
ছবি: গুগল থেকে..
"সরোবরের শ্যাওলা অপেক্ষা গোবরে পদ্ম ফুলের মর্যাদা অনেক বেশি" কথাটা শুনেন নাই এমন শিক্ষিত মানুষ পাওয়া যাবে না। শ্যাওলাকে এমন অপমান হয়তো আল্লাহ মিনে নেননি বলেই সেই শ্যাওলার মাঝেই দিয়ে দিলেন মহা ঔষধি গুণ। আমি কথা বলছি "স্পিরুলিনা" নামক এক শৈবালের ব্যাপারে। আল্লাহ তায়ালা যে কোন জিনিস অনর্থক সৃষ্টি করেননি তা আবারও প্রমান হলো। চলুন জেনে আসি এই আশ্চর্য শৈবাল সম্পর্কে।
সব রোগের মহৌষধ ‘স্পিরুলিনা’
স্পিরুলিনা অতি ক্ষুদ্র নীলাভ সবুজ শৈবাল জাতীয় উদ্ভিদ। অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখা যায় না। শৈবালটিতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ভিটামিন, লৌহ ও একাধিক খনিজ পদার্থ রয়েছে। এটি সাধারণত পানিতে জন্মে। ১-৩ গ্রাম স্পিরুলিনায় রয়েছে ১-৩ কেজি বিভিন্ন ধরনের সবজির গুণাবলি।
বিসিএসআইআর’র বায়োলজিক্যাল রিসার্চ ডিভিশন সূত্রে জানা যায়, বর্তমান বাজারে স্পিরুলিনা ট্যাবলেট, ক্যাপসুল ও পাউডার এবং ফ্লেক্স হিসেবে পাওয়া যায়। বর্তমানে স্পিরুলিনাযুক্ত পাউরুটি ও পানীয় বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
কেন খাবেন স্পিরুলিনা:
সবার আগে বলে নিই এটা একটা ফুড সাপ্লিমেন্ট, কোন ঔষধ নয়। প্রচুর প্রোটিন, ভিটামিন, লৌহ ও নীলাভ সবুজ রঙ থাকার কারণে স্পিরুলিনায় রয়েছে নানা ধরনের রোগ দমনের ক্ষমতা। তাই স্পিরুলিনা একটি ভেষজগুণসম্পন্ন শৈবাল। স্বাদ ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াহীন স্পিরুলিনা নিয়মিত খেলে আমাদের দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা পূরণ করবে, পুষ্টিহীনতা, রক্তশূন্যতা, রাতকানা, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, আলসার, বাত, হেপাটাইটিস ও ক্লান্তি দূর করে। আপনি জেনে অবাক হবেন, বিশ্বে প্রতি বছর ২২০০ টন স্পিরুলিনা খাওয়া হয়ে থাকে এবং জাপানেই প্রতিবছর স্পিরুলিনা খাওয়া হয় ৫০০ টন। একটি গবেষনায় দেখা গেছে, জাপানিজদের গড় আযূ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী হওয়ার অন্যতম কারন হচ্ছে স্পিরুলিনা।
বিশ্বের বড় বড় সব আর্গানাইজেশন স্পিরুলিনাকে যে স্বীকৃতি দিয়েছে তা হল:
>> প্রতি কেজি স্পিরুলিনা ১০০০ কেজি মিশ্র ফল ও সবজীর সমতুল্য – NASA
>> স্পিরুলিনা মানবজাতির জন্য প্রোটিনের শ্রেষ্ট উৎস – FDA
>> স্পিরুলিনা ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ খাদ্য – United Nation
>> স্পিরুলিনা আগামীর জন্য আদর্শ ও নিখুঁত খাদ্য – UNESCO
>> স্পিরুলিনা ২১ শতকের মানব সম্প্রদায়ের জন্য শ্রেষ্ঠ স্বাস্থকরী খাদ্য – WHO
>> আমরা বিশ্বের অপুষ্টির প্রতিকার হিসেবে স্পিরুলিনা সুপারিশ করছি -IIMSAM P2
কি কি রোগে উপকারী:
১) এতে শক্তিশালী এন্টিঅক্সিডেন্ট আছে, যা ক্যান্সার রোধ করতে খুবই সাহায়ক;
২) স্পিরুলিনা ওজন কমায়। মাসিকের সময়ের ব্যথা দূর করে।
৩) স্পিরুলিনা টোটাল কোলেস্টেরল, খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল), ট্রাইগ্লিসারাইড এর মাত্রা কমায়, পাশাপাশি ভাল কোলেস্টরল (এইচডিএল) এর মাত্রা কমিয়ে দিয়ে হার্ট অ্যাটাকের শংকা থেকে রক্ষা করে।
৪) এটি সব ধরনের ভাইরাসের শক্তি খর্ব করে।
৫) স্পিরুলিনা উচ্চ রক্তচাপ কমায়, স্ট্রোকের ঝুকিঁও এটি কমায়।
৬) স্পিরুলিনা প্রধান একটা গুণ হল এটি অ্যালার্জির একটি মহৌষধ।
৭) স্পিরুলিনার আরও একটি চমৎকার গুণ হলো এটি এনিমিয়া (রক্তশূন্যতা)-র উপর খুবই এফেকটিভ। কারণ এতে প্রচুর পরিমানে আয়রণ থাকে।
৮) পেশী শক্তিশালী করে।
৯) স্পিরুলিনা উল্লেখযোগ্যভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এটি টাইপ ২ ডায়াবেটিস ৮%- ৯% কমিয়ে দিতে পারে।
১০) আমাদের খাবার বা ঔষধে অনেক রকম ভারি ধাতব প্রদার্থ থাকে যাতে কিডনির উপর ক্ষতিকর প্রভাব পরে। ম্যাকলিনা (স্পিরুলিনা) এ আছে প্রচুর পরিমানে ক্লোরোফিল যা রক্তকে পরিস্কার করে শরীরকে এসব ভারী ধাতব প্রদার্ত ও অপ্রয়োজনিয় বর্জ্যকে বের করে দেয় এবং কিডনিকে সুস্থ্য ও স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে ।
১১) প্রোটিনের প্রধান উৎস। গরুর গোস্তের সাথে তুলনা করলে, এতে ৬৫-৭১ ভাগ পূর্ণ মাত্রায় প্রোটিন আছে। যেখানে গরুর গোস্তে আছে ২২ ভাগ।
১২) স্পিরুলিনা লিভারের ক্ষতি এবং সিরোসিস এর বিরুদ্ধে কাজ করে শরীরকে রক্ষা করে। লিভারের ব্যথা হ্রাস করে এবং লিভারে ট্রাইগ্লিসেরাইড এর ক্ষতি এড়িয়ে যেতে সক্ষম।
১৩) ই.কোলাই এবং চান্দিদার মত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি দমন করে । স্পিরুলিনা পাচনতন্ত্রএর মধ্যে lactobacillus এবং bifidobacteria মত ভাল ব্যাকটেরিয়া তৈরী করে। সুতরাং, এটা পুষ্টি শোষণ করে শরীরের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে হজম বাড়ায়।
১৪) স্পিরুলিনা আর্সেনিক নিরাময় করে। প্রতিদিন ১০ গ্রাম করে স্পিরুলিনা খাওয়ালে প্রায় ৪ মাস পর রোগী সম্পূর্ণরূপে সুস্থ্য হয়ে উঠে। যেহেতু এখন পর্যন্ত আর্সেনিক রোগের কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি সে ক্ষেত্রে স্পিরুলিনা সেবন করে আর্সেনিকমুক্ত থাকাটা সত্যিই আমাদের জন্য বিরল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
১৫) দীর্ঘদিন সেবন করলে যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। দীর্ঘদিন সেবন করলে চোখের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হয় এবং দৃষ্টিশক্তি সঠিক মাপে আনতে সাহায্য করে।
১৬) এটি শরীরের মধ্যকার খারাপ পদার্থ বের করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।
১৭) স্মৃতি শক্তি ও একাডেমিক পারফর্মমেন্স উন্নত করে। যেহেতু, স্পিরুলিনাতে প্রচুর পরিমান ভিটামিন বি-১২ আছে, যা মেধা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৮) স্পিরুলিনাতে প্রচুর পরিমান এমিনো এসিড, সিসটেইন ও উচ্চমান সম্পন্ন প্রোটিন থাকায় এটা গ্যস্টিক ও ডিওডেনাল আলসার কিউর করে।
কি আছে এই স্পিরুলিনায়:
১. গরুর কলিজি থেকে ৪ গুণ বেশি আয়রন।
২. গাঁজর থেকে ৩৯ গুণ বেশি বিটা ক্যরোটিন।
৩. দুধের থেকে ২৬ গুণ বেশি ক্যালশিয়াম।
৪. প্রোটিন আছে ডিমের ৬ গুণ।
৫. ক্লোরোফিল আছে আলফাফা এবং গমের ঘাস থেকে ৫-৩০ গুণ।
৬. ১৮টি এমিনো এসিড।
৭. বিভিন্ন ধরণের ৯৬টি উপাদান।
বাংলাদেশে গবেষণা:
ফ্রান্সের আর্থিক সহযোগিতায় ঢাকার বিসিএসআইআর গবেষণাগারে ফ্রান্সের বেক্মা পদ্ধতিতে স্পিরুলিনার চাষ শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা দেশের আবহাওয়া ও অর্থনৈতিক সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে স্পিরুলিনা চাষের কিছু পরিবর্তন করেন। বাংলাদেশে প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ক্ষুদ্র শৈবাল স্পিরুলিনা চাষের শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিসিএসআইআর’র কাছ থেকে পদ্ধতিটি ইজারা নিয়ে কয়েকটি উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্পিরুলিনা উত্পাদন ও বাজারজাত করছে। বর্তমানে বিসিএসআইআর গবেষণাগারের অধীনে বায়োলজিক্যাল রিসার্চ ডিভিশনের বিজ্ঞানীরা স্পিরুলিনার ব্যাপক কার্যকর ভূমিকা নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কি পরিমাণ খাওয়া প্রয়োজন?
১. পুষ্টিহীনতা প্রতিরোধে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক ১-৩ গ্রাম।
২. রক্তস্বল্পতা রোধে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক ৩-৪ গ্রাম।
৩. রাতকানা রোগ প্রতিরোধে ১-৬ বছরের শিশুদের জন্য দৈনিক আধা গ্রাম।
৪. ৭-১১ বছরের শিশুদের জন্য দৈনিক ১ গ্রাম।
৫. ১২ বছরের ঊর্ধ্বে দৈনিক ১ থেকে দেড় গ্রাম।
৬. ডায়াবেটিসে প্রতিদিন ২-৩ গ্রাম।
৭. বাত, আলসার, হেপাটাইটিস, উচ্চরক্তচাপ কমাতে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক ৩-৪ গ্রাম।
৮. স্থূলতা প্রতিরোধে প্রতিদিন ৩ গ্রাম স্পিরুলিনার গুঁড়া প্রতিবেলার খাবারের আধঘণ্টা আগে খেতে হবে।
তবে স্বাভাবিজ ডোজ হল: ৩ থেকে ৫ গ্রাম দৈনিক। এই মাত্রাকে ভাগ করে দিনে ২ থেকে ৩ বার নিতে হবে। স্পিরুলিনা খাওয়ার সময় পর্যপ্ত পরিমান পানি খেতে যাতে তা তাড়াতাড়ি শোষিত হয়।
সতর্কতা:
শুকনা ও পরিষ্কার পাত্রে স্পিরুলিনা রাখতে হবে। বাতাস বা পানির সংস্পর্শে শুকনা স্পিরুলিনা খাওয়া যাবে না। বেশি মাত্রায় লৌহ ও ভিটামিনের কারণে ব্যবহারকারীর স্পিরুলিনা সহ্য না হলে স্পিরুলিনা খাওয়ার মাত্রা বা পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
স্পিরুলিনা খাওয়া আরম্ভ করলে প্রথম কয়েকদিন পেটে একটু ভুটভাট করতে পারে। নিরুৎসাহী না হয়ে খাওয়া চালিয়ে গেলে পরবর্তীতে এই সমস্যা থাকবে না।
বিদ্র: বাজারে বিভিন্ন কোম্পানীর স্পিরুলিনা পাওয়া যায়। তাই কেনার আগে ভাল এবং মানসম্মত কোম্পানীর স্পিরুলিনা কেনা উচিত।
বাণিজ্যিক ভিত্তিতে যারা উৎপাদন করছে :
এভারগ্রিন এন্টারপ্রাইজ, সাভার, লাইফ লাইন ইন্টারন্যাশনাল (প্রজেক্ট বিল্ডার্স লিঃ), লাঙ্গলবন্দ, সোনাগাঁও, নেচার ফুড প্রোডাক্টস, ধামরাই, ওয়ান্ডার হার্বস, নয়াপুর, সোনারগাঁও, ইউরেকা ইন্টারন্যাশনাল, ধউর, উত্তরা, গ্রিনটেক গ্রিনহাউস বাংলাদেশ লি.।
যেখানে পাওয়া যাবে:
১. লাজ ফার্মা : কলাবাগান, ঢাকা।
২. সিভিক পয়েন্ট : সায়েন্স ল্যাবরেটরি পুলিশ বক্স সংলগ্ন, মিরপুর রোড।
৩. নেচার ফুড প্রোডাক্টস : স্পেকট্রাম ইন্টারন্যাশনাল, নোয়াব ম্যানশন (২য় তলা), ৩৪ গ্রিন রোড, ধানমন্ডি।
৪. লাইফ লাইন ইন্টারন্যাশনাল : বিক্রয় কেন্দ্র, ৬৯২/ বি, বড় মগবাজার।
তথ্যসূত্র:
(১)স্পিরুলিনা
(২) স্পিরুলিনা’র স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী দিকসমূহ
(৩) ‘সুপারফুড’ স্পিরুলিনা বাড়ির ছাদেই হবে
(৪) স্পিরুলিনা ভালো না খারাপ?

ছবি: উইকিপিডিয়া থেকে.....
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




