somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাযহাবের ভিন্নতা কি ধর্মের বিভক্তি?

১৪ ই অক্টোবর, ২০১২ সকাল ১১:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সাধারণত বাংলাদেশের কোনো মসজিদে যদি কেউ হানাফি ছাড়া অন্য মাযহাবের নিয়মে নামায পড়ে তবে সবাই হা করে তাকিয়ে থাকে, কেউ কেউ ভাবে, আহা বেচারা! কী কষ্ট করে ভুল নামায পড়ছে!!

কিন্তু ইসলামের চারটি মাযহাব রয়েছে:

১. হানাফী- ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি
২. মালেকী- ইমাম মালেক বিন আনাস রহমতুল্লাহি আলাইহি
৩. শাফেয়ী- ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি
৪. হাম্বলী- ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি

আমরা বাংলাদেশিরা প্রায় সবাই হানাফী মাযহাবের মতে আমল করি। কিন্তু তাই বলে কি বাকি তিনটি মাযহাব অন্য ধর্মের মতো ভিন্নরকম? তাদের ইবাদতও কি আমাদের মত শুদ্ধ ও কবুল হয়? তাদের সাথে কি বিয়ে শাদী ও অন্যান্য লেনদেন বৈধ?

হাবীবুল্লাহ, হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে নামায আদায় করেছেন। সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যে যখন যে যেভাবে দেখেছেন, তারা সেভাবেই নামায পড়তেন। অন্যান্য ইবাদতের বেলায়ও তাই। যে সাহাবি যে পদ্ধতি হাবীবুল্লাহ, হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছ থেকে শিখেছেন ও দেখেছেন, তিনি বাকি জীবন ওভাবেই আমল করেছেন। এ পার্থক্য শুধু অর্থ অনুধাবনে ও আদায়ের পদ্ধতিতে, অন্য কিছু নয়।

তার মানে কিন্তু এই নয় যে, কেউ এক রাকাতে দুই রুকু কিংবা তিন সিজদা করেছেন। রমযানের রোযা কেউ কম বা বেশি রেখেছেন, যাকাতের হিসেবে চল্লিশ ভাগের একভাগের চেয়ে কেউ কম বা বেশি করেছেন- এমন কিছুই নেই। যেটুকু পার্থক্য রয়েছে- তা কেবলই আদায় করার পদ্ধতি নিয়ে। কোনো সন্দেহ নেই যে এর সবগুলোই হাবীবুল্লাহ, হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদায় করেছেন, তবে বর্ণনাগত দূরত্ব বা নৈকট্যের তারতম্যে চার ইমাম সেখান থেকে কোনো একটিকে বাছাই করেছেন। কখনো কখনো বহু অর্থবোধক শব্দের আসল অর্থ নির্ধারণের তারতম্যে ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। কেউ আভিধানিক অর্থ নিয়েছেন কেউ পরিভাষার অর্থ। তাই কোনো এক মাযহাব সঠিক আর বাকিগুলো ভুল- এমন ধারণা সম্পূর্ণ অবাস্তব।

ইমামরাও তাদের মাযহাবের কোনো বিষয়ে সন্দেহ থাকলে কুরআন, হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামদের বর্ণনায় যেটি সর্বাধিক সহি সেটি গ্রহণ করার কথা বলেছেন।

তাই বলে কি আমরা সুবিধা মত সব মাযহাবের ওপর আমল করা শুরু করব? না, তা নয়। কারণ এতে দ্বীন ও ইবাদত আমাদের সুবিধামত খেলার উপকরণে পরিণত হবে। বরং যে যে মাযহাবের পদ্ধতি শিখেছে, তার সেভাবেই পুরো দ্বীন মানা উচিত।

এ কথাও মনে রাখতে হবে, হানাফী মাযহাবের অনুসারী মানে কিন্তু ইমাম আবু হানিফার অনুসরণ নয়, আমরা ইমাম আবু হানিফার মাধ্যমে হাবীবুল্লাহ, হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেই অনুসরণ করছি। ইমাম এখানে নিছক মাধ্যম ছাড়া আর কিছু নন।

কুরআন ও সুন্নাহর বিশাল সাগর পাড়ি দেওয়া আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়, এর পথ ও পদ্ধতি রপ্ত করাও দুঃসাধ্য বিষয়। তাই সাধারণ মুসলমানদের জন্য চার ইমামের চার মাযহাব হল নৌকার মতো। এ নৌকাগুলোর মাধ্যমে মুসলমানরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে দ্বীনের সাগর পাড়ি দিয়ে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির বন্দরে ভিড়ে।

এখন যদি এ নৌকাগুলোর যাত্রী সাগর পাড়ি দেওয়া বাদ দিয়ে পারস্পরিক ধাক্কাধাক্কি ও ঠুকোঠেুকিতে লিপ্ত হয় তবে ছিটকে পড়ে হাবুডুবু খাওয়া ছাড়া উপায় নেই, তীরে আর পৌঁছা যাবে না। মাযহাব নিয়ে অশ্রদ্ধা ও পারস্পরিক বিতর্ক ও সংঘাতের ব্যাপারটি ঠিক এমনই।

তবে কেউ যদি কুরআন ও হাদীসের এবং ইসলামী শরীয়তের মূল ভিত্তিগুলো সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান ও পা-িত্যের অধিকারী হয় এবং নিজের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা থাকে- তখনই কেবল মাযহাব ছেড়ে দিয়ে নিজের ইজতিহাদ মতো আমল করা যাবে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে আসলে এ চার মাযহাবের মাধ্যমে আল্লাহ পাকের বিধান ও রাসূলের সুন্নাতের সব পদ্ধতি ও রকমের অনুসরণ হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। এটা কুদরতি এক নিদর্শন। বিশ্বের সব মুসলমান এক পদ্ধতিতে নামায পড়লে হাবীবুল্লাহ, হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অন্য পদ্ধতিগুলো হারিয়ে যেত। পবিত্র কুরআনের সাত ক্বেরাত পদ্ধতির মতো এ চার মাযহাবও এ উম্মতের জন্য রহমত। কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই এগুলোর উৎপত্তি।

হাবীবুল্লাহ, হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএকবার সফরে রওয়ানা হওয়ার আগে বললেন, সবাই যেন বনু কুরাইযার অঞ্চলে গিয়ে আসর নামায পড়ে। কোনো কোনো সাহাবি ভাবলেন, হাবীবুল্লাহ, হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কথা বলার কারণ হল- যেন পথে দেরি না হয়। তাই তারা দেরি না হওয়ার মতো করে পথেই আসর আদায় করে ফেললেন। আর একদল ভাবলেন, হাবীবুল্লাহ, হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে যা বলেছেন, সেটাই মানা ভাল। তারা সেখানে পৌঁছে আসর আদায় করলেন। হাবীবুল্লাহ, হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগে ও পরে আদায়ের কথা শুনে দু’টোকেই ঠিক বললেন এবং পথে আদায়কারীদের নামায পুনরায় আদায় করতে বলেননি।

সাহাবারা এ ঘটনায় যেমন হাবীবুল্লাহ, হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উদ্দেশ্য অনুধাবন নিয়ে দু’ভাগে ভাগ হয়েছিলেন, চার মাযহাবে ভিন্নতা ঠিক এ রকমই। কিন্তু মৌলিক ও স্পষ্ট বিষয়সমূহে সবাই সম্পূর্ণ একমত এবং যেটুকু ভিন্নতা রয়েছে- তা নিয়ে তারা কোনোদিন বিবাদ কিংবা গালমন্দ তো দূরের কথা- সামান্য তাচ্ছিল্যও দেখাননি। কারণ কোনো এক মাযহাবকে নিয়ে ঠাট্টা করা মানে স্বয়ং হাবীবুল্লাহ, হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একটি পদ্ধতি বা বর্ণনাকে তুচ্ছ করা।

আর তাই নিজেদের ইবাদত আদায়ের সময় নিজের মাযহাব সম্পর্কে জানা এবং সঠিকভাবে তা আদায় করাই সচেতন মুসলমানের কাজ। পদ্ধতির এ ভিন্নতাকে যদি কেউ ধর্মের বিভক্তির মতো মনে করে এবং এ নিয়ে তালগোল পাকায়- তবে ভ্রান্তির উত্তাল সাগরে হাবুডুবু খাওয়া ছাড়া তার কোনো সমাধান নেই।

আসুন, ছোটবেলায় নানা দাদারা কে কী বলেছেন, মক্তবের হুজুর কী শিখিয়েছিলেন- সেসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যার যার মাযহাব সম্পর্কে আলেমদের কাছ থেকে সঠিক জ্ঞান অর্জন করি এবং আদায় করি। যে কোনো বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ আলেমের কাছ থেকে জেনে ইসলাম মানার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ পাক দিয়ে রেখেছেন পবিত্র কুরআনে- ‘আর তোমরা যদি না জানো তবে অভিজ্ঞ কাউকে জিজ্ঞেস করে নাও-’(নাহল-৪৩)।
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আম্রকাননের আগুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:২১


আম্রকাননের আগুন

এপ্রিলের এক দুপুর।
বাতাসে বারুদের গন্ধ, আকাশে অনিশ্চয়তার মেঘ।
মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আমগাছের ছায়ায় এসে দাঁড়ালেন কয়েকজন মানুষ।
দূরে চুয়াডাঙ্গা জ্বলছে, তবু এখানে শপথ।
একটি আমবাগান সেদিন হয়ে উঠল একটি দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৮ ভগ্ন শাখা- ভগ্ন জীবন

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

জীবনের ভগ্নদশা অনেকটা এমন এক বৃক্ষের মতো, যার ডালপালা একে একে বিলুপ্ত হয়েছে।

একসময় যে শাখাগুলোতে স্বপ্ন, সম্পর্ক ও সম্ভাবনার পাতা দুলত, আজ সেখানে শূন্যতা ও নীরবতা। তবু কাণ্ডটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

/স্বাধীনতা বিরোধীদের safe home আগে ছিলো লিবিয়া আর এখন হলো তুরস্ক।

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১২

/স্বাধীনতা বিরোধীদের safe home আগে ছিলো লিবিয়া আর এখন হলো তুরস্ক।

/শুধু তাই না, তারা খোলাখুলি ভাবেই আমাদের স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসা ও জঙ্গী আতঙ্কের অর্থনীতিতে এক নির্বোধজীবি আত্মভোলা জাতির আয়না

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩

এক

বুদ্ধিজীবিরা নাকি জাতির বিবেক! তা সে তো ভালো কথা। কিন্তু সাধারণত যা ভালো তা যখন খারাপ তখন সাধারণত তা খুবই খারাপ। একটা জাতির সবচেয়ে মজার কিন্তু করুণতম দৃশ্য হলো তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্র ব্যর্থদের দায়িত্ব নেয় নাকি ব্যর্থতার সংজ্ঞাই রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত হয়???

লিখেছেন সুব্রত দত্ত, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪

আমাকে যারা চেনেন অথবা আমার অন্যান্য লেখা যাদের পড়া আছে তারা জানেন আমি একজন নিহিলিস্ট। একজন নিহিলিস্ট ‘রাষ্ট্রধারণা’য় বিশ্বাসী নয়। রাষ্ট্র সম্পর্কে সে উদাসীন। আমি নিজেও রাষ্ট্র সম্পর্কে উদাসীন। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×