somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি চাইতেই অগ্নিশর্মা, ভারতকে ‘শিক্ষা’ দিতে ১২৭% বেশি খরচে চিনা বিদ্যুৎ কিনছে ‘বুদ্ধিমান’ বাংলাদেশ!” খবরটি আনন্দবাজারের। ভেবে কোনো কুল কিনারা পেলাম না ; বাংলাদেশ আবার কবে চীন থেকে বিদ্যুৎ কিনল?

এত বড় ঘটনা অথচ আমরা কিছুই জানি না! বাংলাদেশ কি গোপনে চীনের সঙ্গে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ করে তৈরি করে ফেলেছে? বঙ্গোপসাগরের নিচ দিয়ে কোনো তার চলে এসেছে? নাকি হিমালয়ের ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ আসছে? এতদিন জানতাম বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনে, এখন দেখছি আনন্দবাজারের ভাষায় চীন থেকেও বিদ্যুৎ কেনা শুরু হয়ে গেছে।

যাই হোক, পুরো খবরটা পড়লাম। আসল ঘটনা হলো সাভারের আমিনবাজারে একটা বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, যেখানে ঢাকার আবর্জনা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ বানানো হবে। শুধু প্লান্টটা বানাচ্ছে একটা চীনা কোম্পানি, যন্ত্রপাতিও তাদেরই। ব্যস, এটুকুই। বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বাংলাদেশের মাটিতে, বাংলাদেশের ময়লা দিয়ে, বিক্রি হবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে। অথচ শিরোনামে লেখা হলো চীন থেকে কেনা বিদ্যুৎ। কী করে যে এরকম একটা জাদু সম্ভব হলো, সেটা বোধহয় আনন্দবাজারের সম্পাদকই ভালো বলতে পারবেন।

আরও লিখেছে, নয়াদিল্লিকে বাদ দিয়ে চিনা বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা। এইটা পড়ে সত্যি থমকে গেলাম। একটা ময়লা পোড়ানোর প্লান্ট বসাতে নয়াদিল্লিকে বাদ দেওয়ার প্রশ্ন কোথা থেকে এলো বুঝলাম না। এখন কি প্রতিটা ভাগাড়ের নকশা দিল্লিতে পাঠিয়ে অনুমতি নিতে হবে নাকি? ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনলে সুসম্পর্ক, ভারতীয় কোম্পানি বিক্রি করলে বিনিয়োগ, আর নিজের দেশের আবর্জনা নিজের দেশেই পোড়ালে সেটা হয়ে যায় ভারতবিরোধী ষড়যন্ত্র। এই হিসাবটা মাথায় ঢুকল না আমার। বাংলাদেশের একটা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা বাংলাদেশের, তাহলে সেখানে কোন দেশের কোম্পানি কাজ করবে সেটাও তো বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা।

মজার ঘটনা হলো, প্রকল্পের চুক্তি হয়েছিল ২০২১ সালে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। জমি নেওয়া হয়েছে, খরচ হয়ে গেছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। সবই তখনকার কাজ। এখন নতুন সরকার শুধু বাকি অংশটা এগিয়ে নিতে চাইছে, আর তখনই খবর এলো, এইটা নাকি ভারতকে শিক্ষা দেওয়ার নতুন প্ল্যান। গাছ লাগানো হয়েছিল একদলের হাতে, এখন সেই গাছে ফল ধরলে সেই একই দল বলছে, এই ফল খাওয়া যাবে না, বিষ আছে। নিজেদের সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত এখন অন্য কেউ বাস্তবায়ন করতে গেলেই সেটার নাম হয়ে যাচ্ছে চীনপ্রীতি। রাজনীতির সুবিধা সত্যিই অসাধারণ।

দাম নিয়েও একই রকম নাটক। বলা হচ্ছে, আগে ইউনিটপ্রতি ১৮ টাকা ছিল, এখন ২৬ টাকা হলো কেন? নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই বুঝি বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ চুক্তিটা হয়েছিল ডলারে, প্রতি ইউনিট ২১.৭৮ সেন্ট। ২০২১ সালে ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮৫ টাকা, তাই তখনকার হিসাবে প্রতি ইউনিটের দাম দাঁড়াত প্রায় সাড়ে ১৮ টাকা। এখন ডলারের দাম প্রায় ১২৩ টাকা, ফলে সেই একই ২১.৭৮ সেন্ট টাকায় হিসাব করলে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৬.৮ টাকা। অর্থাৎ ডলারে নির্ধারিত দামটা বদলায়নি, টাকার হিসাবে পার্থক্যটা মূলত এসেছে বিনিময় হার থেকে। কিন্তু টাকা কেন এত দুর্বল হলো, ডলারের দাম নিয়ে গত কয়েক বছরে কী নীতি নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নে গেলেই আলোচনা আরো জটিল হয়ে যাবে ।

অবশ্যই প্রকল্পটির সমালোচনা করা যাবে। প্রায় ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য মোট খরচ কেন এত বেড়েছে, প্রকল্পের ব্যয় যৌক্তিক কি না, চুক্তির শর্ত বাংলাদেশের জন্য কতটা সুবিধাজনক, এসব প্রশ্ন তোলা দরকার। চীনা কোম্পানি বলে প্রকল্প ভালো হয়ে যাবে, এমনও কোনো কথা নেই। কিন্তু সমালোচনা আর রাজনৈতিক গল্প এক জিনিস নয়। প্রকল্পটি ব্যয়বহুল হলে সেটা বলা হোক, চুক্তিতে সমস্যা থাকলে সেটা বলা হোক, জনগণের সামনে হিসাব দেওয়া হোক। কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে বাংলাদেশের আবর্জনা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পকে “ভারতকে শিক্ষা দিতে চীনা বিদ্যুৎ কেনা” বানিয়ে ফেললে সেটা আর বিশ্লেষণ থাকে না।

সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে আওয়ামী লীগের অবস্থানটা দেখে। নিজেদের সময়ে সই করা চুক্তি, নিজেদের সময়ে নেওয়া জমি, নিজেদের সময়ে খরচ হওয়া টাকা, অথচ এখন এই প্রকল্প এগোলেই সেটা প্রতিপক্ষের চীনপ্রীতি হয়ে যাচ্ছে। অথচ যদি প্রকল্পটি বাতিল হতো, তখন নিশ্চিত অন্য কথা শোনা যেত। বলা হতো, উন্নয়ন বন্ধ করে দিচ্ছে সরকার। তার মানে সরকার যেটাই করুক না কেন, দোষ একটাই থাকবে। শুধু সেই পুরোনো সিদ্ধান্তটা কখনোই দোষের হবে না, যেটা তারা নিজেরাই নিয়েছিল। ক্ষমতার বাইরে গেলে নিজের পুরোনো সিদ্ধান্তেরও যে নতুন নাম দেওয়া যায়, এই প্রকল্প তার চমৎকার উদাহরণ।

সবচেয়ে মজার মিলটা হলো, দেশের ভেতরে একটা দলের বয়ান আর সীমান্তের ওপারে একটা পত্রিকার বয়ান একদম একই সুরে বাজছে। একজন এপার থেকে গান ধরেছে, আরেকজন ওপার থেকে তাল দিচ্ছে। এতদিন জানতাম আনন্দবাজার একটা ভারতীয় পত্রিকা, এখন মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগের প্রেস বিজ্ঞপ্তি সরাসরি ওখানে ছাপা হয়েছে। ভারত নিজের দেশে কোন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করছে, কোন দেশ থেকে যন্ত্রপাতি আনছে, এসব নিয়ে বাংলাদেশের কোনো পত্রিকা প্রতিদিন লেখে যে ভারত অমুক দেশকে শিক্ষা দিতে তমুক দেশের সাহায্য নিচ্ছে? লেখে না। কারণ এটা স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞানের বিষয়। একটা দেশ নিজের প্রকল্প নিজের মতো করে সাজাবে, এটা নিয়ে প্রতিবেশীর মন খারাপ করার কিছু নেই।

শুধু বাংলাদেশের বেলাতেই এই সাধারণ কথাটা বারবার ভুলে যাওয়া হয়। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে কাজ করলে সেটা স্বাভাবিক, চীনের সঙ্গে কাজ করলে প্রশ্ন, জাপানের সঙ্গে কাজ করলে ভালো, আর আমেরিকার সঙ্গে কাজ করলে আবার অন্য ব্যাখ্যা। তাহলে বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবে কখন? বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে কাজ করবে কি না, সেটা বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত। ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনবে কি না, সেটাও বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত। কোন প্রকল্পে কোন দেশের কোম্পানি কাজ করবে, সেটাও বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত। প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভালো সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য দিল্লির অনুমোদন লাগবে।

আমিনবাজারের একটা ছোট্ট ময়লা পোড়ানোর প্লান্টকে দিল্লি বনাম বেইজিংয়ের লড়াই বানিয়ে ফেলার মধ্যে দিয়ে আসল শর্টসার্কিটটা বিদ্যুৎকেন্দ্রে হয়নি, হয়েছে অন্য কোথাও। প্রকল্পটা ভালো না মন্দ, খরচ যৌক্তিক না অতিরিক্ত, এসব নিয়ে আলোচনা হোক, প্রশ্ন হোক। কিন্তু নিজেদের ফেলে দেওয়া ময়লা দিয়ে নিজেদের ঘরে বিদ্যুৎ বানানোর মতো একটা সাদামাটা প্রকল্পকেও যদি প্রতিবেশী শত্রুতার গল্পে বদলে ফেলা যায়, তাহলে বুঝে নিতে হবে সমস্যাটা লাইনে না, মাথায়।

আধ পয়সা বেশি চাইতেই অগ্নিশর্মা, ভারতকে ‘শিক্ষা’ দিতে ১২৭% বেশি খরচে চিনা বিদ্যুৎ কিনছে ‘বুদ্ধিমান’ বাংলাদেশ-আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক । Click This Link

ইউনিটপ্রতি ২৫ টাকা দরে চীনা প্রতিষ্ঠান থেকে বিদ্যুৎ কিনবে সরকার- যুগান্তর প্রতিবেদন

Country to get power from waste in 2024-TBS Report , 01 December, 2021

Waste-to-energy plant being built in Aminbazar at a cost of $300 million-TBS Report , 15 June, 2023,








সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:২০
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ সরকারের কাছে সোলার এনার্জি বিক্রি করা কতটা লাভজনক?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৭



যারা আগামী ৬ মাসের মধ্যে বাড়ির ছাদে সোলার সিস্টেম ইন্সটল করবেন, তাঁদেরকে বাংলাদেশ সরকার প্রত্যেক ইউনিট ইলেক্ট্রিসিটির জন্যে ১০.৫০ টাকা করে দিবে। রুফটপে সোলার এনার্জি প্ল্যান্ট বসিয়ে লাভ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্পর্ক ও আত্মহত্যা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৪৭



কাউকে আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে বিয়ে করা অথবা আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে অথবা ব্ল্যাকমেইল করে গুরুতর মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের মাধ্যমে কাউকে বিয়েতে বাধ্য করা। - বিশ্বের যে কোনো দেশের আইনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২ লাখ কর্মীর খবর ভুয়া - তবে ২৫ টা সাদা হাতি আসছে!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০২



স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছিলেন, মালয়েশিয়া সেপ্টেম্বর মাস থেকে ধাপে ধাপে ২ লাখ কর্মী নেবে ।

আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে ২ লাখ কর্মী নেবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দায়ী কে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১১



২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে আকস্মিক বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়।প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীসহ বেশ কয়েকজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×