
নারী অর্ধেক মানবতা। পুরুষ মানবতার মাত্র একাংশের প্রতিনিধি। অপর অংশের প্রতিনিধিত্ব করে নারী। তাই নারী সমাজকে বাদ দিয়ে মানব জাতির যে পরিকল্পনাই রচিত হবে, তা অনিবার্যভাবে হবে অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। কেবল পুরুষ সমন্বয়ে গঠিত কোন মানব সমাজের-যেখানে নারীর প্রয়োজনই নেই-কল্পনাও করা যায় না। কেননা নর ও নারী পরস্পর সম্পূরক, পরস্পর নির্ভরশীল। না নারী পুরুষ ছাড়া চলতে পারে, না পুরুষ পারে নারীবিহীন হয়ে থাকতে। এই মুখাপেক্ষিতা ও নির্ভরতা সামাজিক, জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক সর্বদিক দিয়ে। সামষ্টিক জীবনের দাবি হল, নারী পুরুষ পায়ে পা মিলিয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলবে। অপরদিকে স্বভাবগত যৌনস্পৃহার চাহিদা হচ্ছে, নারী ও পুরুষ পরস্পরের নিকট হতে শান্তি, স্বস্তি, তৃপ্তি ও সার্থকতা লাভ করবে।
বস্তুতঃ সামষ্টিক জীবনের সুষ্ঠতা ও উন্নতি একান্তভাবে নির্ভর করে নারী পুরুষের মাঝে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক যথার্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যৌন সম্পর্কও যথার্থ ও পবিত্র হওয়ার ওপর। নারীর চেষ্টা সাধনায় যে ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে যাবে, পুরুষ তা কানায় কানায় পূর্ণ করে দেবে। পক্ষান্তরে যে ত্রুটি বিচ্যূতি ও অপূর্ণতা থাকবে পুরুষের দায়িত্ব পালনে, তার পরিপূরণে এগিয়ে আসবে নারী। নারী পুরুষের যৌন সম্পর্ক তার স্বভাবসম্মত সীমার মধ্যে সীমিত থাকবে এবং নিছক স্বাদ-আস্বাদন ও লালসা চরিতার্থকরণের উপায় হিসেবেই তা গ্রহণ করা যাবে না। এটাই সর্বতোভাবে যথার্থ ও যুক্তিযুক্ত।
নারী পুরুষের সামাজিক সম্পর্ক যদি ভারসাম্যহীন হয় এবং তাদের পারস্পরিক যৌন সম্পর্ক উচ্ছৃঙ্খলতায় আকীর্ণ হয়ে উঠে, তাহলে গোটা মানব সমাজই সর্বাত্মক ভাঙন ও বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়াবে। কেননা, এই ভারসাম্যহীনতার পরিণামে সামষ্টিক জীবনের অনেকগুলি দিক শূণ্য থেকে যাবে আর অনেকগুলো দিকের ওপর অস্বাভাবিক ও অপ্রয়োজনীয় গুরুত্ব আরোপিত হবে। এই দুটো অবস্থাই সুষ্ঠু সমাজ জীবনের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। অনুরূপভাবে যৌন সম্পর্ক শৃঙ্খলাহীন হয়ে গেলে সমাজ-সংস্থা ভাঙন ও বিপর্যয়ের শিকার হবে অথবা যৌন সম্পর্ক সম্পূর্ণ পরিহার করার প্রবণতা সমাজে সাধারণভাবে প্রবল হয়ে দেখা দেবে। যে-সব জাতির জীবনে, যৌন উচ্ছৃঙ্খলতা ব্যাপক ও মারাত্মক হয়ে দেখা দেয়, সে সব জাতি বেশী দিন পৃথিবীর বুকে টিকে থাকতে পারে না। পক্ষান্তরে যৌন বিমুখতা মানব সভ্যতা গড়ে তোলার পথে বিরাট অন্তরায়। মানুষের ইতিহাস এ কথার যথার্থতা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে।
আধুনিক সভ্যতা নারী ও পুরুষের মাঝে স্বভাবসম্মত সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আর যৌন সমস্যার সমাধান করাতো তার সাধ্যেরও অতীত। কেননা আধুনিক সভ্যতা নারীর জন্য তার আসল ও স্বভাবসম্মত স্থান নির্ধারণ করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে; বরং তার আসল ও স্বভাবসম্মত স্থান হতে তাকে টেনে নিয়ে পুরুষদের কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়ে এক জটিল অবস্থার সৃষ্টি করেছে। ফলে নারী আজ পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট বিশাল কর্মক্ষেত্রে সদা তৎপর; অথচ তার সৃষ্টি হয়েছে যে কাজের জন্য, সেখানে সে অনুপস্থিত। আধুনিক সভ্যতা যৌন ভাবাবেগকে এতটা প্রবল, সুতীব্র ও উচ্ছসিত করে তুলেছে যে, মানুষের মন ও মগজের ওপর তার সর্বাত্মক আধিপত্য সংস্থাপিত হয়ে গেছে। ফলে মানুষ আসল করণীয় বিষয়কে উপেক্ষা করে চলেছে এবং চারদিকে যৌন স্বাদ আস্বাদনের এক প্রচন্ড বন্যা বইছে।
এ কথায় কোনোই সন্দেহ নেই যে, নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভুল ও ভ্রান্ত কাঠামোর ওপর গড়ে উঠেছে বলে বর্তমান সভ্যতা এক কঠিন বিপর্যয়ের সম্মুখীন। এক্ষণে মানুষ এমন এক স্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার অশেষ উপায় উপকরণ থাকা সত্ত্বেও মানুষ তা হতে বঞ্চিত। তার এ বঞ্চনা কিছুমাত্র ঘুচবে, তাও সুদূরপরাহত বলে মনে হয়।
আধুনিক সভ্যতা ও সামাজিক অবস্থা যারা অনাবিল, অনাসক্ত ও সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বিচার-বিবেচনা করছেন, তাঁরা আমাদের উপরোক্ত কথার সত্যতা অবশ্যই স্বীকার করবেন। এ কথায়ও তাঁদের কোন সন্দেহ থাকবে না যে, সামান্য ও নগণ্য ধরনের সংশোধন চেষ্টা-প্রচেষ্টা দ্বারা এই সমাজকে রক্ষা করা যাবে না, তাকে নিরোগ ও সমস্যামুক্ত করাও এই উপায়ে সম্ভব হবে না। এক্ষনে নারী ও পুরুষ সমন্বয়ে সুষ্ঠু সমাজ সংস্থা গড়ে তোলার জন্য সম্পূর্ণ নতুনভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করা একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সেজন্যে বর্তমান ঘুনে ধরা সমাজ কাঠামোকে ভেঙে ফেলে তাকে নতুনভাবে সুদৃঢ় করে সংস্থাপন করতে হবে। এই প্রেক্ষিতেই আমরা অত্র আলোচনার অবতারণা করছি।
আমাদের বিশ্বাস ইসলামী আদর্শই নারী-পুরুষের সামাজিক ও যৌন জীবনের জন্য নির্ভুল ভিত্তি উপস্থাপন করছে। এই ভিত্তির ওপর যে সম্পর্ক কাঠামো গড়ে উঠবে, তা সর্বপ্রকার ভাঙন, বিপর্যয় ও উচ্ছৃঙ্খলতার কবল হতে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে সর্বোতভাবে সাফল্যমন্ডিত হবে। পাশ্চাত্য সভ্যতা সংস্থাপিত কাঠামো চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে নবতর সমাজ কাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া আধুনিক মানুষের অন্য কোন উপায় নেই। একথা আমরা বলিষ্ঠ কন্ঠেই বলতে চাই।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে নভেম্বর, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




