিলেন।

দালান ভাঙা যায়, ইট-কাঠ গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু যে স্মৃতি একটা জাতির কালেক্টিভ চেতনায় গেঁথে গেছে, তাকে মুছে ফেলা যায় কি?

আজ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আর কোনো দালান নেই। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে, ইতিহাসের পাতায়, আর একটা জাতির সম্মিলিত স্মৃতিতে- ৩২ নম্বরের বাড়িটা আজও ঠিক আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের ৭১- কোনো কোনো ক্ষেত্রে রুপকথাও হার মানে‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৫৪



আমাদের উঠানে একটা কবর আছে। কবরটা কার, আমি জানি না।
জানি না, এই কথাটা মিথ্যা। আমি জানি কার। কিন্তু নামটা বললে বিপদ হতে পারে। তাই নাম বলি না।

​শুধু প্রতি বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

লংমার্চ নাকি ‘ফোর-হুইল ড্রাইভ’—ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম!

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৭

জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলের আজকের লংমার্চ—ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা। শুনে মনে হলো, ইতিহাস বুঝি আবার হাঁটতে শুরু করেছে!

কর্মসূচির ছয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিমান যখন ঝরে যায়.........

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭

অভিমান যখন ঝরে যায়.........

আপনারা যারা 'বসন্ত বিলাপ' সিনেমাটা দেখেছেন তাদের কি শেষ দৃশ্যটা মনে আছে? যেখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দেখে অপর্ণা সেন জিজ্ঞেস করছে, "আপনি যান নি?"
সৌমিত্র একগাল হেসে বলছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাকে দিয়ে সেলস হবে না

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫৫

আমাকে বাংলাদেশের এক ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি তাদের সেলসে সহায়তা করার অনুরোধ করেছে। কোম্পানি ভালো, বাজে কোন রেকর্ড নেই। আমার কাজ হচ্ছে, আমার পরিচিত মানুষদের সাথে তাদের মার্কেটিং টিমের যোগাযোগ করায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭



ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি কেনা ও নির্মাণের টাকা কোথা থেকে এসেছিল-এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ঘুরেফিরে আসে। উত্তরটা আসলে লুকিয়ে নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×