জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলের আজকের লংমার্চ—ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা। শুনে মনে হলো, ইতিহাস বুঝি আবার হাঁটতে শুরু করেছে!
কর্মসূচির ছয় দফার মধ্যে আছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ।
দাবিগুলোর মধ্যে শেষের চারটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যান চলে না, গ্যাস না থাকলে চুলা জ্বলে না, দ্রব্যমূল্য বাড়লে বাজারের ব্যাগ হালকা হয়ে যায়, আর আইনশৃঙ্খলা খারাপ হলে মানুষ দরজা-জানালা বন্ধ করেও নিশ্চিন্ত হতে পারে না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই লংমার্চে সেই সাধারণ মানুষ কোথায়?
কর্নেল অলি সাহেব বলেছেন, দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ নাকি এই কর্মসূচির সমর্থনে আছে। কথাটা শুনে মনে হলো, পরিসংখ্যানেরও বুঝি একটা আত্মসম্মান আছে!
দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ যদি সত্যিই পথে নামত, তাহলে শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রাস্তা হয়তো মানুষের ঢলে এমনিতেই অচল হয়ে যেত। আপাতত অবশ্য দৃশ্যপটটা অনেকটা এমন—রাজনীতি আছে, নেতা আছেন, কর্মী আছেন; কিন্তু ‘সাধারণ মানুষ’ নামের সেই রহস্যময় চরিত্রটি কোথায়, সেটাই খুঁজে দেখা দরকার।
জোট বলছে, এটি সরকার উৎখাতের কর্মসূচি নয়; দাবি আদায়ের কর্মসূচি। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, লংমার্চ হবে শান্তিপূর্ণ।
বিএনপির রুহুল কবির রিজভীও বলেছেন, লংমার্চ বিরোধী দলের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে এর মাধ্যমে যেন পরিকল্পিত অচলাবস্থা সৃষ্টি না হয়, সেই সতর্কতাও দিয়েছেন। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সংসদে বিকল্প পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—এক দল লংমার্চ করে, আরেক দল তার গণতান্ত্রিক অধিকার স্বীকার করে, সঙ্গে ট্রাফিক জ্যামের সম্ভাবনাটাও মনে করিয়ে দেয়!
তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ মন্তব্যটি এসেছে এনসিপির নাহিদ ইসলামের কাছ থেকে। তিনি বলেছেন, লংমার্চে বাধা দেওয়া হলে ছয় দফা এক দফায় পরিণত হতে পারে।
২০২৪ সালের ‘এক দফা’র রাজনৈতিক অভিঘাতের পর হয়তো ‘এক দফা’ শব্দটির প্রতি আলাদা এক ধরনের আবেগ তৈরি হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে, ছয় দফা যেন শুধু অপেক্ষা করছে—কখন তাকে এক দফায় নামিয়ে আনা হবে!
আরেকটি বিষয় না বললেই নয়—‘লংমার্চ’ শব্দটিরও কিন্তু একটা ইতিহাস আছে।
চীনের ঐতিহাসিক লং মার্চ বিশ্বরাজনীতিতে একটি প্রতীক হয়ে আছে। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালে ফারাক্কা বাঁধের প্রতিবাদে রাজশাহী থেকে কানসাট পর্যন্ত যে ঐতিহাসিক লংমার্চ করেছিলেন, সেখানে ছিল মানুষের পায়ে হাঁটার কষ্ট, মাটির সঙ্গে মানুষের সরাসরি সংযোগ এবং দাবির প্রতি জনসম্পৃক্ততা।
আর আজকের লংমার্চ?
নেতা-কর্মীরা গাড়িতে, কেউ প্রাডোতে, কেউ অন্য কোনো চার চাকার বাহনে।
সময় বদলেছে। প্রযুক্তি এগিয়েছে। রাজনীতিও আধুনিক হয়েছে।
আগের লংমার্চ ছিল পদযাত্রা।
আজকের লংমার্চ—ফোর-হুইল ড্রাইভ!
ইতিহাসে মানুষ হেঁটেছে মাইলের পর মাইল; আধুনিক রাজনীতিতে মানুষ হাঁটে গাড়ি পর্যন্ত, তারপর গাড়িই হাঁটে মানুষের হয়ে!
তাই আপাতত প্রশ্ন একটাই—এটি কি সত্যিকারের জনসম্পৃক্ত লংমার্চ, নাকি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রাজনৈতিক ‘রোড ট্রিপ’?
শেষ পর্যন্ত লালদীঘির সমাবেশে কত মানুষ আসে, সাধারণ মানুষের কতটা অংশগ্রহণ থাকে এবং ছয় দফার কোন দফা নিয়ে বাস্তব জনমত তৈরি হয়—সেটিই আসল পরীক্ষা।
কারণ রাজনীতিতে মিছিলের গাড়ি গোনা সহজ, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জায়গা হয়েছে কতটা—সেটা গোনার কোনো ওডোমিটার এখনো আবিষ্কার হয়নি।
তাই আজকের অপেক্ষা—
লংমার্চ শেষ হবে, নাকি ‘ফোর-হুইল ড্রাইভ’ রাজনীতির নতুন কোনো মাইলফলক তৈরি হবে?
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



