
অন্যান্য দিনের মত একদিন। নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। উপবিষ্ট মসজিদে নববীতে। সাহাবীগনও তাঁর সামনে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান। সবার মনে তাঁর কথা শোনার আগ্রহ। নিরবতা ভেঙ্গে কথা বলে উঠলেন নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বললেন,
يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنّةِ.
‘তোমাদের মাঝে এখন আসবে একজন জান্নাতী মানুষ।’
নবীজীর মুখে একথা শুনে সবাই খুব উৎসুক হয়ে উঠেছিলেন, কে সেই সৌভাগ্যবান মানুষটি যাকে প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতী বললেন -তা দেখার জন্য। ইতিমধ্যে একজন আগমন করলেন, যিনি সবেমাত্র উযু করেছেন। দাড়ি বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে তাঁর। জুতা জোড়া বাম হাতে ভাঁজ করা। ধীরে ধীরে মসজিদের দিকে আসছেন। এ দরোজা দিয়েই প্রবেশ করলেন তিনি। নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মজলিসে শরীক হওয়ার জন্য। এবং বসে পড়লেন নবুয়তের ঐশী আলোয় উদ্ভাসিত মোবারক সেই জমায়েতে।
দ্বিতীয় দিন। নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘিরে বসে আছেন সবাই। পিনপতন নিরবতা দরবারে নববীজুড়ে। মৌমাছির মত জমে বসে আছেন অসংখ্য সাহাবী। তবু যেন কেউ নেই। প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গত দিনের মতই বললেন-
يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنّةِ.
‘এখন তোমাদের মাঝে একজন জান্নাতী মানুষের আগমন ঘটবে।’
দেখা গেল। এদিনও এলেন সেই মানুষটি। যিনি এসেছিলেন আগের দিন।
তৃতীয় দিন। গত দু’দিনের মত আজও। নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন। পূর্বের মত। সেই একই কথা। দেখা গেল নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার পরে। আজও আগমন ঘটলো। সেই একই ব্যক্তির। সেই মানুষটিই মজলিসে আগমন করলেন আজও।
কে এই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি? যিনি তিন তিনটি দিন, তিন তিনবার নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মুখে জান্নাতী হওয়ার সনদ পেলেন? তিনি আর কেউ নন। তিনি হচ্ছেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু।
হ্যাঁ, হযরত সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু! কেমন ছিলেন তিনি? কী ছিল তাঁর গুণ-বৈশিষ্ট্য? নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাঁর সম্পর্কে এই মহাসুসংবাদ দিলেন তার পরের জীবনটুকু কীভাবে কেটেছে? সংক্ষেপে বললে তিনি ছিলেন নবীজীর অত্যন্ত প্রিয় ও বিশ্বস্ত সাহাবী। স্বয়ং নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে গভীর মহব্বত করতেন। তিনিও নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালবাসতেন প্রাণ দিয়ে। মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি ইসলাম কবুল করেন। তাঁর ইসলাম কবুলের বিবরণও খুবই চমৎকার। দ্বীন-ঈমানের জন্য অতুলনীয় ত্যাগ স্বীকার করেছেন তিনি। জিহাদের ময়দানে ছিল তাঁর অসাধারণ নৈপুণ্য। নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সমরকুশলতার প্রশংসা করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনিই সর্বপ্রথম শত্রুর বিরুদ্ধে তীর নিক্ষেপ করেছেন।
বদর, ওহুদসহ বড় বড় যুদ্ধে নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে থেকেছেন। অংশগ্রহণ করেছেন গুরুত্বপূর্ন প্রতিটি জিহাদে। সেনাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন বিভিন্ন যুদ্ধে।
ইলমের দিগন্তে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন তিনি।
খলীফাতুল মুমিনীন হযরত উমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু -এর আমলে তিনি কুফার খণ্ডকালীন গভর্নর ছিলেন। এই সব কিছু সত্বেও তিনি ছিলেন সাদামাটা স্বভাবের একজন মানুষ। ৫৫ হিজরী সনে ৮২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। (দ্র. সিয়ারু আলামিন নুবালা, যাহাবী)
তাঁর জীবনটিই প্রমাণ করে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বাণী কত সত্য। তিনি যাকে জান্নাতী বলেছেন বাস্তবেও তাঁর জীবন জান্নাতী আমলের মধ্যেই অতিবাহিত হয়েছে।
যে ঘটনাটি বলার জন্য সামনে এগুচ্ছিলাম- নবী পাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মুখে হযরত সা‘দ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু সম্পর্কে এই মহা সুসংবাদ ঘোষিত হওয়ার পর যা ঘটলো; মজলিস শেষে হযরত সা‘দ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু যখন বাড়ির পথে রওয়ানা হলেন তখন সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু তাঁর পিছু পিছু হাঁটতে লাগলেন। তাঁর মনে একটিই প্রশ্ন- হযরত সা‘দ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু কী আমল করেন? কোন্ আমলের গুণে তিনি এই মহা সৌভাগ্য অর্জন করলেন? যে করেই হোক, এ প্রশ্নের উত্তর তাকে খুঁজে বের করতেই হবে! রহস্য উদঘাটনে তিনি একটুখানি কৌশল করলেন।
হযরত সা‘দ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু -এর কাছে গিয়ে বললেন, চাচা, কিছু সমস্যা থাকার কারনে ভেবেছিলাম, তিন দিন বাড়িতে যাব না। তো মেহেরবানী করে কি এই তিন দিন আমাকে আপনার ঘরে থাকতে দিবেন?
-ঠিক আছে, থাকো। কোনো অসুবিধা নেই।
হযরত আবদুল্লাহ একে একে তিন রাত হযরত সা‘দ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু এর বাড়িতে থাকলেন। কৌতুহলের এ তিন রাতে তিনি যা কিছু আবিষ্কার করতে পারলেন তার মুখেই শোনা যাক সেই বিবরণ-
' তাঁর বাড়িতে আমি তিন রাত কাটালাম। তাঁকে রাত জেগে জেগে তাহাজ্জুদও তেমন পড়তে দেখলাম না। তবে রাতে ঘুম ভাঙ্গলেই পাশ ফেরার সময় আল্লাহু আকবার বলতেন; আল্লাহর যিকির করতেন; এরপর ফজরের সময় হলে নামাযের জন্য উঠে পড়তেন।'
'তবে এ তিন দিন তাঁকে কোনো অর্থহীন শব্দ বা বাক্য বলতে শুনিনি। শুধু ভালো কথাই বলতে দেখেছি।' আব্দুল্লাহ বিন আমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু যোগ করলেন।
তিনি বলে চলেছেন-
'তিন রাত কাটানোর পর তাঁকে বললাম- চাচা, বাড়িতে আসলে তেমন কোনো সমস্যা আমার ছিল না। শুধু আপনার সাথে কিছু সময় থাকা এবং আপনার আমল পর্যবেক্ষণ করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। কারণ পর পর তিন দিন আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنّةِ.
‘এখন তোমাদের মাঝে একজন জান্নাতী মানুষের আগমন ঘটবে।’
'তিন বারই দেখা গেল আপনার আগমন হয়েছে। তখন থেকেই আমি সংকল্প করেছি, আপনার সাথে থেকে আপনার ‘আমল’ পর্যবেক্ষণ করব এবং সে মোতাবেক আমল করে আমিও জান্নাতী হব।' তিনি বলে যাচ্ছেন।
'কিন্তু চাচা, আপনাকে তো বেশি কিছু আমল করতে দেখলাম না! তাহলে কী এমন বিষয়, যা আপনাকে নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পাক যবানে উচ্চারিত এই সৌভাগ্য এনে দিল?' জানতে চাইলেন আব্দুল্লাহ বিন আমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু।
সা‘দ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বললেন, 'ভাতিজা! আমার আমল তো ঐটুকুই যা তুমি দেখেছ!'
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বোধ হয় কিছুটা আশাহত হলেন। ফিরে যাওয়ার সময় পেছন থেকে ডাক এলো- 'আবদুল্লাহ!'
আব্দুল্লাহ বিন আমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু ফিরে তাকালেন। হযরত সা‘দ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বললেন, 'ভাতিজা, তুমি আমাকে যেমন দেখেছ আমার আমল তো ঐটুকুই। তবে একটি বিষয় আছে।'
হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু আগ্রহ যেন হঠাত বহুগুনে বেড়ে গেল। তন্ময় হয়ে শুনতে লাগলেন তিনি। হযরত সা‘দ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বললেন, 'কোনো মুসলিম ভাইয়ের প্রতি আমি অন্তরে কোনো কূট চিন্তা পোষণ করি না। আর আল্লাহ পাক যাকে যে নিআমত দান করেছেন তার কারণে কাউকে হিংসা করি না। এক কথায় সকলের দাবি দাওয়া ছেড়ে দিয়ে প্রতি রাতে আমি ঘুমুতে যাই। কোনো মাখলূকের প্রতি আমার কোনো দাবি অবশিষ্ট রাখি না। সকলকে মাফ করে দিয়ে প্রতিটি দিন পার করি।'
এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বলে উঠলেন, 'হ্যাঁ, এই একটি গুণই ঐ মহাসৌভাগ্যের অধিকারী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই গুনটিই আপনাকে জান্নাতী মানুষে পরিনত করেছে। আর এটিই আমরা পারি না।' –মুসনাদে আহমাদ ৩/১৬৬, হাদীস ১২৬৯৭; কিতাবুয যুহদ, হাদীস : ৬৪৬
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



