
শরতের সকাল! সকাল ৮ টা।
ভাদ্র মাস। ইংরেজি সেপ্টেম্বর মাস। ২০২৬ সাল। ঘটনাটা কি হয়েছে, আমি বলি। মোটামোটি ভয়াবহ ঘটনা বলা যেতে পারে! যে কোনো সময় রোদ উঠবে। যদিও আকাশ ভরা মেঘ। শরৎকাল এরকমই। এই মেঘ, এই রৌদ্রছায়া! আমি গুলশান এক নম্বর দাঁড়িয়ে আছি। এত সকালেও লম্বা ট্রাফিক জ্যাম। সুরভি কন্যাকে নিয়ে স্কুলে চলে গেলো। আমাকে নামিয়ে দিলো। আজ গুলশানে আমার কাজ আছে। হাতে সময় আছে। একটা সিগারেট খাওয়া যেতে পারে। চা ছাড়া সিগারেট ঠিক জমে না। কোথায় চা খাবো সেটাই ভাবছি। ফুটপাতের চা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। ওরা অনেক চিনি দেয়। আমার ডায়বেটিকস। রাস্তার ওই পাড়ে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে মেয়েটা অনেক সুন্দর। সহজ সরল প্রানবন্ত সুন্দর! গোলাপি রঙের শাড়ি পরা। দূর থেকে মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে- সমুদ্রের ঢেউ। একজন মানুষ আছে, দেখলেই মনে হয়- সে আমার পরিচিত! আপন আপন লাগে!
আমি রাস্তা পার হলাম। রেস্টুরেন্ট এপাশেই।
এখানেই আমি চা খাবো। মেয়েটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আমি মেয়েটাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। তখন মেয়েটা আমাকে ডাক দিলো- রাজীব। রাজীব সাহেব! আমি থমকে দাঁড়ালাম। কন্ঠটা ভীষন মিষ্টি। মেয়েটা কাছে এসে বলল- কি চিনতে পারোনি? আমি মানুষের মুখ মনে রাখতে পারি না। কিছুদিন দেখা সাক্ষাত না হলেই আমি নাম ঠিকনা সব ভুলে যাই। মেয়েটা বললো- আমার নাম মুনা। মুনা নামের কাউকে আমি চিনি না। মেয়েটা বললো- আমাকে চেনার কথাও নয়। কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ বছর পর আজ তোমার সাথে দেখা! আমার এখনও কিছু মনে পড়ছে না। আমি বোকার মতো মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছি। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। মেয়েটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো- আমার গ্রামের নাম সালথা! তুমি আমার গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলে। ৮ দিন ছিলে। কিচ্ছু ভুলিনি আমি। কি অদ্ভুত দেখো- আমার স্বামীকে ভুলে গেছি। আমাদের ডির্ভোস হয়েছে ৮ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু তোমাকে এক পলক দেখেই চিনতে পেরেছি! ভালোবেসে যারা মরে, আমি তাদের দলে।
কেউ আমাকে একটু অতীত মনে করিয়ে দিলেই, বাকিটুকু আমি নিজেই সব মনে করে নিতে পারি।
হ্যা ৩০ বছর আগে আমি সালথা গ্রামে গিয়েছিলাম বন্ধুর সাথে। বন্ধুর ছোট চাচার বিয়েতে। তখন আমি নতুন কলেজে ভরতি হয়েছি মাত্র। সালথা গ্রামে গিয়েছি। এই গ্রামে অনেক খাল আর বিল আছে মাছে ভরতি। বিয়ে বাড়ি। বিরাট হইচই। অনেক মানুষ। সারাদিন খাওয়া দাওয়া। সারাদিন কোনো রকমে কেটে গেলো। রাতে আমার শোয়ার জায়গা নেই। সবাই বাড়ির উঠানে পাটি পেতে একসাথে ঘুমাবে। আমার মনে হয়েছিলো- দারুন ব্যাপার হবে! মাথার উপর ছাদ থাকবে না। থাকবে খোলা বিশাল আকাশ। নক্ষত্র খচিত আকাশ! কিন্তু ঘুমাতে গিয়ে দেখি, উঠান ভরতি অনেক নারী পুরুষ। আর একপাল বাচ্চাকাচ্চা। হাসাহাসি। শিশুর কান্না। তারা কেউ ঘুমাবে না। সারারাত জেগে থাকবে, গল্প করবে, চা খাবে। কার্ড খেলবে। বন্ধুকে বললাম, এখানে আমি থাকিতে পারিব না। আমাকে অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দাও। বন্ধু আমাকে নিয়ে গেলো মুনাদের বাড়িতে।
মুনা খুব সুন্দর মেয়ে। মাথা ভরতি চুল।
সহজ সরল প্রানবন্ত তার ব্যবহার। মুনার বাবা-মা মানবিক এবং হৃদয়বান মানুষ। আমাকে তারা আপন করে নিলো। মুনার বাবার সাথে দাবা খেলেছি। সালথা গ্রামে আমি দুই দিন থাকার কথা। আমি ৮ দিন থেকে গেলাম। ৮ দিন থাকার কারণ হচ্ছে- মুনা। মুনা আমাকে গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে খাওয়ায়। পুকুরে নিয়ে সাঁতার কাটা শেখায়। বিল থেকে কিভাবে মাছ ধরতে হয়, আমাকে শেখায়। হাটে নিয়ে যায়। হাটে গরম গরম জিলাপী খাওয়ায়। সালথা গ্রামের পাশেই বাতাগ্রাম। বাতা গ্রামে নৌকা বাইচ হবে। মুনা আমাকে নিয়ে যায়। আমি শহরের ছেলে। গ্রামে যা দেখি তা-ই ভালো লাগে। খলিশাডুবী নামে এক গ্রামে আমাকে মুনা নিয়ে গেলো। এই গ্রামে হিন্দু বেশি। খলিশাডুবী গ্রামের স্কুল মাঠে মেলা হচ্ছে। গ্রামের মেলার অন্য রকম সৌন্দর্য আছে। মেলা থেকে আমরা পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছি। শুরু হয়েছে বৃষ্টি! শহরের বৃষ্টি আর গ্রামের বৃষ্টির মধ্যে কিছু প্রার্থক্য আছে। বৃষ্টি মানুষের মনকে তরল করে দেয়।
বিশাল এক বটের গাছের নিয়ে আমরা আশ্রয় নিয়েছি।
মুনা বলল- আমায় বিয়ে করবে? সেই সময় আমি এত চালাক ছিলাম না। প্রেম ভালোবাসা বুঝতে পারতাম না। কারণ তখন মোবাইল ফোন ছিলো না, ফেসবুক, ইউটিউব ইন্টারনেট ছিলো না। শুধু ছিলো বিটিভি। জীবন সহজ সরল সুন্দর ছিলো। জটিলতা কুটিলতা মুক্ত জীবন। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বিশাল বট গাছ আমাদের গায়ে বৃষ্টি পড়তে দিচ্ছে না। আশেপাশে কোনো বাড়িঘর নেই। একটাই মাটির রাস্তা। সেই রাস্তা চলে গেছে মালঞ্চ নদীর দিকে। মুনার কি হলো- কে জানে! সে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। মিথ্যা বলব না, আমার ভীষন রকমের ভালো লাগলো। এ এক অন্য রকমের ভালো লাগা। আমার মা আছে, বোন আছে। কিন্তু মুনা মা বা বোনের মতো নয়। কখন আমরা ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছি জানি না। আমার দুই হাত মুনার কোমরে! জীবনে প্রথম কোনো নারী স্পর্শ! কি যে ভালো লাগলো, সেটা ভাষায় প্রকাশ করিতে পারিব না। মুনা! এই গুলশানের ব্যস্ত রাস্তায় আমি অতীতে ফিরে গেলাম!
আমার সামনে মুনা। সে এখন একজন পূর্ণাঙ্গ নারী।
আমি মুনাকে নিয়ে হান্ডি রেস্তোরাঁ'তে বসলাম। আমাদের সামনে চায়ের গরম কাপ। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। আমরা দুজনেই চুপ। হঠাত আমার মনে হলো- সামনেই আমার কন্যা ফারাজার স্কুল। সুরভি ফারাজাকে স্কুলে দিয়ে অন্য গার্জেনদের নিয়ে এই রেস্টুরেন্টেই আসে। তারা সবাই মিলে এখানেই ব্রেকফাস্ট করে। এখন যদি সুরভি এসে দেখে আমি এক নারীর সাথে রেস্টুরেন্টে বসে আছি। দেখলে দেখুক। মুনার সাথে বসে আছি, এটা কোনো অন্যায় নয়। কিছু কিছু মেয়ে আছে, বয়স বাড়তে থাকলে- সৌন্দর্য বাড়তে থাকে। মুনা আগের থেকে, এখন আরো বেশি সুন্দর হয়েছে। মুনা বলল- প্রথম বার দেখেই আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি। তুমি আমায় চিনতে পারলে না কেন? বললাম, আমার চোখে সমস্যা। মুনা হেসে ফেলল। সুন্দর হাসি। সহজ সরল সুন্দর হাসি। মুনাকে আমার কন্যার কথা বললাম। ছবি দেখালাম। মুনা বিষন্ন গলায় বলল- এই মেয়েটাতো আমারও হতে পারতো।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



