somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন নকিব
নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

বৈধ ভালোবাসা এবং অবৈধ প্রেম। ব্লগে দু'শতম পোস্টে সকলকে অভিনন্দন এবং সকলের জন্য অব্যহতভাবে শুভকামনা।

০৫ ই অক্টোবর, ২০১৮ বিকাল ৪:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



'ভালোবাসা' চার অক্ষরের খুব ছোট একটি শব্দ। কিন্তু এই শব্দটি বাঁচিয়ে রাখে পৃথিবীকে। বিশ্ব জগতকে। তামাম জগত জাহানকে। 'ভালোবাসা' আরবি 'মুহাব্বত'। ইংরেজীতে Love। অর্থ- অনুভূতি, আকর্ষণ, হৃদয়ের টান; যা মানুষের অন্তরে আল্লাহ পাক সৃষ্টিগতভাবে দিয়ে দেন। সাধারণত ভালোবাসা দুই ধরনের: (১) বৈধ ও পবিত্র (২) অবৈধ ও অপবিত্র।

নারী পুরুষের বিবাহ বহির্ভূত অবাধ মেলামেশা ও সম্পর্কের ফলে সৃষ্ট ভালোবাসাকে অবৈধ ও অপবিত্র ভালোবাসা বলা যেতে পারে।

পক্ষান্তরে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ পাক, সাইয়্যিদুল আমবিয়া ওয়াল মুরসালীন মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি ভালোবাসা, মাতা-পিতা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজনসহ সৃষ্টিজগতের প্রতিটি সদস্যের প্রতি হৃদয়ের যে টান, ভালোবাসা তাকে পবিত্র ভালোবাসা বলা যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি ভালোবাসা:

আর পবিত্র ভালোবাসা বলতে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি ভালোবাসা, সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার ভালোবাসা, স্বামী-স্ত্রী একের প্রতি অপরের ভালোবাসা ইত্যাদিকে বুঝায়। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সৃষ্টির সেরা মাখলুক হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। অন্য কোন জীব জন্তুকে আমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেননি। এমনকি সর্ব শ্রেষ্ঠ এবং আখেরী নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অনুসারীও আমাদেরকে বানিয়েছেন। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত সর্ব প্রথম এই নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা মহান আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসা এবং আমাদের নবী ও হাবীবে মাওলা, আখেরী রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসা। আল্লাহ পাক কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন:

ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁَﻣَﻨُﻮﺍ ﺃَﺷَﺪُّ ﺣُﺒًّﺎ ﻟِﻠَّﻪِ ‍

যারা ঈমানদার মুমিন, তাদের অন্তরে আল্লাহর মহব্বত ভালোবাসা হবে সর্বাধিক প্রগাঢ়। সূরা আল বাকারা। (আয়াত সূরা আল বাকারা: ১৬৫)

আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:

'কোন লোক পূর্ণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না সে নিজের জীবন এবং পরিবার পরিজনের চেয়ে আমাকে বেশী ভালোবাসবে।'

এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসা প্রতিটি মুসলমানের আবশ্যিক কর্তব্য তথা ফরয দায়িত্ব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার অর্থ হচ্ছে তার সুন্নত ও আদর্শের অনুসরণ করা। আর যে ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নতের বেশী অনুসরণ করবে তাতে বুঝা যাবে তার অন্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর প্রতি প্রেম-ভালোবাসা অধিক গাঢ়। পক্ষান্তরে যারা নবীজির সুন্নতের অনুসরণ করেন না, তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ তথা, শরীয়ত মানেন না শুধু লোক সমাজে মুখে আশিকে রাসূল, আশিকে নবী তথা নবী প্রেমিক দাবী করেন প্রকৃতপক্ষে তারা আশিকে রাসূল নন। তারা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরনকারী ধোকাবাজ মাত্র। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

'যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরায়, সে আমার উম্মত নয়।'

অন্য হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইরশাদ বর্নিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‌

'যে আমার সুন্নাতকে ভালবাসলো, সে যেন আমাকে ভালোবাসলো, আর যে আমাকে ভালোবাসলো সে আমার সাথে বেহেশতে থাকবে।'

মাতা পিতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা:

আল্লাহ পাক ও রাসূলে মাকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরেই রয়েছে মাতা-পিতার প্রতি ভালোবাসা বা মহব্বতের ফযিলত। প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

'সে ব্যক্তি নিপাত যাক! সে ব্যক্তি নিপাত যাক! সে ব্যক্তি নিপাত যাক!'

সাহাবারা আরজ করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে ব্যক্তি কে?'

তিনি বললেন, 'মাতা- পিতাকে জীবিত পেয়েও তাদের সেবা-যত্ন করে যে জান্নাত খরিদ করেনি।'

এক হাদিসের ভাষ্যে জানা যায়, 'তিন ব্যক্তির দুআ আল্লাহ পাক ফিরিয়ে দেন না। বরং অনিবার্যভাবে কবুল হয়। ১. মুসাফিরের দুআ, ২. মাজলূমের দুআ এবং ৩. সন্তানের জন্য মাতা-পিতার দুআ।'

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পারিক ভালবাসা:

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

'স্বামী-স্ত্রী পরস্পর মহব্বতের সাথে আলাপ-আলোচনা করা, কথা-বার্তা বলা নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।'

অন্য হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

'যে মহিলা (স্ত্রী) তার স্বামীকে সন্তুষ্ট রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় সে অবশ্যই বেহেশতে প্রবেশ করবে।'

সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার ভালোবাসা:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ সন্তান ফাতিমাকে অত্যাধিক ভালোবাসতেন। তিনি স্বীয় জবানে ইরশাদ করেন,

'ফাতিমা আমার কলিজার টুকরা, তাকে কেউ কষ্ট দিলে আমাকেই কষ্ট দেয়া হবে।'

নবীজির পাক জবানের বর্ণনায় ফুটে উঠে যে সন্তানকে ভালোবাসা সাওয়াবের কাজ। পক্ষান্তরে আমাদের সমাজে বেগানা যুবক-যুবতীর প্রেম-ভালোবাসার নামে যে পাশ্চাত্যের নষ্ট সংস্কৃতি উত্তাল সাগরের উর্মিমালার মত আছড়ে পড়ছে তা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ ও হারাম। বিবাহের পূর্বে এরূপ প্রেম-ভালোবাসা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ন অবৈধ। ইসলামের বিধি-বিধান অনুযায়ী, বিবাহ বহির্ভূতভাবে, কিংবা বৈবাহিক সম্পর্ক ব্যতিত কোনো যুবতী কোনো অবস্থায় কোনো যুবকের সান্নিধ্যে থাকতে পারে না। উমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা অানহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'কোন পুরুষ যখন কোন নারীর সাথে একান্তে থাকে, তখন তাদের মাঝে তৃতীয় জন হিসেবে উপস্থিত হয় স্বয়ং শয়তান। সে তাদের মাঝে ভাবাবেগকে উৎসাহিত করে এবং উভয়ের মাঝে খারাপ কুমন্ত্রণা দিতে থাকে এবং সর্বশেষে লজ্জাকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটায়।'

আদদাইয়ুসু লা- ইয়াদখুলুল জান্নাহ:

এই অবাধ মেলামেশার ফলে যুবক যুবতীগন নিজেরা যেমন কঠিন গোনাগার হবে, তেমনি তাদেরকে এই মেলামেশার সুযোগ দেয়ার কারণে তাদের পিতা-মাতা ও অভিভাকগনও কুরআন হাদিসের আলোকে কঠিন অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হবেন। এই শ্রেনির পিতা মাতা এবং অভিভাবকদের হাদীসের পরিভাষায় 'দাইয়ুস' আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর দাইয়ুসের পরিনতি সম্পর্কে হাদিসে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে,

'আদদাইয়ুসু লা- ইয়াদখুলুল জান্নাহ।' অর্থ- 'দাইয়ুস জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।'

এজন্যই নারী পুরুষ উভয়ের পর্দার বিধান:

তাই এসব ব্যাপারে সকলের কঠোরভাবে সাবধান হওয়া জরুরী এবং এটা অবশ্যই ঈমানের দাবী। আর এই অবৈধ ভালোবাসার সর্বব্যাপী সয়লাব প্রতিরোধের জন্যই আল্লাহ পাক নর-নারীকে দিয়েছেন পর্দার বিধান। এই বিধান নারী-পুরুষ উভয়ে পরিপূর্ণরূপে পালন করলে সমাজে ঐরকম অবৈধ ভালোবাসার কোন অবকাশই থাকতে পারে না।

বর্তমান সময়ের তথাকথিত আধুনিকতার ছদ্মবেশী কিছু লোকের ধ্যান ধারনা ভিন্নরকম। তাদের মন্তব্য যে, প্রেম- ভালবাসা নাকি বৈধ, তাদের উক্তি হল, প্রেম পবিত্র, ভালোবাসা পবিত্র। তাদের এসব কথা আপাত দৃষ্টিতে সুন্দর মনে হলেও এই কথাগুলোর ভেতরটা অন্ত:সারশুন্য। প্রেম-ভালোবাসা পবিত্র -এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তা কখন? কোন্ প্রেম পবিত্র? বিবাহ বহির্ভূত প্রেম? যুবক-যুবতীদের অবাধ মেলামেশাকে পবিত্র প্রেম বলতে চান তারা? তাহলে নষ্টামী বলা হবে কোনটিকে? তাদের তথাকথিত ধ্যান-ধারনা সম্পূর্ণ ভুল। তারা যে অশ্লীলতাকে পবিত্র প্রেমের নামে, ভালোবাসার নামে চালিয়ে দিতে চান তা নি:সন্দেহে নাজায়িয, অবৈধ, অপবিত্র এবং ইসলাম বিরোধী। এই জাতীয় সম্পর্ককে ভালোবাসা বলারও কোনো সুযোগ নেই। এগুলোকে বড় জোড় নোংড়ামো বলা যেতে পারে। আর এসব কখনও বৈধ হওয়ার প্রশ্নও আসে না। বস্তুত: নর-নারীর এ ধরনের বিবাহ বহির্ভূত প্রেম ভালবাসার কোনো স্থান ইসলাম ধর্মে অন্তত: নেই। তবে হ্যা, কেউ চাইলে তার মনের মত জীবন সঙ্গী কিংবা সঙ্গীনী পছন্দ করে রাখতে পারেন বটে। কিন্তু তার সাথে বিবাহের পূর্বে কোন রকম প্রেম-প্রেম খেলা শুরু করার সুযোগ এখানে আদৌ নেই। কেননা বিবাহের ইচ্ছা থাকলেও বিবাহ না করা পর্যন্ত এভাবে প্রেম- ভালোবাসা করা গুনাহে কবিরা ও হারাম। এমনকি বিবাহের কথা পাকাপাকি হয়ে গেলেও আকদ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোন প্রেম-ভালোবাসা জায়িজ নয়। হতে পারে, শেষ মুহূর্তে এসে কোনো কারনে বিবাহটা হল না। ভেঙ্গে গেল। তখন কি হবে? এজন্য বিবাহের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী হওয়ার পরই কেবল প্রেম-ভালোবাসা করতে পারে এবং তা পবিত্র। সাওয়াবের কাজও বটে।

একটি বাস্তব ঘটনা:

সাম্প্রতিক একটি ঘটনা। এক মেয়ে তার এক ক্লাসমেটের গল্প বললো এভাবে – 'তার সাথে দেখা হয়। ভাল-মন্দ আলাপের এক পর্যায়ে সে আমাকে এভাবে বলতে শুরু করল'-

'জানিস মালিহা, কিছুদিন আগে আমি নানার বাড়িতে গিয়েছিলাম, সেখানে আমার মামাতো খালাতো বোনেরাও ছিল। তাদের সাথে দেখা সাক্ষাত হয়। তাদেরকে পেয়ে আনন্দে মেতে উঠি। এই সেই অনেক গল্প হয়। তাদের মাঝে শাহিনা নামের এক বোনের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।'

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম- 'কিরে শাহিনা! বর কি তোকে দেখেছে?'

তখন সে বলল, 'দেখেছে মানে! বলিস কি! আমাদের তো প্রতিদিনই ফোনে কথা হয়। দেখা-সাক্ষাতও করেছি।'

আমি বললাম, 'এটা ঠিক হয়নি। জানিস না- বিবাহের পূর্বে এসব করা নাজায়িজ, হারাম?'

'তখন তারা সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। তাদের এই হাসির কারণ আমি বুঝতে পারলাম না।'

আমাকে কিছুটা অপ্রস্তুত দেখে শাহিনা বললো, 'আরে, আমাদের বিয়ের তো সব কিছুই ঠিক, এখানে আবার গুনাহের কি আছে? তাছাড়া যদি বিয়ের আগে প্রেম না করি, তাহলে একে অপরকে জানবো কেমন করে? হঠাৎ করে অপরিচিত একজনের সাথে সংসার করবো কেমন করে? তাছাড়া প্রেম-ভালোবাসা তো পবিত্র!'

তখন সবাই এক সাথে বলল- 'হ্যাঁ, তাইতো। প্রেম ভালোবাসা তো পবিত্র।'

তারা যুক্তি দেখিয়ে বললো- 'তুই কি জানিস না, নবীরাও তো প্রেম করেছেন! ইউসুফ-জুলাইখার প্রেমের কাহিনী পড়িসনি? ইউসূফ আলাইহিস সালাম নবী হয়ে যখন প্রেম করলেন তাহলে অবশ্য অবশ্যই প্রেম পবিত্র!'

আমি বললাম, 'বলিস কি, ইউসুফ আলাইহিসসালাম প্রেম করেছেন? তা কি এই প্রেম? আমি তো জানি, তাঁর প্রেম ছিল। তবে তা ছিল আল্লাহর সাথে!'

তারা বললো, 'তাহলে কোন্ প্রেম? তিনি যে প্রেম করেছেন তা পালাগানে শুনিসনি? ঐ যে, শিল্পীর কন্ঠের গান- প্রেম করেছেন ইউসুফ নবী, যার প্রেমে জুলেখা বিবি, শোনোনি? এগুলো কি মিথ্যা?'

'শুনেছি। কিন্তু এসবের অধিকাংশই মিথ্যা!' -বললাম আমি।

'আজগুবি কথা!' -বললো তারা।

আমি তাদেরকে বুঝিয়ে বললাম- 'নারীঘটিত যে প্রেমের কথা আমাদের সমাজে ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে প্রচলিত তিনি কখনও আসলে এমন নোংড়া প্রেম করেননি। বরং তাঁর প্রেম ছিল, এবং তা ছিল স্রেফ আল্লাহ পাকের সাথে। কুরআনের ভাষ্যে বুঝা যায়, তিনি আযীযে মিশরের স্ত্রীর একতরফা আবেগের শিকার হয়ে আল্লাহ পাকের কাছে অবৈধ সম্পর্কের মন্দ পরিনতি থেকে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন। ফলে আল্লাহ পাক তাকে পবিত্রই রেখেছিলেন। আজিজে মিশরের স্ত্রী বিভিন্নভাবে তাঁকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত বাদশাহ পত্নী নিজের অবৈধ খাহেশ পূরনের লক্ষ্যে ইউসুফ আলাইহিস সালামকে একটি কামরায় আবদ্ধ করে সুকৌশলে দরজা বন্ধ করে দেন। নিরুপায় ইউসুফ আলাইহিস সালাম জুলাইখার হাত থেকে বাঁচার জন্য যখন আবদ্ধ কামরা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দৌড় দেন, আল্লাহ পাককে নিবিষ্ট মনে স্মরন করেন, বন্ধ দরজা আল্লাহ পাকের কুদরতে আচমকা খুলে যায়। তিনি বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন। আর এর ফলে তাঁকে কঠিন পরিনতি ভোগ করতে হয়। মিথ্যে ষড়যন্ত্র করে সম্পূর্ন অন্যায়ভাবে তাকে সুদীর্ঘ নয়টি বছর জেলে পুড়ে রাখা হয়।'

আমি বলে চললাম- 'সুতরাং, আমাদের সমাজের যেসব অজ্ঞ মূর্খগন আল্লাহর নবী ইউসুফ আলাইহিস সালাম এর পবিত্র চরিত্রে কালিমা লেপনের অপচেষ্টায় ইনিয়ে বিনিয়ে সত্য মিথ্যের মিশ্রনে চমকপ্রদ নানান গল্প কাহিনী ছড়িয়ে বেড়ান, তা ডাহা মিথ্যা। তাঁর মত মহান চরিত্রের একজন নবীর চরিত্রে পাপের ছিটেফোটাও ছিল না। সত্যি কথা হচ্ছে, আল্লাহ পাক সকল নবী রাসূলকে পাপমুক্ত রেখেছেন নিজ কুদরতে। ইউসুফ আলাইহিসসালামও তার বাইরে নন।'

তারা অবাক এবং হতবুদ্ধি হয়ে বললো- 'এত কিছু তো জানতাম না রে!'

আসলে আমাদের সমাজের বাস্তবতা এমনই। অধিকাংশ লোকই ধর্মীয় জ্ঞান না থাকার কারণে তারা ইউসুফ- জুলাইখাকে দিয়ে প্রেমের বৈধতার যুক্তি দেয়। অথচ তারা জানেনা, ইউসুফ আলাইহিসসালাম এই ঘটনায় আদৌ জড়িত কি না! কিংবা জুলাইখার এই ভালোবাসার রহস্য কি! অথবা, কত বছর আগে জুলাইখা ইউসুফ আলাইহিসসালামকে স্বপ্নের মধ্যে সান্নিধ্য লাভ করেছেন? তার ভালোবাসা বর্তমান যুগের যুবক-যুবতীর প্রেম ভালোবাসার মত কি না। আর এসব কিছু সঠিকভাবে না জানার ফলেই তারা প্রেম-ভালোবাসা পবিত্র বলে বলে অবৈধ প্রেম করে বেড়াচ্ছে। এ ধরনের অবৈধ প্রেম-ভালোবাসায় জড়িত হয়ে অনেক তরুণ-তরুণীর জীবন অকালে ঝড়ে পড়ছে। তাদের লেখা-পড়ার ক্ষতি হচ্ছে, সময়ের অপচয় হচ্ছে। চরিত্র নষ্ট হচ্ছে। এমনকি সাজানো সংসার পর্যন্ত ভেঙ্গে চুরমার হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হল- ঈমানের জ্যোতি নিভে যাচ্ছে। দীনদারিত্ব নষ্ট হচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে সত্যিকারের ভালোবাসা বলতে যা বুঝায়- বর্তমান যুবক-যুবতীদের এই অবৈধ মেলামেশার নাম কোনোভাবেই সেই ভালোবাসা নয়। প্রায়শই এসব ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের এই ভালোবাসায় অভিভাবকদের সম্মতি থাকে না বিধায় মাতা-পিতা এবং অভিভাবক, আত্মীয়-স্বজনের মুখে চুনকালি দিয়ে যুবক যুবতীরা পারিবারিক মান-সম্মানের দিকে না তাকিয়ে এক পর্যায়ে নিজেদের ভালোলাগার পরিনতিকে চূড়ান্ত রূপ দিতে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। ঘর-সংসার-সমাজ থেকে পালিয়ে যায়। এরপরে কিছু দিন যেতে না যেতে যখন অবৈধ প্রেমের আবেগ আর নেশা কেটে যায়, তখন তাদের জীবনাকাশে কালো মেঘের ছায়ার মত নেমে আসে নানাবিধ অস্বস্তি ও যন্ত্রণা। তখন বেজে ওঠে বিচ্ছেদের দামামা। ছিন্ন হয়ে যায় পারস্পারিক সম্পর্ক। মেয়েটি পড়ে কঠিন থেকে কঠিনতর বিপদে। না বাপের সংসারে যেতে পারে। না একসময়ের ভালোবাসার মানুষ সেই যুবকটি তাকে গ্রহন করে। কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়ে তার উঠতি জীবন। সর্বনাশা অবৈধ প্রেমে যুবক-যুবতী দু'জনেই একুল-অকুল সর্বস্ব হারায়।

আজকের সমাজে কেন এত হানাহানি?

এসিড নিক্ষেপের মত জঘন্য ঘটনাগুলো কেন ঘটে? একটু গভীরে তাকিয়ে দেখলে পরিষ্কার হয়ে যাবে, এসিড সন্ত্রাসের পেছনে অন্যান্য কারনের চেয়ে অবৈধ ভালোবাসা, একপর্যায়ে ভেঙ্গে যাওয়া বিবাহ বহির্ভূত দৈহিক সম্পর্ক ইত্যাদি কারন অধিক। প্রেমের প্রধান উৎস হচ্ছে আবেগ। আর প্রচন্ড এই আবেগই হচ্ছে প্রেমের চালিকাশক্তি। কিন্তু গভীর এই আবেগকৃত প্রেমের গভীরতা যখন থেমে যায়, তখন প্রেমের বদলে জন্ম নেয় মোহ। কচুপাতার পানির মত এক সময় ঝড়ে পড়ে এই মোহও। তখন স্বপ্ন-সাধ-আশা-ভালোবাসা সবই হয়ে যায় পানসে-বিবর্ন-ঘোলাটে। হয়ে যায় চুর্ণ। কেউ কেউ আবার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখায়। আত্মনিয়ন্ত্রন হারিয়ে কেউ কেউ প্রতিশোধস্পৃহায় মেতে ওঠে। এসিড নিক্ষেপ, খুন-খারাবি কিংবা যুবতীর বিবাহ ভেঙ্গে দেয়ার মত জঘন্যতর কাজে লিপ্ত হয়। কেউ চিরকুমার থেকে যায়। কেউ করে আত্মহত্যা। হায়রে ভালোবাসা! বুঝে আসে না, কি করে বিনা বিবেচনায় আজকের তরুণ-তরুণীরা বরণ করে নেয় অবৈধ প্রেমের এই জটিল পথ!

অবৈধ প্রেমে যারা নিজের জীবন উৎসর্গ করছেন তাদেরকে বলছি:

আপনি কেন এ হারাম পথে চলছেন? পার্থিব জীবন ক্ষনস্থায়ী। এই জীবনের পরে এখানের সকল কিছুর হিসাব দিতে হবে। কেন অন্যায় পথে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে চান? আপনার মূল্যবান জীবন আল্লাহ পাকের নির্দেশিত পথে পরিচালিত করুন। মালিকের পথে উৎসর্গ করুন নিজের এই দামী জীবন। পরিনতিতে লাভ হবে মহান সৃষ্টিকর্তার ক্ষমা আর সন্তুষ্টি। আর তাঁর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি লাভের চেয়ে বড় আর কিছুই নেই। এটাই চূড়ান্ত সাফল্য। কুরআনের ভাষায়- 'ফাউযুন আজীম'। যে সাফল্যলাভের পরে আর থাকবে না কোন অশান্তি, কোন কষ্ট। শুধুই সুখ আর সুখ। শান্তি আর শান্তি।

ভালোবাসা চাই প্রতি দিন:

ভালবাসা বড় মহৎ একটি গুণ। ভালোবাসা চাই প্রতি দিন। বিশ্ব টিকে আছে মহান স্রষ্টার অপার করুনায়। করুনা বলছি। করুনা কি? করুনা মানে ভালোবাসা। তাঁর ভালোবাসায় জেগে ওঠে প্রতিটি দিন। ফুল ফোটে। পাখি গায়। নদী-ঝর্না বয়ে চলে অবিরাম। গ্রহ তারা চলে বেড়াচ্ছে তাদের অনন্ত গতিপথে। ভালোবাসা মহান আল্লাহর অপরূপ সৃষ্টি। আল্লাহ পাক এই ভালোবাসাকে একশত ভাগ করে নিরানব্বই ভাগ নিজের কাছে রেখেছেন। মাত্র একভাগ সারা বিশ্বের প্রাণীজগতে দান করে দিয়েছেন। যার দ্বারা মা সন্তানদেরকে ভালোবাসে, স্বামী-স্ত্রীকে ভালোবাসে, আত্মীয় স্বজন একে অপরকে ভালোবাসে। বাকি নিরানব্বই ভাগ ভালোবাসা মহান আল্লাহ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। কিয়ামতের দিন তা দ্বারা তিনি স্বীয় বান্দাদের প্রতি করুণা প্রদর্শন করবেন। ভালোবাসার বারিবর্ষন করবেন। মহান আল্লাহ প্রেম-ভালোবাসা নামক ধ্বংসাত্বক রোগের প্রতিরোধের জন্য পর্দা প্রথা দিয়েছেন। এরই মাধ্যমে বাঁচানো সম্ভব ব্যক্তি, পরিবার সমাজ এবং দেশকে। আল্লাহ পাক নারীদের উদ্দেশ্য করে বলেন-

ﻭَﻟَﺎ ﺗَﺒَﺮَّﺟْﻦَ ﺗَﺒَﺮُّﺝَ ﺍﻟْﺠَﺎﻫِﻠِﻴَّﺔِ ﺍﻟْﺄُﻭﻟَﻰ

'তোমরা জাহেলী যুগের ন্যায় নিজেদের প্রদর্শন করে বাইরে বের হয়ো না।' (আল- কুরআন)

যারা 'অবৈধ সম্পর্ক'কে 'পবিত্র ভালোবাসা' বলার দুঃসাহস দেখান এবং বলতে চান, প্রেম পবিত্র, শালীনতার সাথে প্রেম করলে তা নাজায়িয হবে কেন?

তাদেরকে বিনয়ের সাথে আবারও বলছি, এটা আপনাদের নিছক মুর্খতা ও সম্পূর্ণ অমূলক এবং অজ্ঞতাসূলভ ধারণা। অবৈধ ভালোবাসাকে কখনো পবিত্র বলা যায় না। যুবক-যুবতীর বিবাহ বহির্ভূত যে কোনো প্রকারের ভালোবাসা সম্পূর্ণ নাজায়িয এবং ইসলাম ধর্মে হারাম। একমাত্র বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমেই প্রেম-ভালোবাসা পবিত্র হতে পারে। বিয়ের আগে তা কোনোক্রমেই পবিত্র নয়। বরং হারাম ও কবিরা গুনাহ। এ বিষয়ে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতে সুখী হওয়ার পথ দেখাতে পারে আমাদের আন্তরিকতাপূর্ন সচেতনতা। আমরা যদি সচেষ্ট হই, দেশ ও সমাজকে পাপাচার থেকে মুক্তি দিতে পারবো এবং অনাগত প্রজন্মের প্রত্যেক শিশুকে সুন্দর ভবিষ্যত এবং কাঙ্খিত দেশ, সমাজ ও পরিবেশ উপহার দিতে পারবো। তাই আসুন, আমরা সবাই সচেতন হই এবং যুবসমাজকে সঠিকভাবে বাঁচার জন্য সুন্দর পথ দেখাই। অাল্লাহ পাক আমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।

ব্লগে দু'শতম পোস্টে সকলের প্রতি আন্তরিক শুভকামনা।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৫
১২টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

FIFA বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর ফাইনাল খেলা নিয়ে আমার সামান্য কিছু কথা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:২৮

গতকালের FIFA বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর ফাইনাল খেলায় মেসি অত্যন্ত নিষ্প্রভ ছিলেন। দর্শকদের তাকে মাঠে খুঁজতে হয়েছে, তিনি তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, মাঠের সর্বকোণে বল... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেতনা, ৭১ , পাকিস্তান ঘৃনা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:০৫


যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম দুটো দেশের অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হয় প্রায় একই সময়ে কিন্তু তুলনামূলক ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে ভালো ছিল। বাংলাদেশে ছিল অনেক ভারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকে আমার মন ভালো নেই

লিখেছেন সামিয়া, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



দুঃখের সময়ে নানান মানুষের কথা মনে পড়ে। খুব কাছের মানুষের কথা মনে পড়ে আবার অনেক দূরের মানুষের কথাও মনে পড়ে। রক্তের আপন মানুষের কথা তো মনে পড়েই তবু একদিন কীভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আজ খুশি ভাগ করতে এসেছি=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০৫



আসসালামু আলাইকুম। শুভ সন্ধ্যা। কেমন আছেন সবাই?

আলহা গত বৃহস্পতিবার আমি প্রমোশন পেয়েছি। অতিরিক্ত পরিচালক (৪র্থ গ্রেড)। খুশির সংবাদ জানাতে দেরি করে ফেলেছি সরি।

আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন, যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই।

লিখেছেন ইমরোজ৭৫, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:২০


আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই। ইন্টারনেট এর স্পিড খুবই কম। ফেসবুকে কেউ ভাইরাল হতে আসবে না। অল্প লেখায় নিজের মনোভাব ফেসবুকে পোস্ট করবে। কেউ আর পাকনা পাকনা কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×