
তেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের মা মারা যান। জীবনস্মৃতিতে তিনি সেই রাতের কথা লিখেছেন। "যে রাত্রীতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতে ছিলাম। তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, ওরে তোদের কী সর্বনাশ হলরে। স্তিমিত প্রদীপে অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল। কিন্তু কী হইয়াছে ভাল করিয়া বুঝিতে পারিলাম না। প্রভাতে বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপর শয়ান।"
নয় বছর পর, বিয়ের চার মাসের মাথায়, আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করলেন কাদম্বরী দেবী। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী, বাড়ির লোক ডাকতো নতুন বউঠান। তরুণ রবীন্দ্রনাথের প্রথম লেখার প্রথম পাঠক ছিলেন তিনিই। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন বাইশ। পরে তিনি লিখেছিলেন, ওই শোক পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলে অশ্রুর মালা দীর্ঘ করে গেঁথে চলেছে। মালা এরপর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছিল।
সমুদ্রমন্থনের গল্প সবাই জানে। অমৃতের জন্য দেবতা আর অসুরেরা মিলে সমুদ্র মন্থন করছিল। অমৃত উঠলো সবার শেষে। তার আগে উঠলো হলাহল, এমন বিষ যা ছড়িয়ে পড়লে ত্রিভুবন শেষ। শিব সেই বিষ নিজে পান করে গলায় ধরে রাখলেন। গলা নীল হয়ে গেল, নাম হলো নীলকণ্ঠ। অমৃত পেতে হলে আগে কাউকে বিষ গিলতে হয়।
১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনের স্কুল খোলার সময় টাকা ছিল না। বাড়ি তুলতে হবে, হোস্টেল বানাতে হবে, ছাত্রদের খাওয়াতে হবে, শিক্ষকদের বেতন দিতে হবে। মৃণালিনী দেবী নিজের গয়না একটা একটা করে বিক্রি করে দিলেন। পরের বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রথমে সাধারণ অসুখ ভেবেই চিকিৎসা চললো। রথীন্দ্রনাথ অনেক পরে অনুমান করেছেন, সম্ভবত অ্যাপেন্ডিসাইটিস। তখন রোগটার নামও কেউ জানতো না, অপারেশনের পদ্ধতিও আবিষ্কার হয়নি।
কলকাতায় তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। জোড়াসাঁকোর লালবাড়ির দোতলায় স্ত্রীর বিছানার পাশে বসে রবীন্দ্রনাথ হাতপাখা নিয়ে বাতাস করতেন। রাতের পর রাত। ওইটুকুই ছিল তাঁর হাতে থাকা একমাত্র চিকিৎসা। শেষ রাতে ছেলেকে ডেকে মায়ের বিছানার পাশে বসিয়ে দিলেন। রথীন্দ্রনাথ লিখেছেন, "তখন তাঁর বাকরোধ হয়েছে। আমাকে দেখে চোখ দিয়ে কেবল নীরবে অশ্রুধারা বইতে লাগল। মায়ের সঙ্গে আমার সেই শেষ দেখা।"
সেই রাতে সব ছেলেমেয়েকে পুরোনো বাড়ির তেতলায় শুতে পাঠিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাচ্চাগুলো সারারাত জেগে রইলো। ভোরের অন্ধকার থাকতে থাকতে বারান্দায় গিয়ে তারা লালবাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলো। রথীন্দ্রনাথের ভাষায়, "সমস্ত বাড়িটা অন্ধকারে ঢাকা, নিস্তব্ধ, নিঝুম। কোনো সাড়াশব্দ নেই সেখানে। আমরা তখনি বুঝতে পারলুম আমাদের মা আর নেই।"
১৯০২ সালের ২৩ নভেম্বর। মৃণালিনীর বয়স উনত্রিশ। দাম্পত্যজীবন উনিশ বছরের। ওই রাতে রবীন্দ্রনাথ ঘুমাননি। একা ছাদে সারারাত পায়চারি করেছেন। পরদিন সকালে স্ত্রীর রোজ পরা চটিজোড়া ছেলের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, "এটা তোর কাছে রেখে দিস, তোকে দিলুম।"
মৃণালিনী দেবীর অসুখের মধ্যেই দুই মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। মেজো মেয়ে রেণুকার শুরুটা সামান্য, অল্প জ্বর আর খুসখুসে কাশি। ধরা পড়লো যক্ষ্মা। সে যুগে ওই রোগের কোনো চিকিৎসা ছিল না।
রবীন্দ্রনাথ মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। প্রথমে হাজারিবাগ। কাজ হলো না। তারপর আলমোড়া, পাহাড়ের হাওয়ায় যদি কিছু হয়। ১৯০৩ সালের মে মাসে শান্তিনিকেতন থেকে যাত্রা। পথে যা ঘটলো, তিনি নিজেই লিখেছেন। মোগলসরাইয়ে গাড়ি বদলাতে হলো, বেরিলি পৌঁছানোর কথা যখন, তার বারো ঘণ্টা পরে পৌঁছানো গেল, কাঠগোদামে থাকার জায়গা মিললো না, কুলি মিললো না। দুপুরের রোদে অনাহারে অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে এক্কায় চড়ে রানীবাগের ডাকবাংলোয় গিয়ে তবে খাওয়া জুটলো।
চিঠির মাঝখানে তিনি নিজেকে থামিয়ে দিয়েছেন। "যাহা হউক পথের সমস্ত কষ্ট বর্ণনা করিয়া কি হইবে?" আলমোড়ায় গিয়েও কাজ হলো না। আগস্টে অবস্থা খারাপ হলে তিনি মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় ফিরলেন। লালবাড়ির তিনতলায় মেয়ের গায়ে রোদ লাগানোর জন্য কাঁচের ঘর বানানো হলো। ১৯০৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর রেণুকা মারা গেল। বয়স বারো।
ওইদিনই রবীন্দ্রনাথ একটা জরুরি আলোচনায় বসেছিলেন। আলোচনা শেষে রমেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মেয়ের অসুখের খবর জানতে চাইলেন। রবীন্দ্রনাথ শান্তভাবে বললেন, "সে আজই মারা গিয়েছে।" তারপর দুই বছরের মধ্যে, ১৯০৫ সালের জানুয়ারিতে, মারা গেলেন পিতা দেবেন্দ্রনাথ। সেবার মাঘোৎসব বন্ধ রাখার প্রস্তাব উঠলো। রবীন্দ্রনাথ রাজি হলেন না।
শান্তিনিকেতনে আজও ঋতু উৎসব হয়। বসন্ত এলে রঙ ওড়ে, গান হয়, পড়ুয়ারা নাচে। এই উৎসব রবীন্দ্রনাথ শুরু করেননি। শুরু করেছিল তাঁর ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ তখন ধারেকাছেও ছিলেন না। ছেলেটা ছিল বাবার ছায়ার মতো। জ্বর হলে সে বিছানায় শুয়ে গান আর কাব্য নিয়ে আলোচনা জুড়ে দিত।
১৯০৭ সালের পুজোর ছুটিতে শমীকে কোথায় রাখবেন, এটা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিব্রত ছিলেন। দিল্লিতে পাঠাবেন ভেবেছিলেন, তারপর শুনলেন সেখানে ম্যালেরিয়া চলছে। শেষে বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে চিঠি লিখলেন, ছেলেকে মুঙ্গেরে পাঠাবেন বলে। চিঠিতে লিখলেন, "শমী কোলকাতা পছন্দ করে না, সেখানে যেতেও চায় না অথচ ছুটিতে শান্তিনিকেতনে তাঁর একলা ঠেকে। শমী এত অল্প জায়গা জোড়ে এবং এত নিরুপদ্রব যে তার আগমনে তোমাদের মুঙ্গের সহরের শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা নেই।" বাক্যটা বাবার। ছেলেকে অন্যের বাড়িতে পাঠানোর সময় বাবা লিখছেন, চিন্তা কোরো না, ও খুব অল্প জায়গা নেয়।
১৬ অক্টোবর, বিজয়াদশমীর দিন, শমীন্দ্রনাথ মুঙ্গেরে গেল। নভেম্বরের মাঝামাঝি খবর এলো, কলেরা। ১৭ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ একজন ডাক্তার নিয়ে মুঙ্গেরের ট্রেন ধরলেন। ভেবেছিলেন একটু ভালো হলেই ছেলেকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনবেন। ২৪ নভেম্বর রাতে শমীন্দ্রনাথ মারা গেল। বয়স এগারো।
রবীন্দ্রনাথ তখন পাশের ঘরে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন। চোখ দিয়ে জল নেমেছিল, কোনো শব্দ ছাড়া। পাঁচ বছর আগে ঠিক এই নভেম্বরেই তিনি স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন। পরের রাতে ফেরার ট্রেনে বসে যা তিনি দেখেছিলেন, অনেক পরে মেয়ে মীরা দেবীকে লেখা চিঠিতে সেটা লিখে গেছেন।
"যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোক তাকে একটুও যেন পিছনে না টানে। শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি, সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারই মধ্যে।"
ছেলেকে পুড়িয়ে ফেরার পথে, ট্রেনের জানালা দিয়ে, লোকটা আকাশ ভরা জ্যোৎস্না দেখছেন। আর দেখছেন, পৃথিবীর কোথাও কিছু কমেনি। আঠারো দিন পর তিনি গান লিখলেন, অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে।
এগারো বছর পর, ১৯১৮ সালের ১৬ মে, যক্ষ্মায় মারা গেলেন বড় মেয়ে মাধুরীলতা। শ্বশুরবাড়িতে, নিঃসন্তান অবস্থায়। বয়স একত্রিশ। আর এর মাঝখানে, ১৯১০ সালে, বেরোলো গীতাঞ্জলি।
গীতাঞ্জলির গান শুনে আমাদের মনে হয় লোকটা বুঝি খুব শান্তিতে ছিলেন। ছিলেন না। যে বাড়িতে গীতাঞ্জলি জন্ম নিচ্ছিল, সেই বাড়িতে মৃত্যু প্রায় নিয়মিত অতিথি ছিল। মা, বউঠান, স্ত্রী, দুই মেয়ে, এক ছেলে, বাবা। তিনি বিষ গিলে নিয়েছিলেন, আর আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন অমৃতের কলসি।
এই কারণেই রবীন্দ্রসংগীত এত কাজ করে। আপনার যেদিন সবচেয়ে খারাপ যায়, সেদিন আপনি ওই গানে ফিরে যান। কারণ গানগুলো দুঃখ চেনে। বাইরে থেকে নয়, একেবারে ভেতর থেকে চেনে। আর মুক্তির যে গান তিনি লিখে গেছেন, ওটা সুখী লোকের উল্লাস নয়। ওটা এমন একজনের কণ্ঠস্বর, যিনি একের পর এক সব হারিয়ে ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে বলেছিলেন, কোথাও কিছু কম পড়েনি।
আজ বাইশে শ্রাবণ। আজকের দিনে তাঁর কোনো গান শুনতে বসলে একটা কথা মনে রাখা যেতে পারে। যে সুর কানে বাজছে, ওটা কল্পনায় দেখা রঙ। বানিয়েছিলেন এমন একজন, যিনি লাল আর সবুজের তফাত জানতেন না, অথচ যিনি আমাদের দেখতে শিখিয়ে গেছেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




