
ইসলামী আইন যেহেতু পুরুষকে কর্তা বা পরিচালক বানিয়েছে এবং তার ওপর স্ত্রীর মোহরানা, ভরণ-পোষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখা শোনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে সেহেতু তা পুরুষকে স্ত্রীর ওপর এমন কতকগুলো ক্ষমতা ও এখতিয়ার প্রদান করেছে, যা পারিবারিক জীবনের শৃংখলা বজায় রাখতে, পরিবারে সদস্যদের আমল-আখলাক, চাল-চলন ও সামাজিকতা সংরক্ষণে এবং নিজেদের অধিকারসমূহ বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য তার হাতে থাকা প্রয়োজন। ইসলামী আইনে এসব এখতিয়ারের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং যে সীমার ভেতর এ ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে তাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
১. উপদেশ, সদাচরণ ও শাসনঃ স্ত্রী যদি তার স্বামীর আনুগত্য না করে অথবা তার অধিকার খর্ব করে, তাহলে এ অবস্থায় স্বামীর প্রথম কর্তব্য হচ্ছে তাকে উপদেশ দেয়া। সে তা অমান্য করলে স্বামী তার ব্যবহারের প্রয়োগফল অনুযায়ী কঠোরতা অবলম্বন করবে। এরপরও যদি সে তা মান্য না করে তাহলে তাকে হালকা মারধরও করতে পারে।
“আর তোমরা যে সমস্ত নারীর অবাধ্যহওয়ার আশংকা করো, তাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করো, বিছানায় তাদের থেকে দূরে থাকো এবং প্রহার করো। অতপর যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়ে যায় তাহলে তাদের ওপর নির্যাতন চালাবান অজুহাত তালাশ করো না”।–সুরা আন নিসাঃ ৩৪
এ আয়াতে ‘বিছানায় তাদের ছেড়ে দাও’ বলে শাস্তিস্বরূপ সহবাস বর্জন করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু ‘ঈলা’র আয়াত পৃথক বিছানায় রাখার জন্য একটি স্বাভাবিক সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ মুদ্দত চার মাস। যে স্ত্রী এতটা অবাধ্য ও উদ্ধত মস্তিষ্ক যে, স্বামী অসন্তুষ্ট হয়ে তার সাথে শোয়া পরিত্যাগ করেছে এবং সে এও জানে যে, চার মাস পর্যন্ত এ অবস্থায় বিদ্যমান থাকার পর আল্লাহ তায়ালার নির্দেশানুযায়ী স্বামী তাকে তালকা দিবে, এরপরও সে নিজের অবাধ্যাচরণ থেকে বিরত হয় না, তাকে বর্জন করাই উপযুক্ত কাজ। চার মাসের সীমা আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষার জন্য যথেষ্ট। এর চেয়ে অধিক কাল পর্যন্ত শাস্তি দেয়া নিস্প্রয়োজন। এতদিন পর্যন্ত তার অবাধ্য আচরণের ওপর অবিচল থাকার পরিণাম হচ্ছে তালাক। এটা জানা সত্ত্বেও সংশোধন না হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, তার মধ্যে আদব-কায়দা শেখার যোগ্যতাই নেই অথবা অন্তত এ স্বামীর সাথে সে সৌজন্যপূর্ণ জীবন যাপন করতে সক্ষম নয়। অনন্তর যে উদ্দেশ্যে একজন পুরুষকে একজন নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়- এ স্ত্রীর মাধ্যমে সেই উদ্দেশ্যে ব্যাহত হওয়ার আশংকা আছে। এ অবস্থায় স্বামীর যৌনস্পৃহা পূরণ করার জন্য কোন অবৈধ পথে ঝুঁকে পড়ারও আশংকা রয়েছে। স্ত্রীও কোন নৈতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে পড়তে পারে এবং এও আশংকা আছে যে, যেখানে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে যে কেউ এতটা জেদী ও উদ্ধত সেখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রেম, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি না হওয়ারই কথা। উল্লেখ্য যে, স্বামী নিজেই যদি ইসলামের গন্ডির মধ্যে না থাকে, স্ত্রী যদি দেখেন যে তার স্বামী অসৎপথে আছে তাহলে সে অবশ্যই স্বামীকে পরিত্যাগ করতে পারবে।
দ্বিতীয় শস্তি, যার অনুমতি অত্যন্ত কঠিন অবস্থায় দেয়া হয়েছে, তা হচ্ছে মারধোরের শাস্তি। কিন্তু নবী করীম (স) এজন্য শর্ত আরোপ করেছেন যে, বেদম মার যেন না হয়।
“যদি তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের কোন ন্যায়সংগত আদেশের ‘বিরুদ্ধাচরণ করে তাহলে তাদেরকে এরূপ মারধোর করো যেন তা অধিক যন্ত্রণাদায়ক না হয়। মুখাবয়বে আঘাত করা যাবে না এবং গালি-গালাজও করা যাবে না”।
এ দুই ধরনের শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা পুরুষকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উল্লিখিত নির্দেশ অনুযায়ী অবাধ্যতা ন্যায্য অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট হলেই কেবল শাস্তি দেয়া যাবে। ন্যায়-অন্যায় প্রতিটি আদেশ মানার জন্য জোর-জবরদস্তি করা যাবে না এবং স্ত্রী তা অমান্য করলেই তাকে শাস্তি দেয়া যাবে না। তাছাড়া অপরাধ ও শাস্তির মধ্য সামঞ্জস্য থাকতে হবে। ইসলামী আইনের মূলনীতিসমূহের মধ্যে এও এক মূলনীতিঃ
“যে কেউ তোমাদের সাথে বাড়াবাড়ি করে তোমরাও তার সাথে অনুরূপ পরিমাণ বাড়াবাড়ি করো”।–সূরা আল বাকারাঃ ১৯৪
বাড়াবাড়ির তুলনায় অধিক শাস্তি দেয়া হচ্ছে যুলুম। যে অপরাধের ক্ষেত্রে উপদেশই যথেষ্ট সেখানে কথাবার্তা বন্ধ রাখা যেখানে কথাবার্তা বন্ধ রাখাই যথেষ্ট সেখানে সহাবস্থান বর্জন করা এবং যে ক্ষেত্রে বিছানা পৃথক করে দেয়াই যথেষ্ট সেখানে মারধোর করা যুলুম পরিগণিত হবে। কেননা মারধোর হচ্ছে সর্বশেষ শাস্তি, যা কেবল মারাত্মক ও অসহনীয় অপরাধের জন্যই দেয়া যেতে পারে। কিন্তু সেখানেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এ সীমালংঘর করলে স্বামীর বাড়াবাড়ি হবে এবং এ ক্ষেত্রে স্ত্রী তার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেয়ার অধিকারিণী হবে।
২. তালাকঃ পুরুষকে দ্বিতীয় যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা হলো, যে স্ত্রীর সাথে সে মিলেমিশে বসবাস করতে পারবে না তাকে তালাক দিবে। যেহেতু পুরুষ তার নিজস্ব ধন-সম্পদ ব্যয় করেই স্বামীত্বের অধিকার বর্জন করে, সেহেতু সে সমস্ত অধিকার থেকে হাত গুটিয়ে নেয়ার ক্ষমতাও তাকে দেয়া হয়েছে। একদল লোক পাশ্চাত্যের অনুকরণে এটা চাচ্ছে যে, তালকা দেয়ার ক্ষমতা স্বামীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আদালতকে দেয়া হোক। যেমন তুরস্কে এরূপ করা হযেছে। কিন্তু এটা চূড়ান্তরূপে কুরআন ও সুন্নাতের পরিপন্হী। এ থেকে পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, তালাক দেয়ার ক্ষমতা কেবল স্বামীকে দেয়া হয়েছে।
আবার কুরআন পরিষ্কার ভাষায় স্বামীর সম্বন্ধে বলে “বিবাহের বন্ধর তার (স্বামীর) হাতে”।–সূরা আল বাকরাঃ২৩৭
এখন কার এ অধিকার আছে যে, এ বন্ধনকে তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বিচারকের হাতে তুলে দিবে? ইবনে মাজা গ্রন্হে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা), থেকে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। এক ব্যক্তি নবী করীম (স)-এর কাছে এসে অভিযোগ করলো, “আমার মালিক তার এক দাসীকে আমার সাথে বিবাহ দিয়েছিল। এখন সে তাকে আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়”। এ প্রসংগে রাসূলূল্লাহ (স.) তাঁর ভাষণে বললেনঃ
“হে লোকেরা! এ কেমন অদ্ভূত কথা যে, তোমাদের কেউ নিজের দাসীকে স্বীয় দাসের সাথে বিবাহ দেয়, আবার উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে চায়? অথচ তালাকের ক্ষমতা কেবল স্বামীদেরই”।
এ হাদীসটি যদিও সনদের দিক থেকে মযবূত নয়, কিন্তু কুরআনের নির্দেশের সাথে এর সামাঞ্জস্য একে শক্তিশালী করেছে। সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স.) বাণী অনুযায়ী তালাক দেয়ার ক্ষমতা স্বামীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বিচারালয়ের হাতে তুলে দেয়া কখনো জায়েয নয়। যুক্তির দিক থেকেও তা হচ্ছে ভ্রান্ত পদক্ষেপ। এর পরিণাম এছাড়া আর কি হতে পারে যে ইউরোপের মত আমাদের এখানেও পারিবারিক জীবনের লজ্জাকর বিবাদসমূহ ও অশোভনীয় ঘটনাবলী প্রকাশ্য আদালতের সামনে প্রচারিত হতে থাকবে?
নারীকে এ ক্ষমতা দেয়া যেতে পারে না। কেননা যদি সে তালাক দেয়ার অধিকারী হতো তাহলে সে পুরুষের অধিকার খর্ব করার ব্যাপারে নির্ভীক হয়ে যেত। এটা সুস্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি নিজের অর্থ ব্যয় করে কোন জিনিস হাসিল করে, সে তা রক্ষা করার জন্য শেষ চেষ্টা করে যাবে এবং কেবল তখনই তা ত্যাগ করবে যখন তা বর্জন করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকবে না। কিন্তু যদি অর্থ ব্যয় করে এক পক্ষ এবং তাদ্বারা হাসিল করা বস্তু ধ্বংস করার ক্ষমতা অপর পক্ষের জুটে যায়, তাহলে এ দ্বিতীয় পক্ষের কাছ থেকে এটা কমই আশা করা যায় যে, সে নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করার বেলায় অর্থ ব্যয়কারী প্রথম পক্ষের লাভের প্রতি দৃষ্টি রাখবে। সুতরাং পুরুষের হাতে তালাক প্রদান করা শুধু তার ন্যায্য অধিকার রক্ষা করাই নয়, বরং এর ভেতর আর একটি বিচক্ষণতা নিহিত রয়েছে যে, এতে তালাকের ব্যবহার ব্যাপকভাবে হবে না।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




