
চাপালিশ, চামল, চাম্বল, চাম্বুল, টোপোনি (মগ), বলস্রাম (গারো), কাঁঠালি চাম বা চাম কাঁঠাল (বৈজ্ঞানিক নাম: Artocarpus chama; আর্টোকার্পাস চামা) হচ্ছে মোরাসি পরিবারের কাঁঠাল-জাতীয় একটি বন্য প্রজাতির ফল। বিপন্ন এই বৃক্ষটি বৃহৎ এবং পাতাঝরা প্রকৃতির। প্রায় কাঁঠালের মতো দেখতে তুলনামূলক ছোট আকৃতির এই ফলটিকে মানুষেরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলেও বন্যপ্রাণীর খাদ্য হিসেবেই এটি প্রসিদ্ধ। এই গাছের কাঠ দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হওয়ায় আসবাবপত্র ও দরজা-জানালা সহ রেলপথের স্লিপার তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ সহ চীনের ইউনান, ভুটান, ভারত, লাওস, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, থাইল্যান্ড পর্যন্ত এই গাছের বিস্তার রয়েছে।
বাংলাদেশে মধুপুর বনাঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাহাড়ি বন এবং সিলেট বিভাগের বনাঞ্চলে এই গাছ বেশি জন্মায়। এছাড়াও কুমিল্লার লালমাই পাহাড় এলাকায়, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া, ভালুকায় এবং ত্রিশাল উপজেলায় এবং ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানেও এই গাছ দেখতে পাওয়া যায়। রাঙামাটি শহরে ৩১৬ বছরের বেশি বয়সী একটি চাপালিশ গাছ এখনও টিকে আছে। লাউয়াছড়ায়ও একটি শতবর্ষী চাপালিশ গাছ রয়েছে।
চাম কাঁঠাল (বন কাঁঠাল বা চাপালিশ নামেও পরিচিত) একটি পুষ্টিকর ফল।চাপালিশ কাঁঠাল ফলটি দেখতে অনেকটা কাঁঠালের মতো। তবে ছোট আকারের। কাঁঠালের মতোই কোষগুলো স্বাদে হালকা টক-মিষ্টি (স্বাদ ডেউয়া ফলের মতো)। কাঁঠালের মতো এ ফলেও রয়েছে বীজ। এ বীজ ভাজলে অনেকটা চীনাবাদামের মতো স্বাদ পাওয়া যায়। এতে থাকা ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হজমশক্তি উন্নত করে, এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে।চাম কাঁঠালের প্রধান স্বাস্থ্য উপকারিতাগুলো নিচে দেওয়া হলঃ
১. হজমশক্তি বৃদ্ধি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণচাপালিশ ফল প্রচুর পরিমাণে ডায়েটরি ফাইবার বা আঁশসমৃদ্ধ। এটি অন্ত্রের চলাচল স্বাভাবিক রাখে, যার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয় এবং হজমপ্রক্রিয়া উন্নত হয়। ঐতিহ্যগতভাবে এটি পেটের আলসার উপশমেও উপকারী বলে মানা হয়।
২. শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাএই ফলে উচ্চমাত্রায় ভিটামিন সি এবং বিটা-ক্যারোটিন রয়েছে। এগুলো শরীরে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে কোষের ক্ষয়রোধ করে, বার্ধক্য ধরে রাখে এবং শরীরের সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৩. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক (Anti-diabetic)বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, চাপালিশের পাতার মতো এর ফলের নির্যাসেও অ্যান্টি-ডায়াবেটিক উপাদান রয়েছে। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বাড়তে দেয় না, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশ উপকারী।
৪. প্রদাহ ও ব্যথা উপশম (Anti-inflammatory)শরীরের ভেতরের কোনো প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কমাতে এই ফল সাহায্য করে। এছাড়া এর গাছের ছাল ও ল্যাটেক্স (কষ) লোকজ চিকিৎসায় ক্ষত নিরাময় ও চর্মরোগের উপশমে ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
৫. ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস প্রতিরোধী (Antimicrobial)চাপালিশে প্রাকৃতিকভাবেই কিছু অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ফাঙ্গাল উপাদান থাকে। এটি শরীরকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ এবং পেটের পীড়া থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা রাখে।
৬. বীজ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানচাপালিশের কোষে ভিটামিন এ, বি-কমপ্লেক্স (বি-১, বি-২, বি-৩, বি-৬) এবং ফলিক অ্যাসিড প্রচুর পরিমাণে থাকে। এর ভেতরের বীজগুলো ফেলে না দিয়ে ভেজে খাওয়া যায়, যা খেতে চীনাবাদামের মতো সুস্বাদু এবং জিংক, আয়রন ও প্রোটিনের ভালো উৎস।
ত্বক ও চোখের সুরক্ষা: এতে উপস্থিত ভিটামিন 'এ' এবং বিটা-ক্যারোটিন চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের বলিরেখা দূর করে তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে।
হৃদযন্ত্র ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: চাম কাঁঠালে বিদ্যমান পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
শক্তি জোগায়: কার্বোহাইড্রেট ও ক্যালোরির চমৎকার উৎস হওয়ায় এটি শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়।
বি:দ্র: চাপালিশ, চাম্বল ও চাম্পল প্রকৃতপক্ষে তিন প্রকারের আলাদা গাছ। তবে অনেক অঞ্চলে আঞ্চলিক নামের মিল থাকার কারণে মানুষ এগুলোকে দুটি গাছ মনে করে গুলিয়ে ফেলেন।নিচে এদের সুস্পষ্ট পার্থক্য ও প্রকারভেদ দেওয়া হলো:
১. চাপালিশ বা চাম কাঁঠাল গাছবৈজ্ঞানিক নাম: Artocarpus chama বা Artocarpus chaplasha।পরিবার: Moraceae (কাঁঠাল পরিবার)।মূল পরিচয়: এটি মূলত বাংলাদেশের পাহাড়ি বনের একটি বুনো ফলদ ও কাঠের গাছ। এর ফল দেখতে ছোট কাঁঠালের মতো এবং স্বাদ টক-মিষ্টি।বিভ্রান্তির কারণ: পার্বত্য চট্টগ্রাম বা সিলেট অঞ্চলে এই চাপালিশ গাছটিকেই স্থানীয়ভাবে 'চাম্বল' বা 'কাঁঠালি চাম্বল' নামে ডাকা হয়। এই আঞ্চলিক নামের কারণেই মূলত বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
২. চাম্বল বা গগনশিরীষ গাছবৈজ্ঞানিক নাম: Albizia richardiana।পরিবার: Fabaceae (শিম বা মটর পরিবার)।মূল পরিচয়: এটি অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল ও আকাশচুম্বী একটি কাঠের গাছ, যা রাস্তার ধারে বা বাগানে লাগানো হয়। এর পাতাগুলো তেঁতুল বা শিরীষ পাতার মতো খুব ছোট ছোট হয়। এর মূল মাটির গভীরে যায় না বলে ঝড়ে সহজে উপড়ে পড়ে। এটি কোনো ফলদ গাছ নয়।
৩. চাম্পল বা চাঁপা গাছবৈজ্ঞানিক নাম: Magnolia champaca বা Michelia champaca।পরিবার: Magnoliaceae (চাঁপা পরিবার)।মূল পরিচয়: এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সুগন্ধি ফুলের গাছ। এর ফুল হলুদ বা সোনালী রঙের হয়, যা অত্যন্ত মিষ্টি ঘ্রাণের জন্য পরিচিত। এর পাতাগুলো বড় ও একক ছড়ানো থাকে এবং কাঠও বেশ মূল্যবান হয়।
সংক্ষেপে মনে রাখার উপায়:চাপালিশ: বুনো ছোট কাঁঠাল ফল ও কাঠের গাছ।চাম্বল: দ্রুত বর্ধনশীল লম্বা কাঠের গাছ (শিরীষ জাতীয়)।চাম্পল (চাঁপা): সুগন্ধি ফুলের গাছ।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



