somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বেলাশেষে

০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাসায় আত্নীয় আসলে চলে যাবার সময় কিংবা তাদের বাড়ী থেকে ফেরার সময় ঘরের ছোট সদস্যের হাতে টাকা গুঁজে দেবার যে চল ছিল নিশ্চই আমরা কম বেশি সবাই সেটা সাথে পরিচিত।
গ্রামে বেড়াতে গেলে ঢাকা ফেরার সময় কোন কোনবার দাদু হাতে গুঁজে দিতেন ১০০ টাকার একটা নোট, লঞ্চে কিছু কিনে খেতে। ১০০টাকা তখন অনেক বড় নোট, অনেক কিছু পাওয়া যেতো। বছরে এক আধ বার অতোবড় নোট হাতে আসতো। নানু বা নানা ভাই প্রায় প্রতিবারই দিতেন এবং ঢাকায় বেড়াতে আসলে যাওয়ার সময় নিশ্চিতভাবেই হাতে টাকা দিতেন জোর করে হলেও। আমার বিয়ের আগ পর্যন্ত এই রীতি পালন করেছেন। এরপর আমার মেয়েরা জন্মের পর ওদের হাতে দিয়েছেন।

নানা ভাই ঢাকায় যতদিন থাকতেন প্রতিদিন বিকেলে নামাজ পড়ে ফেরার সময় ছোলা ভাজা, ঝালমুড়ি, চটপটি, পানিপুরি কিংবা হাওয়াই মিঠাই আনতেন। বিয়ের আগ পর্যন্ত বলতাম 'আমি এখন বড় হইছি, এইসব খাইতে ভালো লাগে না' তাও শুনতেন না, আনতেন ই।
মেয়েদের জন্মের পর ওদের জন্যে আনতেন।

গ্রাম থেকে ফেরার পথে আগে দাদু, নানুরা দল বেঁধে কতদূর পর্যন্ত এগিয়ে দিতে যেতেন! চোখের আড়াল হবার আগ পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। আস্তে আস্তে মানুষগুলোর শক্তি কমতে থাকলো, বড় রাস্তা ছেড়ে ছোট রাস্তা অবদি যেতেন বিদায় বেলায়। এরপর শক্তি আরো কমলে বাড়ির উঠোন অবদি নেমে আসতেন, এরপর এমন দিন এলো যে বিছানায় বসেই বিদায় দিতেন!
দাদু গত হয়েছেন তেরো বছরের বেশি, নানু সাড়ে তিনমাস আগে চলে গেলেন! শেষবার বিছানায় শুয়ে ছিলেন একপ্রকার বেহুঁশ হয়ে, একবার চিনতে পারলে পরক্ষণেই চিনতেন না। এরপর গিয়ে আর জীবিত পাইনি।

চৌষট্টি বছর ছয়মাসের সংগীকে হারিয়ে নানা ভাই হঠাৎ করে শারিরীক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গেছেন। হঠাৎ হঠাৎ চেনেন না কাউকে, সময় ভুলে যান, এক ওয়াক্ত নামাজ একাধিকবার আদায় করেন, অন্যের সাহায্য ছাড়া বিছানা থেকে উঠতে পারেন না! অথচ এই মানুষটিই একসময় চাল, নারকেল, ফল, তরকারী ইত্যাদি দিয়ে বস্তা বেঁধে কাঁধে করে ঢাকা আসতেন! শক্তি কীভাবে নিঃশেষ হয়ে যায় তা চোখের সামনে দেখছি!
সম্প্রতি গ্রামে গিয়ে ঢাকা ফেরার সময় বিদায় নিতে গেলে ধরে বিছানা থেকে উঠালাম নানা ভাইকে। চলে যাচ্ছি শুনে সবসময়ের মত বললেন কেন এত তাড়াতাড়ি যাচ্ছি, আরো কিছুদিন থাকতে বললেন। এরপর আসপাশে তাকিয়ে সামনে একটা আখ পেয়ে তাই হাতে দিলেন নিয়ে যেতে। মানা করিনি, কারন নিঃস্বার্থভাবে হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে এই মানুষটিও হয়তো বেশিদিন থাকবে না!

বাড়ী থেকে মামা কিংবা মামীর ফোন কল এলেই কলিজায় কু ডাক দেয়, এইবুঝি এক্ষুনি বাড়ীতে যাবার খবর দিতে ফোন দিয়েছেন, এখনি বুঝি কোন খারাপ খবর দিবেন! যখন দেখি স্বাভাবিক খোঁজ খবর নেবার মত কথা বলছেন তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। আমি জানি আমার চাইতে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকেন আম্মা। সব কিছু তো আমাদের হাতে নেই। পারলে মানুষগুলোকে কলিজার সাথে বেঁধে রাখতাম। ইদানিং অনেক বেশি ছোট বেলার স্মৃতি সামনে আসে। আমাদের জীবনে নানা ভাই নানুর উপস্থিতি এত বেশি যে কোন স্মৃতিতেই তাঁদের বাদ দিয়ে ভাবা সম্ভব নয়।

নারায়নগঞ্জ থেকে প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিনে স্ত্রী সহ সিনেমা দেখতে আসতে গুলিস্তানের সিনেমা হলে কিংবা হোটেল সোনারগাঁ এ চা খেতে আসতেন (পাকিস্তান পিরিয়ডের কথা), সেই শৌখিন মানুষটি একদম ক্ষয়ে গেছেন, নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে ভাবলে খুব কষ্টদায়ক এক শূণ্যতা অনুভব করি নিজের ভেতরে। একসময়ের শক্ত সমর্থ্য মানুষ দুটিকে শক্তিহীন হতে দেখা অত্যন্ত কষ্টের। একজন তো হারিয়েই গেল আরেকজন প্রতিদিন অসংখ্যবার মৃত্যু কামনা করে যাচ্ছেন। আল্লাহ উনাদের তাঁর রহমতের ছায়ায় রাখুন।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের ৭১- কোনো কোনো ক্ষেত্রে রুপকথাও হার মানে‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৫৪



আমাদের উঠানে একটা কবর আছে। কবরটা কার, আমি জানি না।
জানি না, এই কথাটা মিথ্যা। আমি জানি কার। কিন্তু নামটা বললে বিপদ হতে পারে। তাই নাম বলি না।

​শুধু প্রতি বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

লংমার্চ নাকি ‘ফোর-হুইল ড্রাইভ’—ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম!

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৭

জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলের আজকের লংমার্চ—ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা। শুনে মনে হলো, ইতিহাস বুঝি আবার হাঁটতে শুরু করেছে!

কর্মসূচির ছয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিমান যখন ঝরে যায়.........

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭

অভিমান যখন ঝরে যায়.........

আপনারা যারা 'বসন্ত বিলাপ' সিনেমাটা দেখেছেন তাদের কি শেষ দৃশ্যটা মনে আছে? যেখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দেখে অপর্ণা সেন জিজ্ঞেস করছে, "আপনি যান নি?"
সৌমিত্র একগাল হেসে বলছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাকে দিয়ে সেলস হবে না

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫৫

আমাকে বাংলাদেশের এক ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি তাদের সেলসে সহায়তা করার অনুরোধ করেছে। কোম্পানি ভালো, বাজে কোন রেকর্ড নেই। আমার কাজ হচ্ছে, আমার পরিচিত মানুষদের সাথে তাদের মার্কেটিং টিমের যোগাযোগ করায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭



ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি কেনা ও নির্মাণের টাকা কোথা থেকে এসেছিল-এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ঘুরেফিরে আসে। উত্তরটা আসলে লুকিয়ে নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×